ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ জানুয়ারী ২০১৯ | ০৪ : ১১ মিনিট

December 8th, 2018

আহমদ রফিকহেমন্তের শীতের বিকেল।ঢাকা শহর।গ্রামের মতো হাড়কাঁপানো শীত নেই। ধান কাটার ধূম–ধামও নেই। তবে একটু একটু শীতের মেজমেজে ভাব আছে।কদিন ধরে ভাবছি, ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্রগবেষক আহমদ রফিকে স্যারের বাসায় যাব।স্বপ্ন ’৭১ রে নতুন সংখ্যা গণহত্যা ’৭১ প্রকাশিত হয়েছে। সেটা তুলে দেওয়ার জন্য। আমার সঙ্গে বরাবরে মতো সঙ্গী হলো আবু তাহের সোহেল।

মগবাজারের স্যারে বাসার ঢোকার পথে রাস্তায় চোখে পড়ে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের দেওয়া আহমদ রফিক নামে নামফলকটি। জ্বরাজীর্ন, অবহেলায়, অযত্নে ঘাড় ভেঙ্গে দুমরে মুচরে এতিমের মতো পড়ে আছে সেই নামফলকটি।গা ঘেঁষে একটি চায়ের টং। দেখার পর মনটা বিষণ্নতায় ভরে ওঠে। সোহেলকে একটা ছবি তুলে রাখার জন্য বললাম। তারপর আমরা ছুটলাম স্যারে বাসায়।

কলিং বেল বাজালে বের হয়ে আসেন একজন মহিলা।বসার রুমটা আলো জ্বলে আমাদের বসতে দেয়।রুমের চারপাশটা পুরস্কার, সম্মাননা ও প্রতিকৃতিতে ভরপুর।মিনিট দুই একের পর স্যার আসলেন।বলেন, ও তোমরা এসেছ? চোখে–মুখে আনন্দের একটু ঝলক দিয়ে আবার বলেন, তোমরা ইদানিং আসো না কেন?
‘নানা রকমের দৌড়–ঝাপের কারণে আসা হয়ে ওঠতেছিল না স্যার।’ তারপর শুরু হলে নানা কথাবার্তা। মুক্ত আসর একজন উপদেষ্টা থাকার কারণে আমাদের কার্যক্রম নিয়ে কিছু আলোচনা।
সোহলে বলল, স্যার এই শীতের কি আপনি এখনও ভোরে ঘুম থেকে ওঠেন?
বলেন—প্রত্যেক দিন সাড়ে পাঁচ– ছয়টার মধ্যে ওঠা হয়। ঘুম থেকে ওঠে লেখালেখি শুরু করি।ইদানিং আর রাতে লিখি না। বয়সের কারণে চোখ দিয়ে একটু কম দেখি। দিনের মধ্যে লেখা শেষ করে ফেলি।’
বললাম, নতুন কি লিখছেন? বলেন— প্রথমা প্রকাশনের জন্য একটা ভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক সংগ্রামগুলো নিয়ে বেই করে দিলাম দিলাম। যা এর আগে কেউ করেনি। বিচ্ছিন্নভাবে কেউ কেউ করেছিল। কিন্তু এক সঙ্গে এর আগে হয়নি। এটা শেষ করলাম। বইটার প্রথমে নাম দিয়েছিলাম ‘ভাষা আন্দোলনের গ্রাম–গঞ্জ’। পরে বইটা কাজ করতে করতে নামটা ঠিক করলাম–ভাষা আন্দোলনে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। বইটাও সাজানো হয়েছে একেবারে গ্রাম, থানা–উপজেলা, জেলা শহরগুলো আন্দোলনগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে।সবাই তো ঢাকাকে নিয়ে লিখেন। আমি এই বইয়ে ঢাকার কথা খুব সামান্য লিখেছি।

কথা বলতে বলতে চা আর বাঁধাকপির বোরা নিয়ে রুমে প্রবেশ করে কাজের মহিলাটি। স্যার বলেন, ‘বাঁধা কপির বোরাগুলো বেশ অন্য রকমের লাগবে।’ সত্যি ভীষণ অন্যরকম। এর আগে খাওয়া হয়ে ওঠেনি। চা খেতে খেতে স্যার বলেন, জীবন সংগ্রামের কিছু কথা।তিনি বলেন, আমি তো ঘটনা কেন্দ্রিক বিশ্বাসী। মানুষের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনাগুলোকে নিয়ন্ত্রণকে জীবন। আমার ছেচল্লিশে (১৯৪৬ সালে) ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমার তা দেওয়া হলো না। পরীক্ষা দিলাম ৪৭য়ে । যদি আমি ছেচল্লিশে দিতাম তাহলে হয়তো ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারতাম না। এই ক্ষুদ্র ঘটনার জন্য আমার জীবন অন্যভাবে নিয়ন্ত্রিত করেছে।কথা বলতে বলতে তিনি আরও গভীরে চলে গেলেন। বলেন, ‘আমি ম্যাট্রিকে মেধা তালিকায় ছিলাম। ইন্টারে স্টার্ন করেছিলাম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে। দেশ ভাগের কারণে ভর্তি হতে পারিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে । পড়তে চেয়েছিলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিস্ট্রিতে। মা ও মেজে ভাইয়ের ইচ্ছে ডাক্তারি পড়া। তখনকার দিনে ডাক্তারে অনেক ডিমান্ড ছিল।তবুও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফরম নিয়ে রেখেছিলাম।পরে জানতে পারলাম, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হতে পারব অনবাসিক ছাত্র হিসেবে।এমন একটা ঘটনা।

আবার ছোটবেলা কথা যদি বলি, তখন আমার বয়স মাত্র আড়াই বছর। আমরা বাবা। মেঘনার ওপারে এক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বিকেলে কাউকে না বলে বেরিয়ে পড়লেন। মাকে শুধু বলেছিলেন, ‘আসি।’ এই এতোটুকু কথা। তারপর মেঘনার ঝড়ে পড়ে আর ফিরে আসেনি।কথাগুলো বলতে বলতে কেন জানি অন্য মনষ্ক হয়ে গেলেন।হয়তো জীবনে এই ৯০ বছরে একাকীত্ব জীবনে বাবা মায়ের কথা মনে ধরেছে।  বাবা মারা যাওয়ার পর মা ও তাঁর ভাইয়ের সংসার জীবন। সবার ছোট ছেলে হওয়ার জন্য গ্রাম ছেড়ে চলে আসেন বড় ভাইয়ের বাসায় নড়াইলে।সেখানে তিনি ভর্তি হন তৃতীয় শ্রেণীতে। ভাইয়ের চাকরি পরিবর্তনে স্কুলও পরিবর্তন হয়। উচ্চমাধ্যমিক ভর্তি হন মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে। এমন অসংখ্য ঘটনা তাঁর জীবনকে বদলে দিয়েছে। এজন্য তিনি বিশ্বাস করেন জীবনের ঘটনাই পারে জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে।

সারা জীবন তিনি একজন অর্ন্তমূখী মানুষ ছিলেন বলে আমাদের জানালেন। একাকীত্ব তার বেশ ভালো লাগে। এতোটা সময় তিনি কাটিয়েছে একাকী মানুষ হিসেবে।

সন্ধ্যার আলো শহরে নানা রঙের বাতিতে অন্যরকমের রূপে জ্বলে ওঠে। পুরো ঘন্টাখানি আড্ডাটা যেন শেষ হতে চায় না। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের মতো ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’। ওদিকে আমার বারবার ফোন আসার শুরু করেছে।এজন্য আড্ডাটা শেষ করতে হবে।কিন্তু একদমে মন চাচ্ছে না । স্যার বলেন, এমনি ঘটনা তোমাদের নিশ্চয়ই আছে। ‘জ্বি স্যার’। প্রত্যেক মানুষের এমন অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা নিয়ে জীবন।

আসার সময়ে স্যারকে বললাম, স্যার আবার কয়েকদিনের মধ্যে আসতেছি।

‘ঠিক আছে এসো।’
ভালো থাকবেন। দোয়া করবেন।
তোমারও দোয়া করো..

আবু সাঈদ : সম্পাদক, স্বপ্ন ’৭১

Comments

comments