ঢাকা, রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮ | ০৭ : ৫৭ মিনিট

September 12th, 2018

আহমদ রফিক। ছবি : মুক্ত আসর

আহমদ রফিক। ছবি : মুক্ত আসর

ভাষাসংগ্রামী, কবি, প্রাবান্ধিক ও রবীন্দ্র–গবেষক আহমদ রফিকের ৯০তম জন্মবার্ষিকী আজ। তিনি ১৯২৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর বাবা আবদুল হামিদ ও মা রহিমা খাতুন এবং স্ত্রী ডা. এস. কে রুহুল হাসিন।

১৯৪৭ সালের তিনি মহকুমা হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা পাশ করে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন মুন্সিগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে। তারপর তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি জড়িয়ে পড়েন ছাত্র রাজনীতিতে। ভাষা আন্দোলন শুরু হলে তিনিও ভাষা আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হন।

১৯৫৮ সালে শিক্ষাজীবন শেষে তাঁর দুই প্রিয় রাজনীতি আর সাহিত্যকর্ম। সেখান থেকে তিনি একটি বিষয় বেছে নেন। কারণ দলীয় রাজনীতির প্রতি আগ্রহ হারালে রাজনীতি ছেড়ে দেন। মনোনিবেশ করেন সাহিত্যকর্মে। তবে তিনি বাম আদর্শকে ত্যাগ করিনি।

১৯৬৪–৭০  তিনি একটি সাহিত্য পত্রিকা নাগরিক নামে একটা পত্রিকা সম্পাদনা  করতেন । তাঁর উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বসাহিত্যযোগে তৎকালীন পূর্ববঙ্গীয় পাঠকসমাজে প্রগতিবাদী আধুনিকতার প্রকাশ ঘটানো, সাহিত্যিক বিতর্কে গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতার বিস্তার ঘটানো। আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচয় ঘটানো। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তরকালে শিল্পোদ্যোগ নিয়ে ব্যস্ততার কারণে অনেকের অনুরোধ সত্ত্বেও তিনি আর নাগরিক প্রকাশ করতে পারেনি।

তিনি দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন এবং পূর্ববঙ্গ রবীন্দ্রচর্চা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করেই যাচ্ছেন। পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চার সর্ম্পকে তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আমার গবেষণার মূল কারণ ছিল পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চার ঘাটতি, অবহেলাও বলা যায়। পাকিস্তান আমলে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি রবীন্দ্রবিরোধিতায় নেমেছিল। বাংলাদেশ আমলে সরাসরি বিরোধিতা নেই। তবে উদাসীনতা আছে। রবীন্দ্রচর্চার চেয়ে আনুষ্ঠানিকতা প্রাধান্য পাচ্ছে। রবীন্দ্রসংগীতের অনুষ্ঠানে শ্রোতাদের উপচে পড়া ভিড় আছে, রবীন্দ্রসংগীত চর্চায় অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানও সক্রিয়; কিন্তু রবীন্দ্র-সাহিত্যের মর্মবস্তু, তাঁর শিক্ষাদর্শন, জীবনদর্শন, বিশ্বজনীন চেতনার চর্চা তেমন ছিল না। এই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যেই আমরা রবীন্দ্রচর্চা কেন্দ্র ট্রাস্ট গড়ে তুলি। এক দশক সক্রিয় ছিল সংগঠনটি। এমনকি দুই বঙ্গের রবীন্দ্রানুরাগীদের নিয়ে একাধিকবার রবীন্দ্র-সাহিত্য সম্মেলন ও সেমিনার করেছি। কিন্তু আর্থিক কারণে সংগঠনটি এখন অনেকটা নিষ্ক্রিয়। আমাদের লক্ষ্য ছিল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জনমানসের আত্মীয়তা গড়ে তোলা, শিক্ষিত শ্রেণিতে রবীন্দ্রচেতনা ও রবীন্দ্রভাবনা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি। প্রথমটি একেবারেই হয়নি, দ্বিতীয়টি আংশিক হয়েছে। তবে আমরা উৎসাহিত হয়েছি গত এক দশকে একাধিক রবীন্দ্রচর্চা সংগঠনে তরুণ-তরুণীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখে। তারপরও বলব, এ দেশের শিক্ষিত সমাজ এখনো রবীন্দ্রদর্শন থেকে অনেকটা দূরে, রবীন্দ্র-সংস্কৃতির সামাজিক আলোড়ন দেখা যায় একমাত্র গানে, কদাচিৎ মঞ্চনাটকে।’

বর্তমানে তিনি নিয়মিত রাজনৈতিক–সামাজিক প্রবন্ধ লিখছেন। বর্তমানের পরিস্থিত সর্ম্পকে তিনি বলেন,‘ তারুণ্য বরাবর এ দেশে সমাজ ও রাজনীতিকে পথ দেখিয়েছে, ভবিষ্যতেও দেখাবে, এমনই আমার বিশ্বাস। তারুণ্যের পেছনে জনশক্তির সক্রিয় সমর্থন থাকলেই সমাজ ও শাসনব্যবস্থায় তা আকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনবে।’

তিনি পেয়েছন অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। উল্লেখ্য করা যেতে পারে–১৯৭৯ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৯৫ সালের একুশে পদক, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯৭ সালে কলকাতার টেগোর রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে রবীন্দ্রত্বাচার্য উপাধী।

আহমদ রফিক লিখেছন বহু কবিতা, গল্প, প্রবন্ধসহ সাহিত্যের নানা বিষয়। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখ্যযোগ্য বইগুলোর হচ্ছে–কবিতা : নির্বাসিত নায়ক (১৯৬৬); বাউল মাটিতে মন (১৯৭০); রক্তের নিসর্গে স্বদেশ (১৯৭৯); বিপ্লব ফেরারী, তবু (১৯৮৯); পড়ন্ত রোদ্দুরে (১৯৯৪); শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৯৮); ভালোবাসা ভালো নেই (১৯৯৯); নির্বাচিত কবিতা (২০০১)। ছোটগল্প : অনেক রঙের আকাশ (১৯৬৬), পদ্মাপর্বের রবীন্দ্রগল্প (১৯৮৭); প্রবন্ধ-গবেষণা[ : শিল্প সংস্কৃতি জীবন (১৯৫৮); নজরুল কাব্যে জীবনসাধনা (১৯৫৮); আরেক কালান্তর (১৯৭৭); বুদ্ধিজীবীর সংস্কৃতি (১৯৮৬); রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রচিন্তা ও বাংলাদেশ (১৯৮৭); একুশের ইতিহাস আমাদের ইতিহাস (১৯৮৮); ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও তাৎপর্য (১৯৯১); ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও কিছু জিজ্ঞাসা (১৯৯৩); এ এই অস্থির সময় (১৯৯৬); জাতিসত্তার আত্মঅন্বেষা : বাঙালি বাংলাদেশ (১৯৯৭); রবীন্দ্রভুবনে পতিসর (১৯৯৮); বাঙলা বাঙালি আধুনিকতা ও নজরুল (১৯৯৯); বাংলাদেশ জাতীয়তা ও জাতিরাষ্ট্রের সমস্যা (২০০০); নির্বাচিত কলাম (২০০০); একাত্তরে পাকবর্বরতার সংবাদভাষা (২০০১); কবিতা, আধুনিকতা ও বাঙলাদেশের কবিতা (২০০১); প্রসঙ্গ : রহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ (২০০২); রবীন্দ্রভাবনায় গ্রাম : কৃষি ও কৃষক (২০০২); ভাষা আন্দোলন : গ্রাম : কৃষি ও কৃষক (২০০২); নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০০২)। শিল্পকলা : বীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প (১৯৯৬)। বিজ্ঞান :  কেমন আছেন (চিকিৎসা বিজ্ঞান, ১৯৮৭); আদিমানবের সন্ধানে (নৃতত্ব, ১৯৮৯); ঔষুধ, চিকিৎসাসেবা : বৈষম্যের শিকার সাধারণ মানুষ (১৯৯৫); ফিট থাকুন, দেহে মনে (২০০১); এই পৃথিবীতে মানুষ (১৯৯৯)। অনুবাদ :  জীবন রহস্য (১৯৬৭); অণুর দেশে মানুষ (১৯৬৮); বিজ্ঞানের জয়যাত্রা (১৯৬৮)। সম্পাদনা : নাগরিক (ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র, ১৯৬৩-১৯৭০); দ্য ইস্ট পাকিস্তান মেডিকেল জার্নাল (১৯৬০-৭০); দ্য মেডিকেল ডাইজেস্ট (১৯৬০-৭০); পরিভাষা (১৯৬৮-৭০); সুজনেষু (মিনি সাহিত্যপত্র, ১৯৭২-৭৬); বাংলা একাডেমীর চিকিৎসা বিজ্ঞান পরিভাষা কোষ (সংকলক ও তত্ত্বাবধায়ক সম্পাদক)।

Comments

comments