ঢাকা, বৃহষ্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ০৭ : ১২ মিনিট

Roma Chowdhury‘একাত্তরের জননী’ খ্যাত লেখিকা, বীরমাতা রমা চৌধুরীকে শেষ শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় সিক্ত হলেন সর্বস্তরের মানুষ। আজ সোমবার সকালে রমা চৌধুরীর মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল থেকে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।

রমা চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হাড়ের ব্যথাসহ নানা রোগে ভুগছিলেন। গত বছরের ডিসেম্বরে বাসায় পড়ে গিয়ে কোমর ভেঙে গিয়েছিল তাঁর। সেই থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। কয়েক দিন আগে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। গতকাল রাত ১০টায় তাঁকে সেখানে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।ভোররাত ৪টা ৪০ মিনিটে রমা চৌধুরীর লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়।

শহীদ মিনার থেকে রমা চৌধুরীর মরদেহ নেওয়া হয় নগরের চেরাগী পাহাড় চত্বরে। সেখানে এক কক্ষের একটি বাসায় তিনি থাকতেন। সেখান থেকে বোয়ালখালীর পোপাদিয়ার গ্রামের বাড়িতে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করার কথা রয়েছে।

রমা চৌধুরী ১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন রমা চৌধুরী। তিনিই ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর (এমএ)। ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি তিন পুত্রসন্তানের জননী ছিলেন। থাকতেন পৈতৃক ভিটা পোপাদিয়ায়। তাঁর স্বামী ভারতে চলে যান। ১৩ মে সকালে পাকিস্তানি সেনারা এসে চড়াও হয় তাঁর ঘরে। এ সময় দুগ্ধপোষ্য সন্তান ছিল তাঁর কোলে। এরপরও তাঁকে নির্যাতন করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা গানপাউডার দিয়ে আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে দেয় তাঁর ঘরবাড়ি। পুড়িয়ে দেয় তাঁর সব সম্পদ। নিজের নিদারুণ এই কষ্টের কথা তিনি লিখেছেন ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থে।

বিজয়লাভের পর ২০ ডিসেম্বর তাঁর বড় ছেলে সাগর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এর ১ মাস ২৮ দিন পর মারা যায় আরেক ছেলে টগর। এরপর তিনি জুতা পরা বাদ দেন। পরে অনিয়মিতভাবে জুতা পরতেন তিনি। ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর আরেক ছেলে মারা গেলে পুত্রশোকে তিনি আর জুতা পায়ে দেননি। খালি পায়ে হেঁটে নিজের লেখা বই বিক্রি করে চলতেন এই নারী। বর্তমানে বেঁচে আছেন তাঁর আরেক ছেলে জহর চৌধুরী।

২০ বছর ধরে লেখ্যবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন রমা চৌধুরী। যদিও তাঁর লেখ্যবৃত্তির পেশা একেবারেই স্বনির্বাচিত ও স্বতন্ত্র। তিনি প্রথমে একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। বিনিময়ে সম্মানীর বদলে পত্রিকার ৫০টি কপি পেতেন। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তাঁর জীবন-জীবিকা। পরে নিজেই নিজের লেখা বই প্রকাশ করে বই ফেরি করতে শুরু করেন। প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে বর্তমানে তিনি নিজের ১৫টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন।

Comments

comments