ঢাকা, বৃহষ্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ০৬ : ১৭ মিনিট

Kazi Nazrulকবি কাজী নজরুল ইসলাম গীতিকার-সুরকার হিসেবে প্রায় ৩৫০০ গান সৃষ্টি করেছিলেন বলে জানা যায়। এর মধ্যে অগুণতি গান কালজয়ী। কিন্তু একটি ব্যাপার আলোচনাযোগ্য। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টি-শক্তি এতটাই প্রবল ছিল, যে অনুপ্রাণিত কবি যে কোন পারিপার্শিক অবস্থায়,  রিহার্সালের ঘরে, অনেক লোকজনের কথাবার্তার মধ্যেখানে বসেও কখনও কখনও পাঁচ থেকে ছয়টি গান ঘন্টাখানেকের মধ্যে লিখে ফেলতেন। শ্রদ্ধেয়া কাননবালা দেবী জানিয়ে গিয়েছেন, অল্প বয়েসে যখন তিনি ফিল্মের গান তৈরি করার প্রয়োজনবশতঃ ওনার কাছে যেতেন, অনেক সময়েই দেখেছেন একঘর মানুষের মধ্যে বসেই কোলের কাছে হারমনিয়মটি টেনে নিয়ে কি একাগ্রতায় কত দ্রুতগতিতে তাঁর লেখা কথার সাথে সামঞ্জস্য রেখে স্রষ্টা সুর সৃষ্টি করছেন।

জীবনে বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সুতীক্ষ্ণ ধীমান কবি তাই রচনা করেছেন বিভিন্ন ধরণের গান, যাদের জন্মকাহিনী বিচিত্র হতে বিচিত্রতর। এইসব গানের রচনার প্রেরণা হিসেবে ঘটনাগুলি বিশেষ স্মরণীয়। কৃষ্ণনগরের কাছে চাবড়ির বিলে হাঁস-শিকার পর্ব শেষ হলে গোধূলির আলোয় গ্রামের মেয়েদের কলসীতে জল ভরতে দেখে যেমন তিনি লিখলেন ‘কাবেরী নদী জলে কে গো বালিকা’,  তেমনই জেলেটোলায় শ্রীনলিনীকান্ত সরকারের বাড়িতে থাকাকালীন পথচারী হিন্দুস্থানীদের গলায় উর্দু গান শুনে তৈরি করেছেন ভৈরবী রাগের কাঠামোয় অপুর্ব গজল।

১৯২৬ খ্রীস্টাব্দের ৬ ও ৭ ফেব্রুয়ারী কৃষ্ণনগরে নিখিল বঙ্গীয় প্রজা সন্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশন বসে। এ প্রসঙ্গে শ্রদ্ধেয় শ্রীহেমন্তকুমার সরকার লিখেছিলেন, “কনফারেন্সের উদ্বোধনী সঙ্গীত হিসেবে গান লেখার ফরমাস করা গেল নজরুলকে। তাকে একটা ঘরের মধ্যে ঠেলে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিয়ে আদায় করলুম দুটি গান- ‘ধংস পথের যাত্রীদল’, আর ‘ওঠরে চাষী জগতবাসী ধর কষে লাঙ্গল’। বাংলা সাহিত্যে এই ধরনের গান আগে ছিলনা, নজরুলই তার ‘পথকার’”। একইভাবে আব্বাসুদ্দিন আহমেদ সাহেব স্মৃতিচারণে বলেছেন গ্রামোফোন কোম্পানির এক আড্ডার কথা। লটারির টাকা পেলে কে কিভাবে নিজের স্ত্রী’কে খুশি করবে, সেই আলোচনায় বন্ধু শিল্পীদের মাঝখানে বসে নজরুল লিখে ফেলেছিলেন তাঁর সুবিখ্যাত গান, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী, দেব খোঁপায় তারার ফুল’। এই ঐশ্বরিক শক্তি-সম্পন্ন গীতিকারের সব কয়টি গানের প্রেরণার কথা এই স্থানটুকুতে লেখা সম্ভব নয়। তাই এখানে আলোচনা করছি শুধু কয়েকটি গানের কথা।  এর মধ্যে আছে কিছু গান যা তিনি স্বদেশের প্রতি গভীর ভালবাসায় আপ্লুত হয়ে লিখেছিলেন আর কিছু লিখেছিলেন সমসাময়িক লেখক-কবি-প্রবন্ধকার-দেশভক্তদের মৃত্যুতে দুঃখিত হয়ে।

মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সন্মেলনের উদ্বোধন উপলক্ষে কবি ঢাকায় যান ১৯২৮ সালের মার্চ মাসে। সেখানে পৌঁছেই এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন সঙ্গীত হিসেবে তিনি লিখলেন তাঁর বিখ্যাত গান, ‘চল চল চল, উর্দ্ধ গগনে বাজে মাদল’। “চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন” ছায়াচিত্রে এই জনপ্রিয় গানটি ব্যাবহৃত হয়েছিল।

১৯২৩ সালে হুগলী জেলে বন্দী অবস্থায় জেল সুপারিন্টেনডেন্ট আর্সটন সাহেবের অভদ্রতায় ও অত্যাচারে উত্যক্ত হয়ে জেলে বসে কাজী নজরুল লিখে ফেললেন কতিপয় পঙক্তি, ‘তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে, তুমি ধন্য ধন্য হে’।  কিছুদিনের মধ্যেই লেখাটিকে গানের রূপ দেন। গানটি রবীন্দ্রনাথের ‘তোমারই গেহে পালিছ স্নেহে’র প্যারডি। জেল-সুপার আর্সটন কারাগার পরিদর্শনে এলে বন্দীরা একযোগে গানটি গেয়ে তাকে অভ্যর্থনা জানাত।

Untitled-3‘শিকল পরা ছল, মোদের এ শিকল পরা ছল’ গানটিও হুগলী জেলে লিখিত। সমস্ত অত্যাচারের বিরুদ্ধে এর বাণী বাঙময়। কবির “বিষের বাঁশি” গ্রন্থে এ লেখাটি স্থান পেয়েছে।

১৯২৬ সালের ২রা এপ্রিলে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার পেছনে প্রচ্ছন্নভাবে যে ইংরেজদের হাত ছিল তা অজানা নয়। ১৯২৬ সালে হঠাৎ ইংল্যান্ডে শুরু হোল সাধারণ ধর্মঘট। সে নিয়ে তখন ইংরেজরা কিছুদিন বিপর্যস্ত। এ ধর্মঘট কবির মনে হিন্দু-মুসলিম মিলনের আশার সঞ্চার করেছিল। তিনি আন্তরিকভাবে চাইছিলেন এই অবকাশে হিন্দু ও মুসলিম বিভেদ ভুলে গিয়ে মিলনের পটভূমিতে একসাথে ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াক, নিজেদের মাতৃভূমির দখল নিজেরা সামলে নিক। ‘যা শত্রু পরে পরে’ এবং ‘ঘর সামলে নে এই বেলা’ গান দুটি এই সময়েই লেখা।

‘কারার ওই লৌহ কপাট’ গানটি কিন্তু তিনি জেলে বসে লেখেন নি। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের পত্রিকা ‘বাংলা কথা’র জন্য হঠাৎ একদিন একটি লেখার অনুরোধ আসে। ১৯২১ সালে দেশ জুড়ে তখন অসহযোগ আন্দোলন চলছে। বন্দীশালা ভর্তি। অসহযোগ আন্দোলন তখন নামেই নিরুপদ্রব। দেশের পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ। কাজীসাহেবের এই গান মানুষকে ভরিয়ে তুলেছিল সাহসী উদ্দীপনায়। “ভাঙ্গার গান” নামক গ্রন্থে এই গানটি সংকলিত।

১৯২১ সালের ১৭ই নভেম্বর প্রিন্স অফ ওয়েলস (অষ্টম এডওয়র্ড) ভারত পরিদর্শন করতে এলে সারা দেশে হরতাল হয়। সে সময়ে কুমিল্লায় থাকাকালীন নজরুল ২১শে নভেম্বর প্রতিবাদ মিছিলে যোগ দেন। শ্রীপ্রবোধচন্দ্র সেনের পক্ষ থেকে একখানা গান অল্প সময়ের মধ্যে লিখে দেওয়ার অনুরোধ এসেছিল। কবি রচনা করলেন ‘ভিক্ষা দাও, ভিক্ষা দাও! ফিরে চাও ওগো পুরবাসী’। মিছিলের পুরোভাগে গানটি নিজের কণ্ঠে গাইতে গাইতে সারা শহর পরিক্রমা করেছিলেন নির্ভয় কবি।

দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ যখন ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জুনে দার্জিলিংএ মারা যান, ওনার শবদেহকে কলকাতা নিয়ে আসার পথে নৈহাটি স্টেশনে হুগলীবাসীদের তরফ থেকে সন্মান দেওয়া হয়। শোকে বিহ্বল হয়েও নজরুল লিখলেন গান, ‘হায় চির ভোলা, হিমালয় হতে অমৃত আনিতে গিয়া’। গানটিকে মালার সাথে আটকিয়ে শবাধারে অর্ঘ্য হিসেবে অর্পণ করা হয়।

১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে জুন অকালে মারা গেলেন কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত। পরদিন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একটি শোকসভার আয়োজন করেন। উদ্বোধন সঙ্গীত হিসেবে নজরুল রচনা করেন ‘চল-চঞ্চল বাণীর দুলাল এসেছিল পথ ভুলে’।

১৯৪২ সালের ২২শে শ্রাবণ দেহরক্ষা করলেন রবীন্দ্রনাথ। কবি নজরুল তাঁর অত্যন্ত স্নেহের পাত্র ছিলেন। শোকে মুহ্যমান হয়ে কবি নজরুল লিখলেন গান “ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে, জাগায়ো না”। পরবর্তীকালে ইলা মিত্র ও সুনীল ঘোষের সহযোগিতায় তিনি গানটি স্বকণ্ঠে গ্রামোফোনে রেকর্ড করেন।

গীতিকার-সুরকার নজরুল এতই প্রতিভাশালী ছিলেন যে যেকোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি যেসব গান সৃষ্টি করেছেন, তা বহু বছর পরেও তাঁর অমর কীর্তি হিসেবে সন্মানিত হয়েছে। এই প্রাসঙ্গিক চিন্তাশক্তি, এই মনন প্রনম্য। এ প্রতিভা অতি বিরল।

তথ্যসূত্রঃ

  • অখন্ড নজরুলগীতি, ২য় সংস্করণ
  • কাজী নজরুলের গান – নারায়ণ চৌধুরী
  • শ্রেষ্ঠ নজরুল স্বরলিপি – আবদুল আজীজ আল্‌-আমান
  • নজরুল জীবনী – রফিকুল ইসলাম
  • আজকের সংবাদ বিভাকর, ২৩তম বর্ষ, ২য় সংখ্যা

***ইন্দিরা দাশ : কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পী, ভারত।

Comments

comments