ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৩ : ২৭ মিনিট

June 5th, 2018

পপসম্রাট আজম খান। ছবি : সংগৃহীত

পপসম্রাট আজম খান। ছবি : সংগৃহীত

পপসম্রাট আজম খান। পুরো নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান। তিনি ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। সরকারি চাকরিজীবী বাবা মোহাম্মদ আফতাব উদ্দিন খান ও মা জোবেদা খাতুন।

পড়াশোনা শুরু করেন ১৯৫৫ সালে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী স্কুলে। বাবা ১৯৫৬ সালে কমলাপুরে বাড়ি নির্মাণ করলে আজিমপুর থেকে নিজ বাড়িতে চলে আসেন তারা। কমলাপুরের প্রভেনশিয়াল স্কুলেপ্রাইমারিতে ভর্তি হন। সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে বাণিজ্য বিভাগে থেকে ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭০ সালে টিঅ্যান্ডটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে এইচএসসিতে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। দেশে শুরু হয় তুমুল সংগ্রাম। তিনিও সেই সংগ্রামে যুক্ত হলেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণের বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু করেন। সেই সময় তিনি ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীরসক্রিয় সদস্য হয়ে গণসঙ্গীতপ্রচার করেন। এসব কারণে আর পড়াশোনা অগ্রসর হতে পারেননি।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাঁর বাবার অনুপ্রেরণায় তিনি মুক্তিযুদ্ধে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। বাবা আফতাব উদ্দিন খান ছিলেন সচিবালয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ২১ বছরের টকবটে তরুণ আজম খান পায়ে হেঁটে আগরতলায় যান। সেখান থেকে ভারতের মেলাঘরের শিবিরে। সেখানে তিনি প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেন। যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শেষে তিনি কুমিল্লায় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সমুখযুদ্ধে অংশ নেন। কুমিল্লার সারদায় ছিল তার প্রথম যুদ্ধ। যুদ্ধ সফল ভাবে সম্পন্ন হলে তিনি ফিরে যান আগরতলায়।

আগরতলা থেকে ঢাকার গেরিলাযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য তাঁকে পাঠানো হয়। তিনি ২ নম্বর সেক্টরের একটা সেকশনের ইন-চার্জ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্ণেল খালেদ মোশাররফ। ঢাকা ও এর আশেপাশে বেশ কয়েকটি গেরিলা আক্রমণে অংশ নেন।

আজম খান মূলত যাত্রাবাড়ি- গুলশান এলাকার গেরিলা অপারেশনগুলো পরিচালনার দায়িত্ব পান। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল তার নেতৃত্বে সংঘটিত ঢাকার ‘অপারেশান তিতাস’। সেখানে কিছু গ্যাস পাইপলাইন ধ্বংস করার মাধ্যমে বিশেষ করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, হোটেল পূর্বাণী ইত্যাদির গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানো। তাদের লক্ষ্য ছিল, হোটেলে অবস্থানরত বিদেশীরা যাতে বুঝতে পারে, দেশে যুদ্ধ চলছে। এই অপারেশনে তিনি বাম কানে আঘাত পান। পরবর্তীতে এই আঘাত তার শ্রবণক্ষমতায় বিঘ্ন ঘটায়। আজম খান তার সঙ্গীদের নিয়ে পুরোপুরি ঢাকায় প্রবেশ করেন ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝি। এর আগে তারা মাদারটেকের কাছে ত্রিমোহনীতে সংগঠিত যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাদের পরাজিত করেন।

ব্যান্ড দল ‘‘উচ্চারণ’ এর সদস্যদের সঙ্গে  আজম খান (বামে)। ছবি : সংগৃহীত

ব্যান্ড দল ‘‘উচ্চারণ’ এর সদস্যদের সঙ্গে আজম খান (বামে)। ছবি : সংগৃহীত

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে শুরু তার ব্যান্ড ‘উচ্চারণ’ এবং আখন্দ ( লাকী আখন্দ ও হ্যাপী আখন্দ) ভাতৃদ্বয় দেশব্যাপী সঙ্গীতের জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বন্ধু নিলু আর মনসুরকে গিটারে, সাদেক ড্রামে আর নিজেকে প্রধান ভোকাল করে করলেন অনুষ্ঠান। ১৯৭২ সালে বিটিভিতে ‘এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে’ এবং ‘চার কালেমা সাক্ষী দেবে’ গান দু’টি প্রচার হলো প্রচার হলে তুমুল প্রশংসা ও জনপ্রিয়তা পান আজম খান। ১৯৭৪-১৯৭৫ সালের দিকে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনে বাংলাদেশ (রেললাইনের ঐ বস্তিতে) শিরোনামের গান গেয়ে হৈ-চৈ ফেলে দেন। তার পাড়ার বন্ধু ছিলেন ফিরোজ সাঁই। পরবর্তীকালে তার মাধ্যমে পরিচিত হন ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজের সঙ্গে। এক সাথে বেশ কয়েকটা জনপ্রিয় গান করেন তারা। এরই মধ্যে আরেক বন্ধু ইশতিয়াকের পরামর্শে সৃষ্টি করেন একটি এসিড রক ঘরানার গান ‘জীবনে কিছু পাবোনা এ হে হে!’ আজম খানের দাবী, এটি বাংলা গানের ইতিহাসে প্রথম হার্ডরক। তার জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আমি যারে চাইরে’, ‘রেল লাইনের ওই বস্তিতে’, ‘ওরে সালেকা ওরে মালেকা’, ‘আলাল ও দুলাল’, ‘অ্যাকসিডেন্ট’, ‘অনামিকা’, ‘অভিমানী’, ‘আসি আসি বলে’, ‘হাইকোর্টের মাজারে’, ‘পাপড়ি’, ‘বাঁধা দিও না’, ‘যে মেয়ে চোখে দেখে না’ ইত্যাদি।

১৯৮৬ সালে ‘কালা বাউল’ শিরোনামের একটি নাটকে কালা বাউলের চরিত্রে এবং ২০০৩ সালে শাহীন-সুমন পরিচালিত ‘গডফাদার’ চলচ্চিত্রে নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। ২০০৩ সালে ক্রাউন এনার্জি ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রথম বিজ্ঞাপনচিত্রের মডেল হন। এরপর ২০০৫ ও ২০০৮ সালে বাংলালিংক এবং ২০১০ সালে কোবরা ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনের মডেল হন।

ক্রিকেটার হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলেন এ পপ তারকা। গোপীবাগ ফ্রেন্ডস ক্লাবের হয়ে ১৯৯১ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলেছেন। ৯ বছরে অনেকগুলো ক্রিকেট ম্যাচে নিজের খেলোয়ার প্রতিভার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

মুখগহ্বরের ক্যান্সারে আক্রান্ত হন আজম খান। অসাধারণ প্রতিভা ও দৃপ্ত কণ্ঠের এক সংগীত জাদুকরের জীবন থেমে যায় ৬১ বছর বয়সে। দীর্ঘদিন দূরারোগ্য ক্যান্সার ব্যাধির সঙ্গে লড়াই করে ২০১১ সালের ৫ জুন রোববার সকাল ১০টা বেজে ২০ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

আজ তাঁর ৭ম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর প্রিয় বিনম্র শ্রদ্ধা, ভালোবাসা। তিনি আমাদের মাঝে পপসম্রাট  অমর হয়ে থাকবেন।

তথ্যসূত্র :  বাংলামেইল, উইকিপিডিয়া, ডিডাব্লিউ, বিবিস বাংলা, বাংলা ট্রিবিউন

Comments

comments