ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮ | ০৪ : ১৭ মিনিট

May 29th, 2018

Untitled-1 copy

ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি হচ্ছে। জলচূর্ণে বোনা বেপরোয়া রুপালি ওড়নারা তাড়া করে বেড়াচ্ছে একে অন্যকে। আকাশজোড়া মেঘকে ঝলক দিয়ে ফালাফালা করে দিচ্ছে বিদ্যুৎ। ক্যাম্পাসের বিশাল সব গাছগুলো মাথা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে পাতা, ডাল আর ফুল ঝরাচ্ছে। এরই মাঝে একটা লাল টুকটুকে ছাতা মাথায় অরণি হেঁটে আসছিল। হঠাৎ- আদীব! আধাভেজা শার্ট গায়ে আর ভেজা চশমা হাতে ভাঙা একটা টিনের নিচে বৃথাই মাথা বাঁচানোর চেষ্টা করছে বেচারা। কয়েকটা প্রজাপতি হঠাৎই একসাথে ডানা মেলল অরণির পেটের ভেতর।

-‘এ্যাই! চলে আয়, চলে আয় ছাতার নিচে তাড়াতাড়ি!’, অরণি ডাকল।

আদীব ইতস্তত করছে।, ‘আমি তো ভিজেই গেছি, তুই আবার…’

-‘আরে আয় তো!’

দুজনে হাঁটছে। বাতাসে বৃষ্টির ছাঁট গায়ে লাগে। ছাতার তলে জায়গা অল্প, দুজন মানুষে খুব কাছাকাছি। আদীব অরণির চুলের ঘ্রাণ পায়। আদীবের ভেজা শার্ট থেকে জলের ছোপ লাগে অরণির ব্যাগে।

হঠাৎ বড় রকমের একটা হোঁচট খেয়ে আদীব উলটে পড়তে পড়তে নিজেকে সামলে নিল।

-‘আরে, সাবধানে!’, অরণি দাঁড়িয়ে যায়।

-‘চশমা ছাড়া আসলে দেখতে পাচ্ছি না তেমন।’ বিব্রত হাসে আদীব। ‘আবার পরলেও পানির ছাঁটে ভিজে যেয়ে কিছু দেখছি না।’

-‘তো বলবি না? গাড়িঘোড়া তো যাচ্ছে দুএকটা, রাস্তাতেও পানি। দুর্ঘটনা ঘটে গেলে?’

আদীব হাসল। ‘বললে কী করতি?’

-‘কী আবার, হাত ধরে নিয়ে যেতাম তোকে।’…

এই বৃষ্টিবাদল-লাল ছাতা-আদীব মিলিয়ে পুরো যে দিবাস্বপ্নটা অরণি প্রায়ই দেখে, তার এই পর্যায়ে এসে ও সব সময়েই কিছুটা বিভ্রান্তিতে ভোগে। হাত ধরার এই প্রস্তাব শুনে আদীব কী বলবে? হাহা করে হেসে ফেলবে? গভীর দৃষ্টিতে তাকাবে? না কি ভ্রূ তুলে বলবে, ‘আচ্ছা? নিয়ে যা দেখি?’ এই অংশটা ফাঁকা রেখে তাই অরণি পরের দৃশ্যে চলে যায়, যেখানে ঝুম বৃষ্টিতে ও আর আদীব হাত ধরে হাঁটছে। যে দৃশ্যে লাল ছাতাটা বাতাসে উড়িয়ে দিলেও চলে।

অরণি স্বপ্নটা খুব দেখে। একসাথে ঘোরা, বেড়ানো আরও কত কী মানুষে করে- অতদূর অরণি কল্পনাতেও যেতে পারে না। শুধু হাত ধরাটুকুরই তৃষ্ণা ওর অস্তিত্বে।

আর হলো না অবশ্য। বৃষ্টিতে, কাঠফাটা রোদে, রঙিন ফাল্গুনে, এমনি কোনো অবিশেষ আবহাওয়া আর আপাত অবিশেষ মুহূর্তে- সাহস করা হল না, অজুহাত পাওয়া হল না, হাত ধরা হল না। হাহাহিহি আড্ডার, পরীক্ষার আগের রাতে একসাথে পাগল হওয়ার, দলের সাথে মিলে হৈচৈ করতে করতে একসাথে লালবাগ কেল্লা ঘুরতে যাওয়ার যে প্রতিদিনের আদীব, যার বন্ধুত্ব স্থায়ীভাবে গোণায় ধরা আর সান্নিধ্য নৈমিত্তিক, একদিন চট করেই তার দিকে হাত বাড়ানো, তাকে চেয়ে হাত বাড়ানো সহজ নয়, কখনো ছিল না।

ক্যাম্পাস জীবন এভাবেই শেষ, ব্যস্ততার টানে একটু ছাড়াছাড়া দূরত্ব আর তারপর একদিন আদীবের ফোন, ‘হ্যালো, আমি স্কলারশিপটা পেয়ে গেছি রে। জুনে চলে যাচ্ছি আমেরিকা।’

কি দারুণ খবর, তাই না? হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তাই। অরণি ফোন রেখে জানালা ধরে বাইরে তাকায়। কি আশ্চর্য, বৃষ্টি হচ্ছে আকাশ কালো করে। দৃষ্টি যতদূর যায় সবকিছু জলে ভেজা।

শুধু অরণির বুকেই আজীবনের এক মরুভূমিভর্তি খাঁ খাঁ পিপাসা রয়ে গেল।

Comments

comments