ঢাকা, বৃহষ্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ০৬ : ০০ মিনিট

কিছু দিন আগে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশনের মাইম উৎসব। এই নিয়ে বিস্তারিত লিখছেন বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশনের সেক্রেটারি জেনারেল রিজোয়ান রাজন

FB_IMG_1526488402820ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশন বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক সংস্কৃতি চর্চার সীমা অতিক্রম করেছে বেশ কবছর আগেই। দলটি একেবারেই তারম্নণ্য-নির্ভর এবং এটা তাদের নিয়তি। তারম্নণ্যের অপ্রতিরোধ্য গতি তাদের শিল্পের সাধনায় উন্মত্ত করে রেখেছে। যা ভাবছে তাই-ই সম্ভব করে তুলছে তারম্নণ্যের বাঁধ ভাঙ্গা জোয়রে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসকে তারা বানিয়েছে শিল্পের ক্যাম্ভাস। সমমনা এই শিল্পতরম্নণরা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক রাজনীতির উর্ধ্বে ওঠে জাতীয় ও আন্ত্মর্জাতিক ইস্যুতে ক্যাম্পাসকে করে তোলে দৃশ্যকাব্যের নির্বাকমুখর প্রতিবাদী মঞ্চ।

সম্প্রতি তারা আয়োজন করেছিল ২য় আন্তর্জাতিক মূকাভিনয় উত্সব-২০১৮ এর। ৮ থেকে ১০এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে তিনদিন ব্যাপী উত্সবে আমার অংশগ্রহণ ছিল বিভিন্ন পর্বে। উত্সবটি সফল এবং নানা কারণে স্মরণীয়। ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশনের প্রথম জাতীয় মূকাভিনয় উত্সবে আমাদের দল অংশগ্রহণ করেছিল। আজকে তারা অনেক পরিণত। এবারের উত্সবের প্রথম দিন থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলন খুব জোড়াল হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে তারা দুই দিক সামাল দিয়েই উত্সবটি সফলভাবে সমাপ্ত করেছে। তারুণ্য নির্ভর দলটি উত্সব আর আন্দোলনের এক চমত্কার সেতুবন্ধন রচনা করেছে তাদের বিশাল কর্মী বাহিনীর সাহায্যে। অতিথিদের অনুষ্ঠান স্থলে নিয়ে এসেছে মানববৃত্ত তৈরি করে। মূকাভিনয়প্রাণ লোকমানকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমার। লোকমান দেশি-বিদেশি অতিথিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সারা রাত একাই পাহাড়া দিয়েছে অসীম সাহসিকতায়। ছাত্রদের যৌক্তিক আন্দোলনে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে বারবার মরিয়া হয়ে ওঠেছে কিন্তু উত্সবের পিছুটান তাকে সাময়িক বিরত রাখলেও উত্সব শেষে তারুণ্যের মিছিলে মিশে গেছে লোকমান ও তার দল। উত্সবের প্রথম দিন সকাল থেকেই বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্সাহী ছাত্র-ছাত্রীরা আসতে শুরু করেছে, ওয়ার্ল্ড গিনেজ বুক রেকর্ডে অংশগ্রহণ করার জন্য। প্রক্রিয়াটি বেশ চ্যালেঞ্জিং। অংশগ্রহনকারী প্রত্যেককে মেকআপ ছাড়া এবং মেকআপসহ ছবি তুলে পর্যবেক্ষকদের সহায়তায় সমান সংখ্যক লাইন করে মাঠে দাঁড়াতে হয়। সেখানে নির্দিষ্ট সময় অবস্থান করে মূকাভিনয়ের তিনটি অ্যাকশন করার মধ্যদিয়ে এই প্রক্রিয়াটির সমাপ্ত হয়। ইতোমধ্যে আনঅফিসিয়ালি তিনটি রেকর্ড হয়ে যায়। একটি হলো ৬ ঘন্টার মধ্যে ২৫৪ জনের মেকআপ সম্পন্ন করা, দ্বিতীয় হল ২৫৪ জন মূকাভিনয় শিল্পীর কমপক্ষে পাঁচ মিনিট একসাথে অবস্থান এবং তৃতীয় রেকর্ডটি হল ২৫৪ জন শিল্পী একসাথে তিনটি মূকাভিনয় অ্যাকশন সফলভাবে সম্পন্ন করা। এই কাজটি সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য গিনেজ রেকর্ড প্রতিনিধি ওয়াসিমুল বারি অত্যন্ত নিষ্ঠার পরিচয় দিয়েছেন। তাকে সহযোগিতা করেছেন জার্মান শিল্পী নিমো, বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত আমেরিকান শিল্পী কাজী মশহুরুল হুদা, ভারতের মূকাভিনয় শিল্পী সোমা দাশ, মিরর মাইমের মাহবুব আলমসহ অনেকে। এছাড়া ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশনের সদস্যরা সব সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে রেখেছিলেন যে কোন প্রযোজনে। ব্যক্তিগত ভাবে আমিও এই প্রক্রিয়ার একজন অংশীদার ছিলাম। আমার পরিচালনায় ২৫৪ জন শিল্পী মূকাভিনয়ের তিনটি অ্যাকশন সম্পন্ন করেছিল। টিএসসি’র হল রুমে প্রায় ত্রিশ মিনিট আমি উল্লেখিত শিল্পীদের প্রশিক্ষণ দিই এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে টিএসসির ছাদে ওঠে আবারও মূকাভিনয়ের তিনটি এ্যাকশন করি যাতে মাঠ থেকে সকলে আমাকে অনুসরন করতে পারে। এভাবেই বাংলাদেশের মূকাভিনয় পৌছে গেল বিশ্ব রেকর্ডের দ্বারপ্রান্তে। এখন অপেক্ষা শুধু অফিসিয়াল ঘোষনার। আমি খুব কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম অ্যাকশনকে বিশেষ ভাবে মীর লোকমানকেও।

32567469_1031183940373207_7269168462704934912_nআমি সত্যিকার অর্থেই সম্মানিত এবং মূকাভিনয়ের একজন সুখি মানুষ হওয়ার পথে অগ্রসর হলাম। উত্সবে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতার আয়োজন ছিল। ইমরান আহমেদ, শাহরিয়ার শাওন, দেওয়ান মামুন ভাই’র সাথে আমিও বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছি। সেমিনারের বিষয় ছিল মূকাভিনয় ভাবনা। এই বিষয়ে শ্রদ্ধেয় হুদা ভাই স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে তাঁর ভাবনার জায়গা থেকে মূকাভিনয়কে বিকল্প চিকিত্সা পদ্ধতি হিসাবে তুলে ধরেছেন। এই আলোচনায় জাহিদ রিপন ভাই বাংলার নিজস্ব মূকাভিনয় সম্পর্কে ধারণা দেন, আমি আমার অভিজ্ঞাতার জায়গা থেকে নিজস্বতা, মৌলিকতা এবং থিয়েটার প্রযোজনা কৌশলের সাথে মূকাভিনয়কে সমন্বয়ের কথাবলি। এছাড়া ড. ইস্রাফিল আহমেদ রঙ্গন, ত্রিপুরার গৌতম সাহা বক্তব্য উপস্থাপন করেন। পর্বটি পরিচালনা করেন সানোয়ারুল হক সানি, সূচনা বক্তব্য প্রদান করেন শাহরিয়ার শাওন এবং সভাপতিত্ব করেন খায়রুল বাশার রিজভি। উত্সবের ২য় ও ৩য় দিন সকালে কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয় হুদা ভাই এর পরিচালনায়। মূকাভিনয়ে আগ্রহী ও মূকাভিনয় কর্মীরা রেজিষ্ট্রেশনের মাধ্যমে এই কর্মশালায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। উত্সবের উল্লেখযোগ্য কিছু প্রদর্শনীর কথা বলেই লেখাটির ইতি টানব। হুদা ভাই ট্রান্সফরমেশন নামে একটি ভিন্ন রকমের পরিবেশনা করেন যা সকলেই খুব পছন্দ করেন। আমি এই পরিবেশনাটি বছর চারেক আগে একটি চ্যানেলে দেখেছিলাম হুদা ভাইয়ের সাড়্গাত্কারসহ এবার সরাসরি উপভোগ করলাম।অল্পভাসী এই শিল্পী তার পরিবেশনার মতই ভিন্ন জগতের বাসিন্দা। সোমা মাইম থিয়েটারের সোমা দাশ লাইফ সার্কেল পরিবেশনাটি করে সকলের প্রশংসা পান। তার প্রযোজনাটি জন্ম থেকে মৃত্যু এই শ্বাশত জীবন কাহিনী নিয়ে রচিত। প্রচলিত ধারার এই অভিনয়ে শিল্পীর স্বাবলীল অভিনয় ক্ষমতা দর্শকদের মুগ্ধ করে। জার্মান শিল্পী নিমোর মূকাভিনয় দক্ষতা প্রশ্নাতীত। পরিবেশনা রীতিও চমত্কার। ঢাকা ইউনিভার্সিটি মাইম এ্যাকশনের শাহরিয়ার শাওন খুবই চ্যালেঞ্জিং একটি পরিবেশনা করেন। ৭ মার্চের ভাষনের উপর পরিবেশনাটি তার অভিনয় দক্ষতা প্রকাশ করে। জাপানী শিল্পী দম্পতির সাথে মীর লোকমানের মূকাভিনয়ও আনন্দের খোরাক দিয়েছে দর্শকদের। সাইলেন্ট থিয়েটারের মেজবাহ চৌধুরী- পরিবেশনাটিও ছিল তাত্পর্যময়। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু চেয়ার হলো এই মূকাভিনয়ের বিষয় বস্তু। রংপুরের মিরর মাইমের মাহবুব আলম চাকুরীর ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে কোটা প্রথার প্রতিবাদ জানান। সমসাময়িক এই প্রযোজনাটিও দর্শক গ্রহণযোগ্যতা পায়। আর একটি পরিবেশনার কথা বলবো যেটি শেষ হওয়ার পরও মিনিট পাঁচেক করতালী আর দর্শকদের আনন্দ উলস্নাসে শিল্পটিকেও মহত্ করে তোলে আর মুগ্ধতা জাগানো সেই শিল্পীটি হলেন প্যান্টোমাইম মুভমেন্টের শহিদুল বশর মুরাদ।এছাড়া মাইমট্রুপ, বস্ন্যাক ফ্লেইম থিয়েটার, শ্রম্নতি মাইম এন্ড থিয়েটার, ত্রিপুরা লিটল ড্রামা প্রভৃতি দল প্রদর্শনী করে

তারম্নন্যের এই উত্সবে বাংলাদেশের মূকাভিনয়ের বিজয় যাত্রা শুরু হলো আরও একবার। এই উত্সবটি বাংলাদেশের মূকাভিনয়ের সক্ষমতা প্রকাশ করার সাথে সাথে বিশ্বমূকাভিনয়ের আলোচনার ড়্গেত্র তৈরী করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত্মের মূকাভিনয় শিল্পীরা ভিডিও শুভেচ্ছা বার্তা পাঠিয়েছে উত্সবের সাফল্য কামনা করে। উত্সবকে কেন্দ্র করে মূকাভিনয় শিল্পীদের মিলন মেলা ও পারস্পরিক ভাবনার বিনিময় পরস্পরকে ঋদ্ধ করেছে নিঃসন্দেহে। তবে যে কথা আমি খুব জোড় দিয়ে বলবো তাহলো শিল্পে সমসাময়িক বিষয়, রাজনীতি, প্রতিবাদ ইত্যাদির উপস্থাপনা দর্শককে আনন্দ দিয়েছে, ভাবনার খোরাক দিয়েছে কিন্তু শিল্পের নিজস্বতারড়্গেত্রে কোন কিছু চোখে পড়েনি। আমি নিজস্বতা বলতে বাংলাদেশের প্রেড়্গিতে দেশজ সংস্কৃতির প্রকাশ এবং উপস্থাপনায় দেশজ কৃষ্টির ব্যবহারের উলেস্নখ করতে চাই। বাংলাদেশের গান, নাচ, নাটকের নিজস্বতা থাকলে মূকাভিনয়েরও নিজস্বতা থাকা খুবই স্বাভাবিক একটি ঘটনা মাত্র। মূকাভিনয়ের শিল্পরূপ অনুসন্ধনে বাংলাদেশের হাজার বছরের সংস্কৃতির চর্চা ও অনুশীলনের মাধ্যমে বাংলার মূকাভিনয়ের স্বরূপ উন্মোচনে সকলেই সচেষ্ট হবে এটাই হোক আমাদের আগামীর শপথ।

লেখক: সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ মূকাভিনয় ফেডারেশন।

 

Comments

comments