ঢাকা, শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮ | ০৭ : ০৯ মিনিট

অশোক মিত্র। ছবি : সংগৃহীত

অশোক মিত্র। ছবি : সংগৃহীত

আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টা চলে গেলেন ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী, প্রাবান্ধিক অশোক মিত্র। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০। তিনি দীর্ঘ দিন ধরেই বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় । ভর্তি ছিলেন কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে।

১৯২৮ সালের ১০ এপ্রিল তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন অশোকবাবু। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক স্বাধীনতার পর ভারতে আসেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সুযোগ দেয়নি। তারপর বারাণসীর হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এম এ করেন। ১৯৫৩ সালে নেদারল্যান্ডসের রটারড্যাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে ডক্টরেট হন। ধীরে ধীরে বামপন্থায় গা ভাসান অশোকবাবু। ১৯৭০ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হন। সেই পদে ছিলেন দুবছর। ১৯৭৭ সালে প্রথম বামফ্রন্ট সরকারের অর্থমন্ত্রী হন। দশ বছর মন্ত্রিত্ব করেন তিনি। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর সঙ্গে মতবিরোধ হয়েছিল বহু ক্ষেত্রে। ১৯৮৬ সালে সিপিএম থেকে ইস্তফা দেন অশোকবাবু। ১৯৯০ সালে রাজ্যসভার সাংসদ নির্বাচিত হন। সেই সময় শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যানের পদও অলংকৃত করেন।

এহেন অশোক মিত্রের কলম চলেছে অবিশ্রান্ত। তাঁর কলমে একই সঙ্গে রয়েছে রস, অসাধারণ বিশ্লেষণ আর ঝাঁঝ। অনেকটা পূর্ব বাংলার সরষে ইলিশের মতো- স্বাদে গন্ধে পরিবেশনায় একই সঙ্গে জিভ আর চোখে জল আনে। পাঠক তাঁর লেখার শাসন আর ব্যঙ্গে ত্রস্ত হয়ে ওঠেন তবু শেষ পর্যন্ত পাঠ ছেড়ে ওঠা যায় না।

তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা হ’ল, ‘আপিলা-চাপিলা’, ‘সমাজ সংস্থা আশানিরাশা’, ‘কবিতা থেকে মিছিলে’, ‘প্রধানত অপ্রসঙ্গ’ প্রভৃতি । ইংরাজীতেও তাঁর লেখার সংখ্যা অনেক তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হ’ল, ‘Calcutta Diary’, ‘Nowhere’, ‘First Person Singular’, ‘Terms of Trade and Class Relations’, ‘China-Issues in Development’, ‘ From the Ramparts’, ‘Prattler’s Tale: Recollections of a Contrary Marxist’ (আপিলা-চাপিলার অনুবাদ) ইত্যাদি।

অসাধারণ এই ব্যক্তিত্ব সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত ।

কথাসাহিত্যিক শচীন দাশের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে থেকে অশোক মিত্রের কিছু স্মৃতিচারণা:
স্মৃতির ওপর আমাদের দখলদারি নেই। অবচেতন বলে একটি কথা শুনতে পাই। কিন্তু দৈনন্দিন চলাফেরায় তার তো হদিস নেই। স্মৃতি তাই, অন্তত আমার নিজের যা মনে হয়, ঈষৎ খামখেয়ালে এগিয়ে চলে। কিংবা পিছিয়ে যায়। অথবা পিছলে পড়ে। আরো যেটা বাস্তব, স্মৃতি কোনো স্থিরবিন্দুতে দাঁড়িয়ে থাকে না। আজ যে-বিষয়ে একটি বিশেষ রূপ নিয়ে স্মৃতি মঞ্চে হাজির হলো, কালও হয়তো তাকে দেখছি ওই একই মঞ্চে। কিন্তু আদলটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

ঠিক এই মুহূর্তে আমার জন্মস্থান ঢাকা শহরে, শৈশব-কৈশোর, প্রথম যৌবনের স্মৃতি খুঁড়তে খুঁড়তে আমি অদ্ভুত একটি আবিষ্কারে পৌঁছলাম। হঠাৎ গত কয়েক প্রহর ধরে শৈশব-কৈশোরের দুটি স্মৃতি মনকে অবিরাম ঘা মেরে যাচ্ছে। দৃশ্যের স্মৃতি নয়, বন্ধুত্ব বা প্রথম প্রেমের ফিকে হয়ে যাওয়া, মন-খারাপ করা, মন-ভালো করা নয়, কোনো কবিতা বা গানের স্মৃতি নয়, দুটি আলাদা রান্নার সৌরভ আমাকে আচ্ছন্ন করে আছে। প্রশ্রয় পেলে খুলে বলি।

আমার এক ঘনিষ্ঠ গুরুজন জীবনে সফল হতে পারেননি। বিশেষ কাজকর্ম করতেন না। একান্নবর্তী যথেষ্ট বড়ো পরিবার, সম্ভবত বিবেক-পীড়িত হয়ে মধ্যবয়সে সামান্য একটি ব্যবসায়ে ঝুঁকলেন। আমাদের বেচারাম দেউড়ি ও মীর আতার গলির সংযোগস্থলে স্থিত বাড়ির পেছনদিকে অনেকটা খালি জায়গা ছিল, ঠিক কবরখানা ঘেঁষে। গুরুজন মহোদয় সাত-আট কাঠা পরিমাণ জমি নিয়ে একটি কয়লার দোকান খুললেন। বড়ো ডিপো থেকে পাইকারি হারে রান্নার কয়লা কিনে এনে ডাঁই করে মজুত করা হতো। ঝাঁকা-মুটেরা সকাল থেকে ভরদুপুর পর্যন্ত একমণ, দেড় মণ, দুই মণ কয়লার বস্তা কাঁধে চাপিয়ে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসত। সম্ভবত সাত-আট দফা সকাল থেকে শুরু করে দুপুর পর্যন্ত কয়লা পৌঁছে দিয়ে এসে শ্রান্ত-বিধ্বস্ত শরীরে দোকানে ফিরে আসত। হিসাব মিলিয়ে পয়সাকড়ি দাখিল করত। তারপর দোকানেরই এক কোণে ইট দিয়ে ঘেরা কাঁচা উনুনে নিজেদের রান্না বসাত। লাল মোটা চালের ভাত, মসুর ডাল, রান্না নামিয়ে গরম ধোঁয়া-ওঠা ভাতের সঙ্গে সম্ভার দেওয়া ডাল, নুন এবং একটু কাঁচা লঙ্কা ঘেঁটে পরম তৃপ্তির সঙ্গে খেত তারা দু-তিনজন (পরে একটু সভ্যভব্য হয়ে সম্ভারকে ‘ফোড়ন’ বলে উল্লেখ করতে শিখি)। আমার বয়স তখন বড়জোর পাঁচ কি ছয়, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুটা বিস্ময় নিয়ে তাদের ভক্ষণ প্রক্রিয়া দেখতাম। কী মসলা তারা সম্ভারে যে ব্যবহার করত জানতাম না, কিন্তু একটি আশ্চর্য সুন্দর মোহময় গন্ধ নাকে এসে লাগত। তারা আদর করে আমাকে দু-এক গ্রাস সেই অমৃত আহারে অংশগ্রহণ করতে আহবান জানাত। বাড়িতে মায়েদের কড়া অনুশাসন সত্ত্বেও, এদিক-ওদিক তাকিয়ে ঝাঁকা-মুটেদের সাদর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে সেই সৌরভ-আচ্ছন্ন মসুরের ডাল আস্বাদন করতাম। তার স্বাদ যদিও এখন আর স্পষ্ট মনে আনতে পারি না, তবে ওই ওই বিশেষ গন্ধটি কিন্তু আমাকে প্রহার করে ফেরে। অমন সুন্দর গন্ধ আর কখনো অন্য কোনো সূত্র থেকে আহরণ হয়নি আমার। সাদামাটা গন্ধ কিন্তু অপূর্ব। গরিব লোকের অতি সস্তা খাদ্যের গন্ধ কিন্তু অনির্বচনীয় সৌরভ। পৃথিবীর পথে কম হাঁটা হয়নি, সেই সৌরভের প্রতিদ্বন্দ্বী এখন পর্যন্ত কোথাও খুঁজে পাইনি।

একটু হয়তো ভুল বললাম, কারণ পাশাপাশি অন্য একটি গন্ধের সৌরভও আমাকে এখন মুগ্ধ করে রেখেছে, সেটা কিন্তু আমার সঙ্গে আরো অনেকেই একদা সমান উপভোগ করেছেন। মাঝে মাঝেই সেই সৌরভও আমাকে তাড়া করে ফেরে। শৈশব ফেলে কৈশোরে পৌঁছেছি। কৈশোর পেরিয়ে ক্রমশ তীব্র তারুণ্যে ঢাকা থেকে বছরে একবার-দুবার স্বপ্নের নগরী কলকাতায় যাওয়ার সুযোগ ঘটে। ফুলবেড়িয়া স্টেশন থেকে সকাল দশটা-এগারোটা নাগাদ ঝিমোনো ট্রেনে পাটের ব্যস্ত বন্দর নারায়ণগঞ্জ, সেখান থেকে ভরদুপুর ধলেশ্বরী, পদ্মা পেরুনোর ছোট স্টিমার, যার মালিক বিলিতি কোম্পানি, রাত সাড়ে নটা-দশটা নাগাদ গোয়ালন্দে পৌঁছে গোয়ালন্দ-ঢাকা মেলে চাপা। একটু একটু করে ভোর হচ্ছে। নৈহাটি পেরিয়ে ব্যারাকপুর, ব্যারাকপুর পেরিয়ে দমদম, ট্রেনের কামরায় সদ্য ঘুম ভাঙা চোখে আমাদের অতি শিগগির সেই জাদুকরী শহর কলকাতায় পৌঁছোনোর অধৈর্য প্রতীক্ষা। কিন্তু মুখ্য স্মৃতি সেই নারায়ণগঞ্জ থেকে গোয়ালন্দের স্টিমারযাত্রা। না, তাও নয়। ওই স্টিমারে দ্বিতীয় ডেকের মাঝামাঝি জায়গায় খাবার ব্যবস্থা। একমাত্র খাবার মুরগির ঝোল, শ্বেতশুভ্র-শ্মশ্রুমন্ডিত এক গম্ভীর মধ্যবয়েসি বাবুর্চি মুরগির মাংস রাঁধছেন, এক লম্বা টেবলে একসঙ্গে কুড়িজন উদ্গ্রীব, ক্ষুধার্তের ঠাসাঠাসি ভিড়। সেই মুরগির রান্নার আশ্চর্য সুগন্ধ তাদের নাকে ধাক্কা মারছে। কিন্তু সেই গন্ধ ওখানেই আটকে থাকছে না। ডেকজুড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটু দূরে গেলেই গন্ধটা ফিকে। খাবার জায়গার কাছাকাছি এলেই ঘ্রাণেন অর্ধভোজনম। একটি সাদা প্লেটে স্তূপ করে ভাত সাজানো। পাশে একটি কি দুটি মুরগির মাংসের টুকরো। সেইসঙ্গে এক অপার্থিব স্বাদের আলু। যারা খাচ্ছেন তারা অমৃত আস্বাদ করছেন, যারা বাইরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে দেখছেন তাদের তৃপ্তি-অতৃপ্তি ভাগাভাগি হয়ে যাচ্ছে। অতৃপ্তির কারণ, ভেতরে ঢুকে একটাকা বা পাঁচসিকে খরচ করে মুরগির মাংস খাওয়ার রেস্তটুকু তাদের নেই। সেই গন্ধের আহরণটুকু গ্রহণ করতে পেরেছেন বলেই মুরগির মাংসের সেই গলে যাওয়া, অথবা গলে না-যাওয়া আলুর ও সেইসঙ্গে সেই আশ্চর্য ঝোলের সম্মিলিত সম্ভোগ এখনো স্মৃতিতে ফিরে আসে। কিন্তু সেই স্বাদের স্মৃতি উত্তরণ করে টিকে থাকে সেই গন্ধেরই স্মৃতি।

জীবনে এ-পাড়া, ও-পাড়া, বে-পাড়া, সৌভাগ্যের চুড়োয় উঠে যাওয়া দেশ, উচ্ছন্নে যাওয়া দেশ, সাদামাটা ম্যাড়মেড়ে দেশ অনেক ঘোরা হয়েছে। কিন্তু কোথাও আর সেই ঝাঁকা-মুটের রান্নার সম্ভারের গন্ধের তুলনা পাইনি। পাইনি স্টিমারের রান্না মুরগির মাংসের সেই পরমাশ্চর্য গন্ধ – এই যুগ্ম গন্ধের স্মৃতি আমাকে হঠাৎ আবার জীবনের চরিতার্থতা কী, তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়।

 

 

Comments

comments