ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ০৩ : ১৪ মিনিট

shahadar Parvezশুরুতেই বলে রাখি, কোটা সংস্কারের মতো যৌক্তিক দাবির পক্ষে আমি ছিলাম। যেমনটা কোটা বাতিলের পক্ষে এখন আমি নই। তাহলে সমাজে পিছিয়ে পড়াদের কী হবে? শিক্ষার্থীরা যার যার অবস্থান থেকে পথে নামলো। পুলিশের টিয়ার-শেল, রাবার বুলেট, লাঠিপেটা, গ্রেফতার সহ্য করেও তারা আন্দোলন চালিয়ে গেল।

একটি ছবিতে দেখলাম, একদিকে কয়েকশ পুলিশ, অন্যপাশে নির্ভীক দাঁড়িয়ে আছে এক ছাত্র। নিশ্চল ও দৃঢ় তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি। পেছনে সুনসান অন্ধকার। মৃত্যুতে কতখানি অকুতোভয় হলে এমনটা থাকা যায়- সেটাই ভাবনাতে আঘাত দেয় বার বার। দাবি আদায়ে দেশ একরকম স্থবির হয়ে পড়ে, বিশেষ করে ঢাকা শহর। ছাত্রদের দমন-পীড়ন করে চূড়ান্ত অর্থে যে কোনো ফলই হয় না, সেটাই যথারীতি প্রমাণিত হলো।

সরকারি চাকরিপ্রার্থীদের সামনে এমন একটি বিষফোঁড়া অবশেষে কাটলো। তবে এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমার মনের ভেতর কিছু প্রশ্ন পড়ে রইলো আধুলির মতো। মোটা দাগে আমার প্রশ্ন, আজ যারা আন্দোলন করল, তারা সবাই কি মেধাবী? তারা সবাই কি বি.সি.এস পরীক্ষাপ্রার্থী? মোট কথা, তারা সবাই কি সরকারি চাকরি প্রত্যাশী? তাই যদি হয়, তবে আজ যে ছেলে বা মেয়েটি সাংবাদিকতা বিভাগে পড়ছে, তাহলে সে কেন এই আন্দোলনে শরিক হলো? তবে কি সেও চূড়ান্ত অর্থে সরকারি চাকরি চায়? তবে কেন অকারণে এই বিভাগে পড়া? তাহলে কি এই প্রশ্ন থাকে না, শিক্ষাজীবনে সাবজেক্ট কোনো ফ্যাক্টর নয়, সার্টিফিকেটটিই মুখ্য।

গোটা একটা প্রজন্ম কি তবে সরকারি চাকরিজীবী হিসেবেই নিজেদের দেখতে চাচ্ছে তাহলে? তাহলে কি এর মধ্যে কেউ চিত্রশিল্পী হতে চায় না, কেউ খেলোয়াড় হতে চায় না, কেউ বিজ্ঞানী হতে চায় না, কেউ চিত্রপরিচালক বা অভিনেতা হবে না, কেউ সংগীত শিল্পী বা নৃত্যশিল্পী হবে না? (লেখক হওয়ার কথা বাদই দিলাম। কারণ লেখালেখি করে বাংলাদেশে দু-বেলা ভাত জোটানো রীতিমতো স্বপ্ন-সমান। আর রাজনীতিক হওয়ার স্বপ্ন তো বর্তমানের রাজনীতিবিদেরাই গলা টিপে মেরেছে)।

তার মানে, সবাই গণহারে সরকারি চাকরিজীবী হতে চায়। কেন হতে চায়, তার উত্তর খুবই স্পষ্ট। নির্ঝঞ্ঝাট এক নিশ্চিত জীবন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবৈধ উপায়ে সচ্ছল জীবনের হাতছানি। একটা জাতি বা রাষ্ট্র কি কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের নিয়েই বাকিটা পথ চলতে চাচ্ছে?

আজকের এই আন্দোলন এটা প্রমাণ করে না যে, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা কতখানি তৃষিত এ জীবনের পথে চলতে? কেননা সমাজ ও রাষ্ট্র তাদের শিখিয়েছে, জীবনে স্থিতিশীল চাকরি কতখানি কাঙ্ক্ষিত ভাবতে হয়। তা না হলে যে জীবনের ষোল আনার চোদ্দ আনাই ব্যর্থ হয়ে যাবে!

ছবিটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

ছবিটি ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

ব্যক্তিগতভাবে আমি কখনো চাকরিজীবী হতে চাইনি; চেয়েছিলাম পেইন্টার বা ক্রিকেটার হতে। অথচ জীবনের বাস্তবতায় আজ ‘চাকরি’ নামক এক চাকর-বৃত্তিতে নিয়োজিত আছি। বলতে গেলে উপায়ান্তর না পেয়ে বরং করতে হচ্ছে। এটা তো সত্য, চাকরি ছাড়াও মানুষ বাঁচে, বেঁচে থাকে। অনেকে বরং বেশ ভালোভাবেই বেঁচে আছে।

যারা ব্যবসায়ী, তারা তাদের প্রতিষ্ঠানে অন্যকে চাকরি দেয়, নিজে চাকরি করে না। এর পেছনে না-হয় মোটা অঙ্কের অর্থের যোগ আছে। সবার সেই সামর্থ্য বা ক্ষমতা নেই, এটাও সত্য। কিন্তু ক্ষুদ্র উদ্যোক্ত হওয়ার মতো চ্যালেঞ্জ তো নেওয়া যেতেই পারে।

আমি বলতে চাই, মুখস্থবিদ্যাধারীর বাইরেও মেধাবী মানুষ আছে। হয়তো তারা বি.সি.এস ক্যাডার হতে পারে না। নাই-বা হতে পারে, তাতে কী? আচ্ছা, বি.সি.এস পরীক্ষায় যেসকল ব্যক্তিত্বের ওপর পড়াশুনা করতে হয়, তারা কেউ কি বি.সি.এসধারী ছিলেন? সবাই কি সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন? না, ছিলেন না। তবে তারা মেধাবী ছিলেন। সেই মেধা- প্রজ্ঞার মেধা, সেই মেধা- সৃজনশীলতার মেধা। ভাবুন তো, একটা গোটা দেশে সবাই সরকারি চাকরিজীবী। অন্য কোনো পেশায় কেউ নেই। টিভি খুলে দেখললেন, সরকারি চাকরিজীবীরা যে যার মতো টকশো করছে। আর কোনো খবর নেই। কারণ খবর সংগ্রহের জন্য কোনো সংবাদকর্মীও নেই। একবার ভাবুন তো কেমন হবে পুরো ব্যাপারটা?

অঞ্জন আচার্য : কবি, লেখক ও গবেষক

Comments

comments