ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮ | ০৪ : ১৭ মিনিট

আজ জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেছে।বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক নির্মাণ কতটুকুই বা হয়েছ।এর আশা ও আশঙ্কা নিয়ে লিখেছেন নির্মাতা শাহ ওয়ালিদ আকরাম

thamsএকটি সুষম চলচ্চিত্র সেটি ফিকশন বা নন-ফিকশন কিংবা ন্যারেটিভ বা নন-ন্যারেটিভ যেকোনো ফর্মেই হোক না কেন? দর্শকের কাছে এর আবেদন চলচ্চিত্র হিসেবেই। নির্মাতার সৃজনী ক্ষমতার চুড়ান্ত রূপটা দেখেন দর্শক। তাই দর্শককে কখনই অগ্রাহ্য করা যায় না। তবে এখানে উল্লেখ করা অত্যাবশ্যকীয় যে- শুধুমাত্র জনপ্রিয়তার বা ব্যবসায় সফলতার উপর বিচার না করে সাধারণ দর্শকের কাছে তা কতখানি গ্রহণযোগ্য। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে আমরা সঠিকভাবে দেখতে পাবো স্বাধীন জাতি হিসেবে অদ্যাবধি আমাদের চলচ্চিত্র শিল্প ঠিক কতটুকু পরিপক্কতা অর্জন করেছে।

এই পরিসরে শুধু আমাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি নিয়েই বলতে চাই। বছর তিনেক পরেই আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে অর্ধশত বছর উদ্যাপন করতে যাচ্ছি। আমাদের একদিকে যখন গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং এর সমান্তরালে আছে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য গণত্যার ইতিহাস।সারা বিশ্বজুড়ে নব্যমৌলবাদ এবং জঙ্গীবাদ মাথাচারা দিয়ে উঠছে, সেখানে আমাদের পশ্চাদপদ চিন্তা ও সাম্প্রদায়িক মোটিভগুলোকে দূর করতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস জানাটা আবশ্যক।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জহির রায়হায়নের স্টপ জেনোসাইড, এ স্টেট ইজ বর্ন, আলমগীর কবির ও বাবুল চৌধুরী পরিচালিত লিবরেশন ফাইটার্স বা আলমগীর কবিরের এক সাগর রক্তের বিনিময়ে তখন শুধু বাঙালি জনমনে নয়, মানবতার সপক্ষে বিশ্ববাসীকেও আলোড়িত করেছিল এই চলচ্চিত্রগুলো।

তারপর যুদ্ধোত্তর ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত চাষী নজরুল ইসলামের ওরা ১১ জনসংগ্রাম, সুভাষ দত্তের অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী, মমতাজ আলীর রক্তাক্ত বাংলা ইত্যাদি চলচ্চিত্রসমূহ বেশ নন্দিত ও আলোচিত হয়। ১৯৭৫ এ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা্লের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের নির্মাণ কমতে থাকে। এর পরবর্তীকালে হারুনর রশীদের আমরা তোমাদের ভুলবো না, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর একাত্তরের যীশুগেরিলা, চাষী নজরুল ইসলামের হাঙর নদী গ্রেনেড, হুমায়ূন আহমেদের আগুনের পরশমণিশ্যামল ছায়া, মোরশেদুল ইসলামের আগামী, তানভীর মোকাম্মেলের রাবেয়া, দেবাশীষ সরকারের শোভনের একাত্তর, কবরী সারওয়ারের একাত্তরের মিছিল, মান্নান হীরার একাত্তরের রং পেন্সিল বেশ উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র।

মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের এই সংখ্যাটা সত্যিই বেশ হতাশ করবার মতোই। এই স্বল্প পরিসংখ্যান দেখে মনে হয় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র কি আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা নেই? নাকি নির্মাণশৈলী ও দক্ষ নির্মাণকৌশলের ঘাটতির জন্য দর্শককে এই চলচ্চিত্রগুলো খুব একটা টানছে না? আবার এটাও হতে পারে, পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে ইতিহাসনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য ভালো চিত্রানাট্যও তৈরি হচ্ছে না এবং নির্মাতারাও খুব একটা আগ্রহী হচ্ছেন না।

আমরা যদি ইউরোপ বা আমেরিকার ইতিহাস নির্ভর চলচ্চিত্রগুলো পর্যবেক্ষণ করি, তাহলে প্রথমেই দেখা যায় কী নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে স্ক্রীপ্ট রচনা হচ্ছে, তারপর অসাধারণ চিত্রনাট্য এবং দারুণ নির্মাণশৈলী। সকলের কাছেই তা সমাদৃত হচ্ছে।

কিন্তু আমাদের দেশে এমন চলচ্চিত্রে নির্মাণে এখনও পেশাদারিত্বের অভাব রয়েছে। এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ নন রাষ্ট্রীয় চলচ্চিত্র সংস্থাগুলো । গতানুগতিক পুরোনো কায়দায় কাজ হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে।এভাবে চলতে থাকলে  আমাদের চলচ্চিত্র আরও পিছিয়ে পড়বে দিন দিন।

২০১২ সাল থেকে ৩ এপ্রিল জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস পালন করছি এবং এটা আমাদের জন্য খুবই ইতিবাচক এবং আশা জাগানীয়া। বর্তমান সরকার চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু উদ্যাগে নিয়েছেন এজন্য প্রশংসানীয়। আমাদের আশা থাকবে এই উদ্যাগেগুলো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন হবে। না হলে আমাদের আজকের সামান্য অবহেলা বা অবজ্ঞা ভবিষ্য প্রজন্মকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করতে পারে। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো সচেতনভাবে যদি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণের উপর বিশেষভাবে জোর দেন এবং এর জন্য পর্যাপ্ত অনুদান ও প্রণোদনার সুযোগ তৈরি করেন তবে আমরা ইতিহাস সচেতন এক তরুণ প্রজন্ম পাবো।

শেষে এই বলব, প্রাপ্তির পাশে অপ্রাপ্তি থাকবেই, এটাই বাস্তবতা। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে অপ্রাপ্তির মেঘ যেন প্রাপ্তির সূর্যকে ঢেকে না ফেলে। তাহলেই আমাদের আশা জেগে থাকবে, দূঢ় হবে আশঙ্কা।

জয় হোক বাঙলা চলচ্চিত্রের।

শাহ ওয়ালিদ আকরাম : চলচ্চিত্র নির্মাতা

Comments

comments