ঢাকা, সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮ | ১১ : ২৯ মিনিট

March 22nd, 2018

Kakon-Bibi_Swapno71সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধা কাকন বিবি গতকাল বুধবার রাত ১১টায় সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চলে গেলেন না ফেরার দেশ। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ১০৩ বছর।

শ্বাসকষ্ট নিয়ে গত সোমবার এই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন শতবর্ষী কাকন বিবি। এর আগে গত বছর জুলাইয়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর কয়েকদিন হাসপাতালে ছিলেন তিনি।

কাকন বিবির জন্ম ১৯১৫ সালে ভারতের মেঘালয়ের নেত্রাই হাসিয়া পল্লীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন পাহাড়ি খাসিয়া সম্প্রদায়। ১৯৭০ সালে তাঁর বিয়ে হয় সুনামগঞ্জ জেলার দোয়ারবাজার উপজেলার জিরারগাঁও গ্রামে শাহেদ আলীর সঙ্গে। তখন তাঁর নাম হয় নুরজাহান বেগম।

দেশে তখন চলছে তুমুল যুদ্ধ। কাকন বিবির সন্তান সম্ভবনা। যুদ্ধ দেখে প্রত্যেকদিন যুদ্ধে ছুটে যাওয়ার জন্য মনটা পড়ে থাকতো। ১৬ মার্চ তার কোলে জুড়ে এলে সখিনা। সখিনার জন্য স্বামী শহীদের সঙ্গে লেগে যায় খুনসুটি। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। সখিনার বয়স তখন তিন দিন।

তার বোনের বিয়ে হয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর একজন কমান্ডারের সঙ্গে, বোনের সঙ্গে তিনিও চলে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দোয়ারাবাজার সীমান্তের কাঁঠালবাড়ি এলাকায়। সেখানে পাঞ্জাবী ইপিআর আব্দুল মজিদ খান সঙ্গে পরিচয় হয়। এপ্রিল মাসে কোনো একদিন তাঁরা বিয়ে করেন। স্বামীর সঙ্গে দুই মাস থাকার পর কাকন বিবি তাঁর মেয়ে সখিনাকে আনতে যান।

মেয়েকে নিয়ে সিলেট আসার পর পড়েন আরেক যন্ত্রণায়। সেখানে তিনি তাঁর স্বামী মজিদ খানকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না।  জানতে পারেন স্বামীকে দোয়ারাবাজার সীমান্ত এলাকার কোনও এক ক্যাম্পে বদলি হয়ে চলে গেছেন। স্বামীর খোঁজে তিনি জুন মাসে সিলেট থেকে দোয়ারাবাজার সীমান্তে যান।

চারদিকে তখন মুহুমুহু যুদ্ধ চলছে। শিশু সখিনাকে আগের স্বামীর বাড়িতে রেখে দোয়ারাবাজারের টেংরাটিলা ক্যাম্পে তিনি স্বামীকে খুঁজতে যান। কিন্তু পাননি। তখন পাকিস্তানি বাহিনীর সেনারা তাঁকে আটক করে বাঙ্কারে নিয়ে যায়। বাঙ্কারে রেখে কয়েকদিন চলে নির্যাতনের পর নির্যাতন।

স্বামীর আশা বাদ দিয়ে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠেন কাকন বিবি। জুলাই মাসে তিনি স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। দেখা হয় মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর সঙ্গে।তিনি তখন নিয়ে যান লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মীর শওকতের কাছে। তারপর মীর শওকত তাঁকে গুপ্তচরের দায়িত্ব দেন।

কাকন বিবি সাহসিকতার সঙ্গে গুপ্তচরের কাজ করতে থাকেন। গুপ্তচরের কাজ করতে গিয়ে পশ্চিম বাংলাবাজারে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে তারা তাকে একনাগাড়ে সাত দিন নির্যাতন চালায়। পরে তাঁকে অজ্ঞান অবস্থায় মৃত ভেবে ফেলে রেখে যায়।

সাতদিন পর তাঁর জ্ঞান ফিরে এলে মুমূর্ষু অবস্থায় বালাটে নিয়ে চিকিৎসা করানো হয়। চিকিৎসা শেষে পুনরায় তিনি বাংলাবাজারে আসেন। সেখানে তিনি মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলীর কাছে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেন। রহমত আলীর দলের সদস্য হয়ে অস্ত্র সহকারে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন।

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে টেংরাটিলায় পাকসেনাদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে করেন তিনি। সেই যুদ্ধে কয়েকটি গুলি তার শরীরে বিদ্ধ হয়। টেংরাটিলা যুদ্ধের পর আমবাড়ি, বাংলাবাজার, টেবলাই, বালিউরা, মহব্বতপুর, বেতুরা, দুর্বিনটিলা, আধারটিলাসহ প্রায় নয়টি স্থানে তিনি অস্ত্রসহকারে যুদ্ধ করেন। আমবাড়ি বাজার যুদ্ধে তার পায়ে গুলি লাগে। নভেম্বর মাসের শেষদিকে তিনি রহমত আলীসহ আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে জাউয়া ব্রিজ অপারেশনে যান। ব্রিজ অপারেশনে তারা সফল হন। এভাবেই যুদ্ধে যুদ্ধে দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কাকন বিবি দোয়ারা বাজার উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের ঝিরাগাঁও গ্রামে এক ব্যক্তির কুঁড়েঘরের বারান্দায় মেয়ে সখিনাসহ আশ্রয় নেন।

স্বাধীনতার পর তিনি দীর্ঘ দিন লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলেন।

Comments

comments