ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮ | ১২ : ৪৫ মিনিট

March 11th, 2018

Anis-Boi_Alo Adarer Jatriউপন্যাসটি একদিনেই পড়ে ফেলতে পারতাম। কিন্তু সময় লাগল দুইদিন। বিভিন্ন ব্যস্ততার কারণে তা হয়ে ওঠেনি। ঝরঝরে ভাষা। সহজ করে ইতিহাস বলে যাওয়া। অনেক অজানা তথ্য জানা যায়। বলার ভঙ্গিটাও অসাধারণ। চরিত্রগুলো যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। লেখক তাঁর ভূমিকায় লিখেছেন এটা তাঁর উপন্যাস। ইতিহাস নয়। তবে আমার কাছে ইতিহাসেই মনে হয়েছে। সত্য ঘটনাগুলোকে এতোটাই নিখুঁত করে তিনি ফুটে তুলেছেন যেন সেই সময়ে তাঁদের সঙ্গে তিনি থাকতেন।

এর আগের লেখকের অনেক বই পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। তবে, এই সিরিজের তিনটি বইয়ের মধ্যে যারা ভোর এনেছিল (২০১২) ও আলো–আধাঁরের যাত্রী পড়া হলো। পড়া হয়নি উষার দুয়ারে

বইয়ের প্রতিটি পাতায় পাতায় বাংলাদেশ হয়ে ওঠার গল্পটা তিনি লেখার চেষ্ঠাটা করেছেন। তা তিনি স্বার্থকও বটে। এই দেশের জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নেতা–কর্মীদের সংগ্রাম, ত্যাগ, পরস্পর ভালোবাসা, শ্রদ্ধার কথা অকপটে বলেছেন তিনি। ভাসানীর সংগ্রাম–অভিমান, জাতির পিতার সংগ্রাম–পরিবার–জীবনযাত্রা, তাজউদ্দিন আহমদের সরলতা–নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাওয়ার কথা উল্লেখ্য করার মতো।

বঙ্গবন্ধুর লিডার ছিল সোহরাওয়ার্দী। তবে তিনি কখনো ভাসানী–শেরে বাংলাকে অশ্রদ্ধা করতেন না।‘লিডার’ সোহরাওয়ার্দী এই দেশের মানুষ সর্ম্পকে বলেছিলেন,

এই দেশের মানুষ গণতন্ত্রের পূজারি। নূরুল আমীন যে শ্বাসরোধকারী পরিবেশ তৈরি করেছিল, তার ফল তিনি পেয়েছিলেন। টাঙ্গাইলে যে একটামাত্র উপনির্বাচন হয়েছিল, তাতে তিনি হেরে গিয়েছিলেন। ভয়ে আর ৩২টা উপনির্বাচন বন্ধ করে রেখেছিলেন।

গণতন্ত্রের কথা বলতে বলতে অলি আহাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর কথাটা এভাবে লেখক তুলে ধরেছেন।

গামছায় মাথা মুছতে মুছতে মুজিব বিড়বিড় করেন। এত দিনেও খাবার জোগাড় করে উঠতে পারল না তারা। কতবার বলা হলো, খাদ্য আমদানি করো। করল না।
আসলে গণতন্ত্র না থাকলে মানুষের মুখের গ্রাসও জোটে না।

বঙ্গবন্ধুর সংসারে জীবনের সঙ্গী বঙ্গমাতা রেনুর ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। কিভাবে তিনি সংসারটাকে আঁগলে ধরে রাখতেন।বঙ্গবন্ধুকে নানা বিষয় পরামর্শ দিতে তা জানা যায়। বইয়ের একটা জায়গায়–

ছেলেমেয়েরা ঘুমিয়ে পড়েছে। মুজিব আর রেনু জেগে আছেন। রেনু পানের বাটা নিয়ে বসেছেন। যত্ন করে পান সাজাবেন। জাঁতি দিয়ে সুপুরি কাটছেন। রেনু বললেন, ‘সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে বাসায় দাওয়াত দেও। উনি বাসায় আসবেন না?’
মুজিব বললেন, ‘খুব ব্যস্ত উনি। মনে হয় ওনাকে করাচিতে প্রধানমন্ত্রী করবে। প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মির্জার সাথে ওনার কথা হচ্ছে। আমাদেরও করাচি যেতে হবে মনে হচ্ছে।’
রেনু বললেন, ‘তোমাকে কোন মন্ত্রণালয় দিবে?’
মুজিব বললেন, ‘আগামীকাল ঘোষণা করবে। আমি দুর্নীতি দমন বিভাগ চাইছি। দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করতে হবে। এটা আমার একটা চ্যালেঞ্জ। কেউ ঘুষ দিবে না, কেউ ঘুষ খাবে না।’
রেনু বললেন, ‘তোমাদের এক নম্বর দায়িত্ব কিন্তু মানুষের মুখে খাদ্য জোটানো।’

মুজিব ও রেনুর মধ্যে যে কী মধুর সর্ম্পক ছিল তা এই অংশটা পড়লেই বুঝা যায়–

‘মুজিব মাথা মুছলেন গামছা দিয়ে। রেনু বললেন, ‘ভিজলা কেমন করে?’
‘ইচ্ছা করে ভিজলাম। বাংলার মাটি বাংলার জল পুণ্য হোক। পুণ্য জল স্পর্শ করলাম আরকি!’
‘মাথার মধ্যে এটা কী?’
‘কী!’
‘একটা পাতা। কাঁঠালচাঁপাগাছ থেকে পড়ছে বোধ হয়’—রেনু পাতাটা হাতে নিয়ে নিরীক্ষণ করতে করতে বললেন।
বাথরুম থেকে ফিরে মুজিব ডাইনিং টেবিলে বসলেন। মুজিবের থালায় ভাত তুলে দিলেন রেনু। নিজেও ভাত নিলেন পাতে। মুজিব দলা ভাত পছন্দ করেন। রেনু আবার পছন্দ করেন ঝরঝরে ভাত।
রেনু তরকারি তোলেন মুজিবের পাতে। একটুখানি লাউশাক, আর ছোট মাছের চচ্চড়ি। তারপর আস্তে আস্তে বললেন, ‘এত পরিশ্রম করছ, তোমার শরীর তো ভেঙে পড়বে।’
মুজিব বললেন, ‘পরিশ্রম করা তো অভ্যাস আছে। বরং জেলখানায় গেলে মুশকিল হয়। পরিশ্রমের অভাবে শরীরে রোগ জমে। তাই তো জেলখানায় নানা কাজ বাইর করে নিই। বাগান করি।’

আমার কাছে একেবার অজানা ছিল ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী (পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী) মোরারজি দেশাই কথাটা। তিনি রোজ এক গেলাস করে নিজের মূত্র পান করতেন।

তাজউদ্দীন আহমদের সাইকেলের বর্ণনাটাও নতুন মনে হয়েছে–

সাইকেলে একটা নতুন সিটকভার লাগিয়েছেন। সবুজ রঙের। সেটা এখনো জুতমতো বসে নাই। একধরনের অস্বস্তি হচ্ছে। নবাবপুর রোডে একটা ঘোড়াগাড়ির পেছনে পড়েছেন তিনি। ঘোড়াগাড়িটাকে ক্রস করতে পারছেন না।’

মুজিব যে জনসাধারণের নেতা ছিলেন লুদু চোর বর্ণনাটা ফুটে ওঠেছে–

শেখ মুজিব লুত্ফর রহমান রোডের চোর ও পকেটমার লুদু মিয়ার গল্প শোনেন। লুদু মিয়ার বাবা সাত বিয়ে করেন, সে বাবার প্রথম পক্ষের ছেলে। অভাবের সংসার। লেখাপড়া হয় না। অল্প বয়সে কাজে যেতে হয়। ভাই বিয়ে করে। ভাই-ভাবি অত্যাচার করে। সে এক কাজ থেকে আরেক কাজে যায়। হোটেলে চাকরি নেয় ঢাকা শহরে। এক ছেলে তাকে চুরি করতে ডাকে। লুদু মিয়া চুরি করে। পরে ভাবে, একা একা চুরি করি। অন্যকে টাকা দেব কেন। চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে। মার খায়। জেল হয়। জেল থেকে বেরিয়ে সে আবার চুরি করে। এবার পুলিশ তাকে বলে, ‘তুই কী করিস সব খবর রাখি।’

সে পুলিশকে টাকা দিতে শুরু করে। পকেট মারে। ধরা পড়লে পুলিশ আছে। কিন্তু সে ভুল করে। রেলপুলিশের এলাকায় চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে। এবার তাকে রেলপুলিশকে নিয়মিত টাকা দিতে হয়।

তারপর পকেট মারতে গিয়ে তাকে দেখে ফেলল সিআইডির লোকেরা। তারা তার কাছ থেকে বখরা নিল। তারপর অন্য থানাওয়ালারা তাকে ধরল। আবার জেলে দিল। জেলে সে বড় গ্যাংয়ের পাল্লায় পড়ল। এবার সে গলার ভেতরে খোকড় তৈরি করল। কোনো কিছু পকেট মেরে পেলে গলার ভেতরে খোকড়ে রাখত।’

মুজিবের প্রিয় ছিল রবীন্দ্রনাথের কবিতা। তিনি একদিন রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করে মানিক মিয়াকে শুনালেন। সেটা বর্ণনা আসে এভাবে–

‘দেয়ালের ওপারে থাকা মানিক ভাইকে: ‘আমরা দুজন একটি গাঁয়ে থাকি, সে আমাদের একটি মাত্র সুখ, তাদের কাছে গায় যে দোয়েল পাখি, তাহার গানে আমার নাচে বুক। মানিক ভাই, একই সেলে না থাকলেও তো পাশাপাশি আছি।’

সেবার কড়া বিধিনিষেধের ফাঁক গলে মুজিব ঠিকই দেখা করেছিলেন মানিক ভাইয়ের সঙ্গে। মানিক ভাই বললেন, ‘সরকার তো আমারে আপস করতে কয়। জেল থাইকা তো ছাড়বই, বড় বড় পোস্ট সব অফার করতে আছে। মনু, কী করমু?’

লিডারের মৃত্যুতে শেখ মুজিব এতো আবেগ তাড়িত হয়ে গেলেন–তখন বঙ্গমাতা সান্ত্বনা দেন।

‘শেখ মুজিব কাঁদছেন। রেনু তাঁকে রুমাল এগিয়ে দিলেন। পানি এনে দিলেন গেলাস ভরে। রুমালে চোখ মুছতে মুছতে মুজিব বললেন, ‘বৈরুতে হোটেলে মারা গেছেন। কীভাবে মারা গেছেন, এখনো নিশ্চিত নয় ব্যাপারটা।’

উপন্যাসের শেষাংশে লিখেছন মুজিবের মায়ের অসুখের কথা। যা শুনে বঙ্গবন্ধু মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সেই অংশটুকু–

মুজিব জিজ্ঞেস করলেন, ‘রেনু, কিছু কি বলতে চাচ্ছ পারতেছ না?’
রেনু বললেন, ‘বাড়ি থেকে খবর এসেছে। আম্মার খুব অসুখ। তোমাকে দেখতে চান। প্যারোলে মুক্তি নিয়া টুঙ্গিপাড়া যাও।’
মুজিব বললেন, ‘প্যারোলে মুক্তি নিয়া গেলে আসার সময় মা এই শোক সহ্য করতে পারবেন না। হার্টফেল করে মারা যাবেন। দরকার নাই। একবারে মুক্তি পাইলে যাব। নাসেরকে বলো, খুলনা থেকে টুঙ্গিপাড়া যাইতে।’
পরিবারকে বিদায় দিয়ে মুজিব ফিরে এলেন তাঁর সেলে। নির্জন সেল। তবে মেট আলিমুদ্দি আছে, বাবুর্চি আছে। তারা জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার আপনার মুখ আন্ধার কেন। আপনারে এত চিন্তিত লাগে কেন।’
মুজিব বললেন, ‘মার খুব অসুখ।’
এর আগে সায়েরা খাতুন ছিলেন খুলনায়। খুলনা থেকে তিনি ফোন করেছিলেন, ‘বাবা খোকা, আমি বোধ হয় আর বাঁচব না। আমি বাড়ি যাচ্ছি। তুই বাড়ি আয়।’
তারপর তো তাঁকে একটার পর একটা জেলায় আটক করা শুরু হলো। অল্প কদিনে আটবার আটক করা হয়েছিল তাকে। রাখা হয়েছিল বিভিন্ন জেলখানায়।

শেখ মুজিব তাঁর কারাগারের বিছানায় শুয়ে পড়লেন। মেট আর বাবুর্চি বলতে লাগল, ‘স্যার, খেয়ে নেন। স্যার।’

তিনি খাওয়ার কথা ভুলে গেলেন। পড়াশোনাতেও মন বসাতে পারলেন না। অন্ধকার ঘরে একাকী বিছানায় শুয়ে আছেন। তাঁর আব্বা-আম্মা তাঁকে ডাকেন খোকা। কত যে আদর করেন তাঁরা তাঁকে। পারলে কোলে করে নিয়ে আদর করেন। তিনিও এই বয়সে সব সময় আব্বা-আম্মার গলা জড়িয়ে ধরে আদর করে থাকেন। সেই মা বলছেন, ‘বাবা খোকা। আর বাঁচব না। চলে আয়।’

Comments

comments