ঢাকা, সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮ | ০৬ : ৩১ মিনিট

swapno71Zakia Mouশীতের রাতগুলো জানি কেমন ! জোরে ফ্যান ছেড়ে দেওয়া যায় না , দিলে অন্তত পাশের ঘরের শব্দ এত জোরে কানে আসতো না। আমি কানে বালিশ চেপে ধরি, ঘুম আসে না আমার। চোখ দিয়ে পানি পরে। আমার চোখে অসুখ, ডাক্তার বলেছে নাকি চোখের রগ শুকিয়ে যাচ্ছে। আমি নাকি অন্ধ হয়ে যাব। অবশ্য আস্তে আস্তে সব কিছু ঘোলা দেখা শুরু করেছি। আমার সাত বছরের মেয়ে তৃষাকেও ঠিক মতো দেখতে পাইনা। কিন্তু ওর গায়ের গন্ধ টের পাই, অনেক দূর থেকে। এখন মেয়ে আমার গায়ে গা লাগিয়ে আছে, ঘুমালে ওর গা দিয়ে কেমন জানি একটা মিস্টি গন্ধ বের হয়।
আমি বুঝি। আমার মেয়েটা অনেক সুন্দরী,আমার মত।তাই ভয় হয়।এই সুন্দরের কারণে পনের বছর বয়সে বিয়ে হয়ে গেলো ওর। বাবার আপত্তি ছিল, কিন্তু মা শুনল না। ভাইরাও তাল দিলো, বিয়ে হয়ে গেলো। আমার রুপ দেখে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা অস্থির, এই মেয়েকে বাহিরে বের করা যাবে না। ডাকাতের চোখে পরবে, বেশী বেশী সুন্দর। আমার আর স্কুল কলেজে যাওয়া হয়নি।
প্রথম মেয়েটা পুকুরে ডুবে যখন মরল তখন সাজ্জাদ আমাকে ঢাকায় নিয়ে আসলো গ্রাম থেকে, আমি তখন সতেরো। প্রতিবেশীরা কেউ কেউ ওকে পরামর্শ দিলো – ‘তুমি তো বাসায় থাকবা না, বউ কই না কই চলে যাবে, তাড়াতাড়ি আরেকটা বাচ্চা নাও।’
তৃষা এলো দুনিয়ায়। আমি খুব ভাবতাম আমার মেয়েকে আমি অনেক পড়াব, অনেক অনেক। ও কখনও কারো উপর নির্ভর করবে না। কিন্তু হায়, যখনই আমার মেয়েকে পড়ানোর শিখানোর সময় আসল, আমার চোখ নষ্ট হয়ে গেল। আমার তৃষা বুঝে মায়ের কষ্ট, নিজে নিজে পড়ে ও। কাউকে বিরক্ত করে না। সাজ্জাদকেও না, বরং কেমন জানো ভয় পায়। সে যখন আবার বিয়ে করে নতুন বউ নিয়ে আসলো, তখন দৌড়ে আমাকে এসে বলল– ‘আম্মা , বাবা যেন কাকে নিয়ে এসেছে’।
প্রতিবেশীরা খবর পেয়ে বউ দেখতে এলো। কেউ কেউ আমার ঘরে ঢুকে আফসোস করল, কেউ ওকে চামার বলল। আবার পাশের ঘরে গিয়ে বলল – আহা ! বেচারার কি দোষ , বউটা কানা হয়ে গেছে, এভাবে কি সংসার চলে।
আমার ভাসুররা আসল– ওকে খুব বকল, যাবার সময় বলে গেলো চিন্তা না করতে …তাদের বংশের ছেলেরা দুই বউ সমান চোখে দেখে। আমার ভাইয়েরা আসল না, মোবাইল করে বলল– তোর তো চোখ খারাপ, কাজে কামে সুবিধাই হবে, বোনের মতো থাকবি। বলে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু আমি তো বাঁচি না, আমি তো মরি প্রতিদিন। মানুষের একটা ইন্দ্রিয় দুর্বল হলে অন্যগুলো নাকি বেশী সচল হয়। মধ্যরাতে আমি যখন পাশের ঘর থেকে ভেসে আসা শব্ধগুলো শুনি আমার মনে হয় আমি বধির হলেই যেন ভালো। এই শীতের রাতে জোরে ফ্যান ছেড়ে দেই, আমার মেয়েটা শীতে কাঁপে। কাঁপুক , সেতো মেয়ে …তাকে কত যন্ত্রণা সইতে হবে।

Comments

comments