ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ০৩ : ৪৩ মিনিট

Swapno71 (2)‘আমাদের বাড়িটা একটা ভুত ঘুরে, জানো তুমি ?’ – হাসতে হাসতে বলল সাদমান আমাকে। আমি বুঝতেই পারছিলাম ও দুষ্টামি করছে, তাও ভয় পাওয়া কণ্ঠে বললাম – “ সত্যি ? আমাকে ভয় দেখাবে না তো?’। সাদমান আমাকে এ কথার জবাব দিলো না। চুপচাপ ঘুমিয়ে যেতে বলল। সাদমান আর আমি এক কলেজ থেকেই অনার্স শেষ করেছি। ও বোটানি ডিপার্টমেন্টে ছিল। প্রথম ওকে দেখেছিলাম কলেজের ক্যান্টিনে। একটা মোটা চশমা পরা ছেলে চায়ের কাপ হাতে বই পড়ছে। কোঁকড়া কোঁকড়া চুলের গোলগাল চেহারার এই ছেলেটাকে প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে গিয়েছিলো আমার। ওর পাশে গিয়ে বসে বলেছিলাম – “আপনার বইটা আমাকে পড়তে দিবেন ?’।

সে দিয়েছিল। সেই থেকে শুরু আমাদের কথা বলা। রোজ ওর কাছে যেতাম বই নিতে। আর আমার গল্পের বই পড়ার প্রবল ইচ্ছা দেখে সেও আমাকে প্রচুর বই পড়তে দিতো। কখনও সেগুলো পড়তাম কখনো তার ঘ্রাণ শুকতাম নাকের কাছে নিয়ে। আমি বইগুলোতে সাদমানের ছোঁয়া পেতাম সবসময়। আমি একদিন খুব সাহস করে এক বইয়ের ভেতর চিরকুট পাঠিয়েছিলাম। লিখেছিলাম – “ আমি সব সময় তোমার পাশে থাকতে চাই সাদমান’। উত্তর পেয়েছিলাম তিনমাস পরে। তাও এক বইয়ের ভেতরেই চিরকুট এসেছিলো –‘ আমার সাথে চলে যাবে এখান থেকে ? সারাজীবনের জন্য যাবে ?’ আমি উত্তর দিতে কোন দেরী করি নাই।ওর সাথে দেখা করে বলি যে আমি ওর সাথে যেতে চাই , ওর বৌ হয়ে থাকতে চাই । তারপর আর মাস্টার্স শেষ করা হয়নি আমাদের। দুজন চলে আসি এখানে, ওর বাড়িতে। এখানেই বিয়ে করে সংসার শুরু করি।
**
সাদমানদের বাড়িটি একটা পরিত্যাক্ত বাড়ি বললে বেশি বলা হবে না। মফস্বল শহরের শেষ মাথায় এই বাড়িটি। বেশ বড় হলেও এর বেশীর ভাগ অংশই যেন ধ্বসে গেছে । যেটুকু আছে তাও যেন দাড়িয়ে থাকার পক্ষে নয়। দেয়ালগুলো বড় বেশি মলিন আর মন খারাপ করা পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে একতলা এই বাড়িটি। সত্যি বলতে কি দিনের বেলায়ই কেমন জানি না গা ছম ছম করে এখানে। পুবের দিকে একটা বড় বারান্দা আছে। সেখান থেকে পাশের ডোবাটা দেখা যায়। আগাছা দিয়ে ভর্তি জলা দেখলেই মনে হয় এটা মশাদের আড়ত। ওকে বলেছিলাম লোক ডাকিয়ে পরিষ্কার করতে। ও আমাকে কঠিন স্বরে বলেছিল যে এটা করা যাবে না , কার যেন বারন আছে। এ বাড়িতে আর কেউ থাকে না। সাদমান আমাকে বলেছে ওর জন্মের আগে বাবা মারা গিয়েছিলো আর ওর যখন বয়স ছয় তখন আলসারে মা মারা যায়। ওকে ওর মামারা নিয়ে যায় আর সেখানেই বড় হয়। কিন্তু ওর জীবনের একটা ইচ্ছে ছিল যে একদিন না একদিন সে এই বাড়িতেই ফিরে আসবে। আর তাই এখানেই আমাদের সংসার শুরু হয়। নীরব নিস্তব্ধ বাড়িতে আমরা দুটি মানুষ থাকি। আশেপাশের বাড়িও এখান থেকে বেশ দূরে। সাদমান এখানে এসে শহরে একটা কাজে যোগ দেয় আর আমার সারাদিন কাটে একা একা ।
আমি বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গায় কিছু শীতকালীন সবজি বুনেছিলাম। প্রচুর টমেটো , শিম আর কাচামরিচ হয়েছিল। ও ফিরতে ফিরতে প্রায়ই সন্ধ্যা হত তাই আমি ব্যস্ত থাকতাম এগুলো করে। সত্যি বলতে কি আমাকে নির্জনতা পেয়ে বসে। আমি এই নির্জনতাকেই ভালবেসে ফেলি। এইজন্য সাদমানের প্রতি আমার কোন অভিযোগ থাকে না।

একদিন তন্ময় হয়ে মাটি খুঁড়ছিলাম গাছ লাগাবার জন্য এমন সময় শাবল যেন কিসে আঘাত করে। আমি আরও ভালো করে দেখার জন্য খুঁড়তে থাকি। কিন্তু যা বের হয়ে আসে তা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। একটা মানুষের খুলি। হ্যাঁ , আমি চিৎকার দিয়েছিলাম দেখে। চোখবিহীন কোটর দিয়ে তা যেন আমাকে দেখছিল। আমি কাকে ডাকবো বুঝতে পারছিলাম না। ঠিক তখনই একটা ইস্পাত শক্ত হাত আমার ঘাড় ছুয়ে যায়। আমি আতঙ্কে জমে যাই। পিছন ফিরে দেখি সাদমান দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে জড়িয়ে ধরে ফিসফিস করে বলল – “ মৌ , ভয় পেয়ো না। আমি তোমাকে বলেছিলাম কোন কিছুতে হাত দিতে না’।
আমি ওকে বলি – “ দেখো এটা একটা মানুষের মাথা। একটা বাচ্চার খুলি’।
ও আমাকে বলে – “ তুমি জানো এটা কে ?’

আমি বড় বড় চোখ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম । ও হাসতে হাসতে বলল – “ এটা আমার খুলি মৌ।’ বলেই হো হো করে হাসতে লাগলো। কি ভয়ংকর সে হাসি ! আমার গায়ে কাঁটা ধরে গেলো । আমি চিৎকার করে নিজেকে ওর হাত থেকে ছাড়িয়ে নিলাম । সাথে সাথেই যেন সম্বিৎ ফিরে পেলাম । দেখলাম কোথাও কেউ নেই । আমি দাড়িয়ে আছি একা । মাটিতে কোদাল আর শাবল পরে আছে আর সেই শিশুর খুলিটিও নেই। সাদমান কোথায় যেন উধাও হয়ে গেছে। আমি কি তবে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলাম। ঠিক তখনই যেন সূর্য ডুবে গেলো । আবছা কুয়াশায় আমি দেখতে পেলাম এক যুবক আমার দিকে আসছে । সাদমান এখন বাড়ি ফিরেছে । হাতের বাজারের ব্যাগ আমার হাতে দিতে দিতে বলল – “ তোমাকে এমন ফ্যাকাশে লাগছে কেন ? ভুত দেখেছো নাকি মৌ ?’ আমি ওর কথার উত্তর না দিয়ে ভিতরে ঢুকে গেলাম ।

***
আমার সময় কাটানোর জন্য এই ভুতুড়ে বাড়ির চারপাশ যথেষ্ট ছিল। সাদমান বাড়ি থেকে বের হলে আমি এটা পরিষ্কার করতে লাগে যেতাম । আমরা যে ঘরটায় থাকতাম এটা ছাড়া বাকি ঘরগুলোর যাচ্ছেতাই অবস্থা হয়ে ছিল । বেশীরভাগের ছাদ প্রায় বিধ্বস্ত । দেয়ালের চুনকাম বলতে কিছু নেই , প্যালেস্তারা খসে গেছে । মেঝে ধুলার আস্তরণে ঠাসা । আমি সারাদিন ব্যয় করতাম ওগুলো পরিষ্কার করাতে । একদিন দুপুরে একটা ঘর ঘসেমেজে পরিষ্কার করে খুব ক্লান্ত লাগছিলো । গোসল করতে ঢুকলাম বাথরুমে । ওদের বাড়ির সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল এটা আমার । বড় একটা চৌবাচ্চা ভর্তি পানি রাখা হত আর তা ছিল একেবারে হিমশীতল । আমি চৌবাচ্চা থেকে পানি ঢালতে লাগলাম । চুল ভিজে সব মুখে লেপ্টে ছিল আমার । ঠিক তখনই আমি অনুভব করলাম এখানে আমি ছাড়া আরও কেউ আছে । খুব কাছে যেন কারো নিঃশ্বাস এর শব্দ পেলাম । একটা রিনিঝিনি চুড়ির মতো শব্দ । অন্ধকার ছিল চারপাশ । আমি কাউকে দেখতে না পেলেও একজন যে আছে সে ব্যাপারে আমি নিশ্চিত ছিলাম । কোনমতে পরনের শাড়ী জড়িয়ে দৌড়ে বের হয়ে এলাম । কোথাও কেউ ছিল না । আমি যেন ভয়ে কাঁপছিলাম ঠিক তখনই আমাকে পেছন থেকে কেউ জড়িয়ে ধরলো । আমার ঘাড়ে অনবরত চুমু খেতে লাগলো । আমি চোখ বন্ধ করে ছিলাম । এই বন্ধন থেকে মুক্তির কোন উপায় নেই । আমি প্রায় জোড় করে পাশ ফিরলাম , তার মুখোমুখি হতে চাইলাম । একী ! এযে সাদমান ! আমার দিকে তাকিয়ে আছে পলকহীন ভাবে । তারপর সাপের মতো হিসহিস করতে করতে বলল – ” আমি বলেছিলাম না কোনকিছু না ধরতে ? এ বাড়ী যেমন আছে তেমন থাকবে । ” ওর দৃষ্টি দেখে আমি সংজ্ঞাহীন হলাম । তারপর যখন আমার চেতনা ফিরে এলো তখন দেখলাম আমি বিছানায় । আমার পাশে বসে সাদমান একটা বই পড়ছে । আমাকে জাগতে দেখে মৃদু হেসে বলল – ” কেমন আছো মৌ ? ” ওর হাসি কি নিষ্পাপ ছিল আমি বলে বুঝাতে পারবো না । সেদিনই আমি নিশ্চিত হয়েছি এ বাড়ীতে আমার সাদমান ছাড়াও আরেকজন সাদমান আছে । সে সহজ কেউ নয় , সে ভয়াবহ !
***
আমি কেন জানি না এই বাড়িতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম । সারাদিন একা একা থাকাও কোন বিষয় ছিল না । আসলে সাদমানকে আমি অসম্ভব ভালবাসতাম । একদিন বলেছিলাম এই বাড়ি ছেড়ে যাবার কথা কিন্তু সে কোন উত্তর দেয়নি । তখনই বুঝেছিলাম আমাকে ওর সাথে এখানেই থাকতে হবে । পুবের বারান্দায় বেশীর ভাগ সময় আমি একা একা বসে থাকতাম । মেঝেতে শীতলপাটি বিছিয়ে বসে বসে কাঁথা সেলাই করতাম । ভাবতাম যদি কখনও আমাদের খোকা খুকু আসে তবে কাজে দিবে । মাঝে মাঝে ঐ জলার দিকে তাকাতাম । দুপুরের কড়া রোদে যখন চারপাশ খাঁ খাঁ করে আমি দেখতাম সেই মজে যাওয়া পুকুর কেবল রঙ বদলায় । কখনও তা রক্তিম লাল হয়ে যায় । কি অপূর্ব লাগলো , আমার চোখে যেন নেশা ধরে যেত । আমি চোখ ফিরাতে পারতাম না । একদিন আমি সেই জলার ধারে অপূর্ব সুন্দরী এক মহিলাকে দেখতে পাই । কোঁকড়া চুলের অধিকারী চমৎকার গড়নের এক মহিলা ছোট ছয় সাত বছরের এক ছেলেকে পুকুরের পাড়ে বসিয়ে দিয়ে পায়ে আলতা লাগাচ্ছিল । সহসা এক লোক দেখতে পাই । জলপাই রঙয়ের ফতুয়া পরা লোকটি একটা গাছের আড়াল থেকে মহিলাকে ইশারা করে । মহিলা হাসতে হাসতে গাছের আড়ালে চলে যায় । বাচ্চা ছেলেটা যে বল নিয়ে খেলা করছিলো তা কেন জানি গড়িয়ে পানিতে পরে যায় । বাচ্চাটা এক পা দুই পা করে পুকুরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । একসময় তাল সামলাতে না পেরে পরে গেলো । আমি সব দেখতে পাচ্ছি । কিন্তু সেই মহিলার কোন বিকার নেই । তারা সেখানে যেন কোন আদিম খেলায় মত্ত । আমি দৌড়ে গেলাম পুকুর পাড়ে । রোদে চারপাশ ঝা ঝা করছে । কেউ নেই , কিচ্ছু নেই । সেই আলতার শিশি , প্লাস্টিকের বল , মা মা করা সেই কোঁকড়া চুলের ছেলে কিংবা সেই সুন্দরী মহিলা কাউকেই পেলাম না ।
কিন্তু সেদিন আমি ঘরে ফিরে পাটির উপর একটা চিঠি পেয়েছিলাম । তাতে গোটা গোটা হরফে সাদমান লিখেছিল – ” যা দেখেছো তাই সত্য মৌ । আমি বহু আগেই মারা গেছি । আমার মা চরিত্রহীনা ছিল । পুকুর থেকে তুলে আমাকে এই আঙিনায় পুতে রেখেছিল । তুমি এখানে থেকো না । আমি মানুষ সেজে আর থাকতে পারছি না । তুমি ফিরে যাও । ”
আমি সেই চিঠি হাতে নিয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ঠায় হয়ে বসে ছিলাম । আমার চারপাশে যেন হাজারো শব্দ ভেসে আসছিলো । একটা বাচ্চার আর্তনাত শুনতে পাচ্ছিলাম , আবার কখনও দুই নরনারীর চাপা হাসির শব্দ । সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিলো , আমি জানি সব মিথ্যা । আমি জানি সাদমান এখন ফিরে এসে বলবে – ” কেমন আছো মৌ ? জানো আমাদের বাড়িতে না ভুত আছে । “

Comments

comments