ঢাকা, বৃহষ্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০৮ : ৫৬ মিনিট

স্যার অ্যাডমন্ড পার্সিভ্যাল হিলারি। স্বপ্ন ‘৭১

স্যার অ্যাডমন্ড পার্সিভ্যাল হিলারি

বিশ্বের প্রথম পর্বতারোহী কে ছিলেন? নিশ্চয়ই সবার জানা। অ্যাডমন্ড হিলারি। যিনি হিমালয়ের সর্বোচ্চ চূড়া এভারেস্ট প্রথম জয় করেছিল। ১৯৫৩ সালের ২৯ মে তিনি ও শেরপা গাইড তেনজিং নোরগে সর্বপ্রথম এভারেস্ট জয় করেন। এর আগে পৃথিবীর সর্বোচ্চ এই পর্বতশৃঙ্গকে জয় করা মানুষের সাধ্যের বাইরে মনে করা হতো। আজ এই প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী স্যার অ্যাডমন্ড পার্সিভ্যাল হিলারি মৃত্যুবার্ষিকী।তিনি ২০০৮ সালের ১১ জানুয়ারি মৃত্যু বরণ করেন।

স্যার অ্যাডমন্ড পার্সিভ্যাল হিলারি ১৯১৯ সালে ২০ জুলাই নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন।  মাধ্যমিক স্কুলে পড়ার সময়ই তাঁর পাহাড় জয়ের নেশায় পেয়ে বসে। ইউনিভার্সিটি অব অকল্যান্ড থেকে তিনি গণিতে স্নাতক ডিগ্রি নেন।

তাঁর বাবা একটা ছোট্ট পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। শুধু সম্পাদনা বললে অবশ্য ভুল হবে; তিনি একাধারে ওই পত্রিকার মালিক, প্রকাশক, সম্পাদক, প্রতিবেদক, আলোকচিত্রী—সব ছিলেন। শুধু ঘরে ঘরে পত্রিকা বিলি করার কাজটাই করতে হতো না তার বাবাকে। দুর্ভিক্ষ হলে তিনি অসৎ কিছু ব্যবসায়ী খাদ্যের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা লোটার চেষ্টা করছিলেন।

১৯৩৯ সালে তিনি প্রথম অলিভার পর্বত জয় করেন। পরে জীবিকার তাগিদে ভাইয়ের সঙ্গে মধু জোগাড় ও বিক্রির ব্যবসায় নামেন। দুর্গম পার্বত্য বনভূমিতে মৌয়ালের কাজ তাঁর ভীষণ ভালো লাগত। গ্রীষ্মকালে এ কাজ করে জমানো টাকা ভাঙিয়ে শীতকালে চলে যান পর্বতের চূড়ার দিকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে তিনি যোগ দেন রয়াল নিউজিল্যান্ড এয়ারফোর্সের উভচর সি প্লেনের নেভিগেটর হিসেবে। একটি অভিযানে তিনি মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধও হন।

১৯৫৩ সালে হিলারি বের হলেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়া এভারেস্ট জয় করতে। ২৯ মে অ্যাডমন্ড হিলারি ও তেনজিং পা রাখেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়ায়। ওই বছরই হিলারি লুসি মেরি রোজকে বিয়ে করেন। পরে হিমালয় অঞ্চলে আরো ছয়টি শৃঙ্গ তিনি জয় করেন।

১৯৫৮ সালে তিনি উত্তর মেরু জয় করেন। ১৯৭৯ সালে ওশান টু স্কাই নামের এক অভিযানে গঙ্গা নদীর সাগরে মেশার অংশ থেকে নদীর উৎস পর্যন্ত আকাশ অভিযান পরিচালনা করেন।

তিনি  বলেন, ‘আমাকে বিশ্ববাসী চেনে পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের জন্য। কিন্তু সত্যি বলতে কি, মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের পরে যে বিশ্ববাসীর এত ভালবাসা, সন্মান পাব, তা আমি কখনোই ভাবিনি। আর তার চাইতেও বড় কথা, আমি যে কোনো দিন এভারেস্ট জয় করব, সেটাই কখনো চিন্তা করিনি। এমনকি যখন আমি মাউন্ট এভারেস্টের পাদদেশ থেকে যাত্রা শুরু করি, তখনো আমি সংশয়ে ছিলাম এ ব্যাপারে। আমি জানতাম না, আসলে কোনো মানুষের পক্ষে আদৌ সম্ভব কিনা মাউন্ট এভারেস্ট জয় করা। কৃত্রিম অক্সিজেন ব্যবহার করেও বরফে ঢাকা বিপৎসংকুল ২৯ হাজার ৩৫ ফুট উঁচু কোনো পর্বত পাড়ি দেওয়াটা কোনো সহজ কাজ ছিল না কখনোই। আর শুধু ওপরে উঠলেই তো হয়ে গেল না! ওপরে উঠে আবার নিচেও নেমে আসতে হবে ওই বিপৎসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে। পৌঁছানোর মাত্র ৩০ ফুট আগেও জানতাম না চূড়ায় পা রাখতে পারব কিনা আদৌ! এমনো হতে পারত, হয়তো চূড়ায় পা রেখেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছি বা নেমে আসার সময় বরফের কোনো গুপ্ত ফাটলের নিচে সমাধি হতে পারত। পুরো অভিযান শেষে নিচে নেমে আসার আগ পর্যন্ত জানতাম না এটা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব কি না। কিন্তু একটা কথা সত্য, আমি এক মুহূর্তের জন্যও মনোবল হারাইনি অভিযানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। আমি তো মনে করি, যেকোনো কাজ সফলভাবে করার জন্য যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা হলো মনোবল। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে শারীরিক সামর্থ্য, কারিগরি দক্ষতা, এমনিকি টাকা-পয়সারও প্রয়োজন রয়েছে অবশ্যই, কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রয়োজনটা হলো মনের জোর। কঠোর মনোবল, দৃঢ় সংকল্প, প্রবল উৎসাহ ছাড়া কোনো কাজই ঠিকভাবে করা সম্ভব নয়। এটাই আসলে মূল পার্থক্য গড়ে দেয় একজন সাধারণ মানুষ আর একজন বিখ্যাত মানুষের মধ্যে ।’

ছোটবেলায় তিনি প্রচুর বিই পড়তেন। সেই সময়ে তিনি পড়েছেন হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড, জর্জ হায়ারের বই। আর মনে করতেন, খুব বেশি মেধাবী হওয়ার দরকার নেই বিশেষ কিছু হওয়ার জন্য, বা বিখ্যাত হওয়ার জন্য।’

তরুণদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমরা সব সময় বড় কিছু চিন্তা করো। বড় কিছু পাওয়ার চেষ্টা করো। হয়তো একবারে পারবে না, দুবারেও পারবে না, কিন্তু একসময় বিজয় আসবেই। কোনো কাজ বারবার চেষ্টা করলে সেই কাজের ওপর আরও বেশি দখল আসে। সেই কাজ করা আরও বেশি সহজ হয়ে যায়। যেকোনো কিছু জয় করার সামর্থ্য রয়েছে তোমার। বিশেষ কিছু করতে হলে বিশেষ কোনো মানুষ হতে হবে, তা নয় মোটেও। আমি মনে করি, যে কারও পক্ষে সম্ভব যেকোনো অসম্ভবকে সম্ভব করা।’

১৯৮৫ সালে নিউজিল্যান্ড সরকার তাঁকে ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশ এই তিন রাষ্ট্রের হাইকমিশনার হিসেবে ভারতে পাঠায়। তিনি নাইট কমান্ডার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার, ভারত সরকারের পদ্মবিভূষণ খেতাবসহ বহু সম্মানে ভূষিত হন।

 

Comments

comments