ঢাকা, শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮ | ০৬ : ৪৯ মিনিট

বিপ্লবী বিনোদবিহারী চৌধুরী। স্বপ্ন ‘৭১

বিপ্লবী বিনোদবিহারী চৌধুরী

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবী ও সূর্য সেনের অন্যতম সহযোগী বিনোদবিহারী চৌধুরী জন্মদিন আজ। তিনি আজকের দিন ১৯১১ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালি থানায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা কামিনী কুমার চৌধুরী ছিলেন পেশায় উকিল এবং মা রামা চৌধুরী ছিলেন গৃহিনী। তাঁর স্ত্রীর নাম বিভা চৌধুরী। ছেলের নাম বিবেকান্দ্র চৌধুরী।

পড়াশোনা
চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি থানার রাঙ্গামাটিয়া বোর্ড স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল৷ সেখান থেকে তিনি ফটিকছড়ির প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ফটিকছড়ি করোনেশন আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়,বোয়ালখালির পি.সি. সেন সারোয়ারতলি উচ্চ বিদ্যালয়, চিটাগাং কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯২৯ সালে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য তাঁকে বৃত্তি প্রদান করা হয়৷ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন। ১৯৩৪ এবং ১৯৩৬ সালে ব্রিটিশ রাজের রাজপুতনার ডিউলি ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী অবস্থায় থাকার সময় তিনি প্রথম শ্রেণীতে আই.এ. এবং বি.এ. পাস করেন। আইনজীবী বাবার সংস্পর্শে তাঁর বিপ্লবী চেতনার উন্মেষ ঘটে।

কর্মজীবন
১৯৩০ সালে কংগ্রেস চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সহ-সম্পাদক, ‘৪০-‘৪৬ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস নির্বাহী কমিটির সদস্য, ‘৪৬ সালে কংগ্রেস চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বিনোদবিহারী । ১৯৪৭ সালে ৩৭ বছর বয়সে পশ্চিম পাকিস্তান কংগ্রেসের সদস্য হন তিনি। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক আইন জারির মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দলকে বেআইনি ঘোষণা করলে রাজনীতি থেকে অবসর নেন তিনি ৷

মাঝে তিনি ১৯৩৯ সালে দৈনিক পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ১৯৪০ সালে চট্টগ্রাম কোর্টের একজন আইনজীবি হিসাবে অনুশীলন শুরু করেন। কিন্ত অবশেষে তিনি তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষকতাকেই পেশা হিসাবে গ্রহণ করেন।

সংগ্রাম
১৯৩০ সালে সূর্য সেনের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন অভিযানে তিনি ছিলেন অন্যতম সহযোগী। চট্টগ্রামকে তিন দিন স্বাধীন রাখা, টেলিগ্রাফ অফিস ধ্বংস করা, অক্সিলারি ফোর্সের অস্ত্রশস্ত্র লুট—সব কিছুতেই তাঁর অবদান ছিল। ব্রিটিশ বাহিনী পাল্টা আঘাত হানলে তিনি ও তাঁর দল বীরবিক্রমে জালালাবাদ পাহাড়ে যুদ্ধ চালান। সেই যুদ্ধে তিনি ১২ জন সহকর্মীর মৃত্যু দেখেন। ১৯৩৩ সালের জুন মাসে তিনি গ্রেপ্তার হন। পাঁচ বছর পর মুক্ত হলেও এক বছর নজরবন্দি থাকতে হয়। ১৯৪১ সালের মে মাসে ভারত ছাড় আন্দোলনের শুরুতে আবারও গ্রেপ্তার হন। ১৯৪৫ সালে ছাড়া পান।

ভাষা আন্দোলন
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। আইনসভার সদস্য হিসেবে তিনি ২১ ফেব্রুয়ারি অ্যাসেম্বলিতে গিয়ে পাকিস্তান বাহিনীর হত্যাকাণ্ডের কথা বিশ্ববাসীর কাছে প্রচার করেন। ২১ ফেব্রুয়ারির দিন বিনোদ বিহারী ফরাশগঞ্জ থেকে ২টার সময় আইনসভায় যোগদানের জন্য রিকশা করে আসছিলেন। মেডিকেল কলেজের সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে তিন-চারজন ছেলে তাঁকে রিকশা থেকে নামিয়ে বলল, “আপনাকে যেতে দেব না। দেখে যান কীভাবে আমাদের লোকজনদের হত্যা করা হয়েছে”। ওরা একটা ঘরে নিয়ে গিয়ে তাঁকে বরকতের মৃতদেহ দেখাল। বিকৃত হয়ে গেছে চেহারা। তারপর তিনি তাদেরকে বললেন, “আমরা তো তোমাদেরই লোক। মুসলিম লীগ দেশ চালাচ্ছে। আমাকে যদি আইনসভায় যেতে না দাও তাতে তো ওদেরই লাভ হবে। বরং সেখানে গিয়ে বললে সরা বিশ্ব শুনবে”। তখন তারা বুঝল এবং তাঁকে ছেড়ে দিল। সে দিন তাঁরা এই বর্বরতার বিরুদ্ধে আইনসভায় কঠোর মত ব্যক্ত করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ
১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে ভারতে গিয়ে তরুণ যোদ্ধাদের ট্রেনিংয়ে পাঠিয়েছেন বিনোদবিহারী। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাইফেল হাতে নিতে পারেননি বটে কিন্তু ক্যাম্পে ক্যাম্পে গিয়ে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রাণিত করেছেন।

পুরস্কার
২০১১ সালে তিনি স্বাধীনতা পদক পান।। প্রামাণ্যচিত্র ‘সূর্যসাথী’ তাঁর বিপ্লবীজীবন নিয়ে নির্মিত।

মুত্যৃ
২০১৩ সালের ১০ এপ্রিল তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

Comments

comments