ঢাকা, সোমবার, ২৫ জুন ২০১৮ | ০১ : ৫১ মিনিট

November 16th, 2017

Jogothajoti das.JPGThams

মুক্তিযুদ্ধে ভাটি বাংলার গেরিলা বাহিনীর কমান্ডার বীব বিক্রম শহীদ জগৎজ্যোতি দাসের ৪৬তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি ১৯৪৯ সালে ২৬ এপ্রিল হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা (ইছবপুর) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম জীতেন্দ্র দাস।  মা হরিমতি দাস।  জগৎজ্যোতির এক ভাই (জীবনানন্দ দাস) ও এক বোন (ফুলরানী দাস)। তাঁরা বর্তমানে ভারতে বসবাস করেন। তিনি ছিলেন অবিবাহিত।

ছেলেবেলা থেকে তিনি ছিলেন শান্ত স্বভাবের মানুষ। তবে মনে ভিতরে ছিল প্রচন্ড জেদ। সাহসী ও প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ছিলেন তিনি। পড়াশোনাতে মেধাবী ছাত্র হিসেবে বেশ পরিচিত ছিল সবার কাছে।বাবা ও বড় ভাই ছিলেন রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। অত্যন্ত দরিদ্রতার মধ্যে ১৯৬৮ সালে দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করার পর ভর্তি হন সুনামগঞ্জ কলেজে। সেখানেই তিনি যোগ দেন ছাত্র ইউনিয়নে (মেনন গ্রুপ)। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠতে লাগলেন একজন দীপ্ততেজী বিপ্লবী ও স্পষ্টভাষী ছাত্র নেতা হিসেবে। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন। ভারতের গৌহাটির নওপং কলেজে ভর্তি হন। সেখানে অবস্থানকালে অনেকগুলো অঞ্চলের ভাষা আয়ত্ত করেন এবং ধীরে ধীরে নকশালপন্থীদের সঙ্গে জড়িত হন। এখানে অস্ত্র গোলাবারুদ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নিয়ে আবার দেশে ফিরে আসেন।

জগৎজ্যোতি দাস ১৯৭১ সালে শিক্ষকতা করতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। ভারতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ৫ নম্বর সেক্টরের বড়ছড়া সাব সেক্টরের অধীনে যুদ্ধ করেন।  ১৫ নভেম্বর জগৎজ্যোতি দাসের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্রশস্ত্র ও রসদ নিয়ে টেকেরঘাট থেকে সন্ধ্যার পর বানিয়াচংয়ের উদ্দেশে রওনা দেন। টেকেরঘাট সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর থানার অন্তর্গত। তাঁরা নৌকাযোগে আসেন।

১৬ নভেম্বর ১৯৭১ সাল। সকালে পৌছালেন হবিগঞ্জ জেলার আজমিরীগঞ্জ থানার (বর্তমানে উপজেলা) অন্তর্গত বদলপুরে। সেখানে জানতে পারে একদল রাজাকার স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে বসে চাঁদা আদায় করছে। এ কথা শুনে তিনি তাদের আক্রমণ করেন। তাঁদের আক্রমণে দুজন রাজাকার নিহত হয় এবং দুজন আত্মসমর্পণ করে। বাকিরা পালিয়ে যায়। এমন সময় পাশে তার গ্রামের বাড়ি জলসুখা গ্রাম থেকে গুলি ধুরুম ধুরুম শব্দ আসতে লাগে। কয়েকজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে সেদিকে রওনা হন। বাকিদের দুই ভাগে ভাগ করে একদলকে পাঠান পিটুয়াকান্দি। অপর দলকে আজমিরীগঞ্জের দিকে। এর মধ্যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দুটি দল শাল্লা ও আজমিরীগঞ্জ থেকে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ করে।

সংগৃহীত

সংগৃহীত

অবস্থা প্রতিকূল দেখে জগৎজ্যোতি জলসুখা না গিয়ে পিটুয়াকান্দিতে চলে আসেন। সেখানে কয়েক ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ হয়। একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা পিছে হটতে থাকে। তখন মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের ধাওয়া করে। ধাওয়ার একপর্যায়ে জগৎজ্যোতি মাত্র তিনজন সহযোদ্ধাকে নিয়ে অনেক দূর চলে যান। মূল দল বেশ পেছনে থাকে এবং তাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এমন সময় পশ্চাদপসরণরত পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের আকস্মিক আক্রমণ করে। জগৎজ্যোতি তিন সহযোদ্ধাকে নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ প্রতিরোধ করেও ব্যর্থ হন। দীর্ঘক্ষণ যুদ্ধের একপর্যায়ে তাঁর সহযোদ্ধা আবু লাল, গোপেন্দ্র ও উপেন্দ্র শহীদ হন। তাঁর বাম পাঁজরে গুলি লাগে। আহত জগৎজ্যোতিকে জীবিত ধরার জন্য পাকিস্তানি সেনারা এগিয়ে আসছিল। কারণ, তিনি তাদের কাছে টেরর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অনেক অপারেশন করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। আহত জগৎজ্যোতি পাকিস্তানি সেনাদের কাছে ধরা পড়ার চেয়ে আত্মাহুতি দেওয়া শ্রেয় মনে করেন। নিজের গুলিতে নিজেই শহীদ হন তিনি। পরে পাকিস্তানি সেনারা তাঁর মরদেহ একটি বাঁশে বেঁধে জলসুখা গ্রামের রাস্তার পাশে কয়েক দিন ঝুলিয়ে রাখে।

মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য শহীদ জগৎজ্যোতি দাসকে মরণোত্তর বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ সনদ নম্বর ১৫৪।

আমরা দিনে দিনে এমন বীরযোদ্ধাদের ভুলতে বসেছি। তাঁদের আত্মা ত্যাগের বিনিময় যে আমাদের সমস্ত অর্জন তা মনেও রাখি না। এই সাহসী বীরযোদ্ধার মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।

তথ্যসুত্র: 
জগৎজ্যোতি উপন্যাস। লেখক : অঞ্জলি লাহিড়ী (সাহিত্য প্রকাশ)
* সিলেটের যুদ্ধকথা  লেখক : তাজুল মহম্মদ ।
* হবিগঞ্জের নাট্য কর্মী রুমা মোদক তাঁকে নিয়ে মঞ্চনাটক নির্মাণ করেন, যা ঢাকা, সিলেটে বহুবার প্রদর্শিত হয়
*বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ৩
* স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল হান্নান।
* একাত্তরের বীরযোদ্ধা। সম্পাদনা: মতিউর রহমান

Comments

comments