ঢাকা, রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮ | ১১ : ২৯ মিনিট

বাংলাদেশের প্রধান বন্দর নগরী চট্টগ্রাম। কৃত্রিমভাবে তৈরি ফয়’স লেকে ১৯৭১ সালে হত্যা করা হয়েছিল হাজার হাজার নিরস্ত্র, নিরীহ বাঙালিকে!  সেই ফয়’স লেকের বধ্যভূমি নিয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক ত্রৈমাসিক স্বপ্ন ‘৭১ এর বইমেলা সংখ্যা ২০১৭ লিখেছেন ইকবাল আহমেদ জিসান

Foy's Lake in Chittagong, Bangladeshচট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রধান বন্দর নগরী। সবুজের বুকে শিল্পীর আঁকা এই সুন্দর শহরে কৃত্রিমভাবে তৈরি এক হ্রদে ১৯৭১ সালে হত্যা করা হয়েছিল হাজার হাজার নিরস্ত্র, নিরীহ বাঙালিকে!  ১৯৭১ সাল এখানে তৈরি করে দিয়ে গেছে দেশের বৃহত্তম বধ্যভূমি। ফয়’স লেক বধ্যভূমি।

মূলত এই লেকটি ইংরেজরা তাদের বিশুদ্ধ পানির চাহিদা মেটাতে ১৯২৪ সালে তৈরি করে! ইংরেজ প্রকৌশলী মিস্টার ফয় তার পরিকল্পনা ও নকশা অনুযায়ী তৈরি করেন এই কৃত্রিম লেক আর নির্মাণ করেন পাম্প হাউস ও পাহাড়ের ওপর একটি বিল্ডিং!

হয়তো ইংরেজরা কখনো ধারণাও করতে পারেনি যে এই লেক, পাম্প হাউস আর বিল্ডিং কোনো একদিন কাল হয়ে দাঁড়াবে বাঙালিদের জন্য।

১৯৭১ সালের জুলাই মাস থেকে প্রতিদিন ওই স্থান অসংখ্য নিরীহ বাঙালির আর্তচিৎকারে কেঁপে উঠত কিন্তু কেউ শোনার বা দয়া করার ছিল না! দিনে দিনে লেকের পরিষ্কার পানি পরিণত হয়েছিল লাল রক্তে।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর চট্টগ্রামেও শুরু হয়েছিল অসহযোগ আন্দোলন, প্রতিরোধ এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি। আর পাকস্তানি বাহিনী ২৫ মার্চ কালো রাতে ঢাকায় শুরু করে অপারেশন সার্চলাইট নামক বাঙালি নিধনযজ্ঞ। ২৬ মার্চ চট্টগ্রামেও পাকিস্তানি বাহিনী শুরু করেছিল ভয়ানক আক্রমণ এবং খুব তাড়াতাড়িই পুরো চট্টগ্রাম শহরে তারা ছোট ছোট ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে দখল করে নিয়েছিল। যখন মানুষ প্রাণ বাঁচানোর জন্য ছুটছিল গ্রামের দিকে, তখন পাকিস্তানি সৈন্য আর তাদের দালালরা চষে বেড়াচ্ছিল পুরো শহর। যারা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারণ করতো তাদের খঁুজে খুঁজে হত্যা ও বন্দী করা হতো। পরবর্তীতে যখন তারা বধ্যভূমি স্থাপন করলো, তখন প্রতি রাতে শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে বন্দীদের এনে হত্যা করতো ওই লেকে ও তার আশপাশের জায়গাগুলোতে। আর নারীদের তুলে এনে বন্দী করতো পাম্প হাউস ও পাশে গড়ে ওঠা দালানে। সেই স্থানগুলোর নাম দিয়েছিল গুলিস্তঁা।

রাতের পর রাত চলতো নির্যাতন। প্রতি রাতেই তুলে আনা হতো অসংখ্য মেয়েকে আর নির্যাতনের পর মেরে ফেলা হতো তাদের। লাশগুলো ফেলে দিত লেকে।

প্রতি রাতেই কিশোরী, যুবতীদের আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে উঠত লেকের পানি আর আশপাশের সবুজ অরণ্য। কিন্তু সে আর্তচিৎকারের ধ্বনি এসে পৌঁছাত না লোকালয়ের কারও কানে। গুমড়ে মরতো নির্জন পাহাড়ি এলাকায়।

শুধু একটি স্থানেই নয়, লেকের পাশের নির্জন ভবন, লেকের লগ হাউস, টিএন্ডটি রেস্ট হাউস ছিল ভয়ংকর নারী নির্যাতনের কেন্দ্র যা পাকিস্তানি নরপশুদের জন্য ছিল এক-একটা গুলিস্তঁা।

প্রথমে তারা শুধু ‘বঙ্গবন্ধু’ আর ‘জয় বাংলা’পন্থীদের হত্যা করেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে তারা বিহারিদের নিয়ে অকাতরে বাঙালি হত্যায় মেতে ওঠে।

সৈয়দপুর থেকে বদলি হয়ে আসা রেলওয়ের কর্মকর্তা আহমেদ মকবুল খান ছিল ফয়’স লেক বধ্যভূমির সৃষ্টিকর্তা এবং পাঞ্জাবি ক্যাপ্টেন আহমেদ সামদেরানি তাকে করেছিল সেই বধ্যভূমির ঘাতক। তারপর যুক্ত হয় সুবেদার আকমল খান ও বিহারি কসাই আলী আজগরসহ আরও বিহারি ও পাকস্তানি বাহিনী মিলে গড়ে তুলেছিল সেই বিশাল কসাইখানা।

এদের আবার বাঙালি হত্যার নিয়মে ছিল ভিন্নতা। কেউ জবাই করে হত্যা করতো, কেউ গায়ের চামড়া ব্লেড দিয়ে চিড়ে লবণ-মরিচ মাখিয়ে ধীরে ধীরে যন্ত্রণা দিয়ে মারতো। আবার কেউ হত্যা করতো গুলি করে।

১৫ আগস্ট রাত ১২টায় বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধারা যখন পাকিস্তানিদের ওপর দুঃসাহসিক অপারেশন, যার নাম ছিল ‘অপারেশন জ্যাকপট’ চালাল তখন পাকস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীরা মহাবিপদের ইঙ্গিত পেয়ে পাগলের মতো খুঁজতে শুরু করেছিল আক্রমণকারী যোদ্ধাদের। কাউকে ধরতে না পেরে এবং আরও আক্রমণের শিকার হওয়ার পর তারা পুরো দমে শুরু করে তাদের হত্যালীলা আর সেই সুযোগ নিয়ে বিহারিরা সাজিয়েছিল বাঙালিশূন্যের পরিকল্পনা। চারজনকে তারা হত্যা করে। এ ছাড়া অ্যাসিড দিয়ে মুখ ঝলসে দেয় আর সেই দোষ নিরীহ ধর্মপ্রাণ বাঙালিদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে শুরু করে অকাতরে বাঙালি হত্যা।

১৯৭১ সালের ১০ নভেম্বর ছিল  রমজানের ২০তম দিন। ফজরের নামাজের পরপরই শুরু হয় বিহারিদের হট্টগোল। কন্দুক, তলোয়ারসহ অস্ত্রের ঝংকার করে শুরু হয় তাদের বাঙালি হত্যা পর্ব। যেখানে ৭০ বছরের মুয়াজ্জিন ও ৬৫ বছরের এহতেকাফ পালনকারীও ছাড় পায়নি, পায়নি একটু দয়া।

হাজার হাজার বাঙালিকে তারা হত্যা করেছিল আর ফয়’স লেক, পাঞ্জাবি লেইন, আকবর শাহ্‌, পাহাড়তলিসহ নানা জায়গায় সৃষ্টি করেছিল মাথাহীন মানব দেহের স্তূপ। সেদিন মরেছিল হাজার হাজার কিন্তু পালিয়ে ছিল কিছু সংখ্যক বাঙালি যারা সাক্ষী হয়েছিল এই কসাইখানার নির্মম অত্যাচারের। অনেকে চুপি চুপি গিয়েছিল সেই নরকে প্রিয় মানুষটির লাশের খোঁজে কিন্তু খঁুজে পাওয়া যায়নি হাজার হাজার পচা-গলা লাশের মাঝে কা‌ঙ্ক্ষিত দেহটিকে।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের পর মানুষ দলে দলে ছুটে গিয়েছিল সেই বধ্যভূমিতে। শহরের শকুন আর বেওয়ারিশ কুকুরগুলো হামলে পড়েছিল সেখানে। বিশাল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল পচা-গলা লাশ আর কঙ্কাল। পুরো চট্টগ্রাম চমকে গিয়েছিল সেই নৃশংসতা আর বর্বরতার দৃশ্য দেখে।

এই ফয়’স লেক বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়েছিল ২০ হাজারের অধিক নারী, পুরুষ ও শিশুকে।

কিন্তু আজ সেই জায়গায় সৃষ্টি হয়েছে বিশাল পার্ক, চিড়িয়াখানা, হাসপাতাল, বসতবাড়িসহ নানা স্থাপত্য। আর সামান্য জায়গা নিয়ে দাড়িয়ে আছে ‘ফয়’স লেক বধ্যভূমি’র স্মৃতিস্তম্ভটি।

Comments

comments