ঢাকা, সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮ | ০৬ : ২১ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ ৩৩তম পর্ব। জানাবো : আকরাম আলী লস্কর, পিতা : চান্দু লস্কর, মাতা : সফিরুন নেসা, গ্রাম : গজারিয়া, পেশা : গেরস্থি, বয়স : ৬৫ বছর।

Akram Ali Loskorপাকিস্তান আমলের শেষের দিকে আমি গজারিয়া থানার ওসি আনোয়ারুল হকের বাসায় বাবুর্চি হিসেবে কাজ করতাম। স্যার যখন বদলি হয়ে মনোহরদী থানায় চলে গেলেন, তখন আমাকেও সঙ্গে নিয়ে গেলেন। ১৯৭০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বাবুর্চির কাজ বাদ দিয়ে বাড়ি চলে এলাম। মাঝখানে চার-পাঁচ মাস চট্টগ্রামে ছিলাম। তারপর শুরু হয়ে যায় যুদ্ধ।
পাকিস্তানি আর্মিরা গজারিয়ায় ক্যাম্প করলো ৯ মে অপারেশনের এক মাস পর। আমি তখন বড়শি দিয়ে মাছ ধরতাম। আমার বয়স তখন ১৭ কি ১৮ বছর। মনোহরদী থানায় যে সেকেন্ড অফিসার ছিলেন, তিনি গজারিয়া থানায় বদলি হয়ে এসেছেন। এসেই আমার খোঁজখবর নিয়েছেন। জুন মাসে যখন আর্মিরা এলো, তখন তাদের রান্নাবান্না করার জন্য একজন বাবুর্চি দরকার। তাই ওই সেকেন্ড অফিসার আমাকে খবর পাঠালেন। আর্মিরা দুই দিন বাড়িতে এসে আমাকে খুঁজে গেছে। আমি বাসায় ছিলাম না। তৃতীয় দিন সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তিনজন সিপাহি আবারও আমাদের বাড়িতে আসে। তারা আমার কাছে জানতে চায়, এই বাড়িতে আকরাম নামে একটি ছেলে আছে, সে কই? আমি বলি, সে তো মাছ ধরতে গেছে, কী দরকার? তারা বললো, থানার সেকেন্ড অফিসার তাকে দেখা করতে বলেছেন। গেলেই উনি সব বলবেন। আমি বললাম, ঠিক আছে, ও এলে পাঠিয়ে দিবো। এভাবে তাদের বিদায় করে দিলাম। পরের দিন একই সময়ে তারা আবার এলো। কে যেন বলে দিয়েছে আমার নামই আকরাম। সেদিন আর তাদের কাছ থেকে রেহাই পেলাম না।
তারা আমাকে থানায় নিয়ে গেলো। সেকেন্ড অফিসার বললেন, ‘তোমাকে আর্মি ক্যাম্পে বাবুর্চির কাজ করতে হবে।’ আমি বললাম, ‘আমি তো বাবুর্চির কাজ ছেড়ে দিয়েছি। এই কাজ করতে আমার ভালো লাগে না।’ সেকেন্ড অফিসার বললেন, ‘না, তোমার করতে হবে।’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, ভেবে পরে জানাবো।’ উনি বললেন, ‘ভাবাভাবির সময় নাই, তোমাকেই এই কাজ করতে হবে।’ বাধ্য হয়ে এই কাজ শুরু করলাম।
আর্মি ক্যাম্পের পেছনে ছিল একটা বাংলো। আমি ওই ঘরে বারান্দায় রান্নাবাড়া করতাম। ভোর সাড়ে ৫টায় ক্যাম্পে চলে আসতাম। আবার বিকেলে বাড়িতে চলে যেতাম। আমি শুধু রান্না করতাম। বাজার ওরাই করতো। প্রথমে ওরা ২০ জনের মতো ছিল। পরে বেড়েছে। সব মিলিয়ে ৩৫ জনের মতো হবে। প্রায় সমান সমান পাকিস্তানি ও বাঙালি সৈন্য ছিল। পাকিস্তানিরা তিন বেলাই রুটি খেতো। আর বাঙালিরা দুই বেলা ভাত খেতো। প্রতি দিন সকালে ৮০-৯০টা রুটি বানাতাম। সকাল ৮টার মধ্যে ওরা নাস্তা করতো। আমাকে ওরা তিন বেলা খেতে দিতো। আমার কোনো বেতন ধার্য ছিল না। কোনো মাসে ২০ টাকা, কোনো মাসে ৩০ টাকা পেতাম। আর্মি কমতো বাড়তো। যে মাসে কম আর্মি থাকতো, সেই মাসে কম টাকা পেতাম।
আর্মি ক্যাম্পে পাঁচটি রুম ছিল। দুটি রুম ছিল খুবই বড়। এই দুই রুমে সব সিপাহি ফ্লোরিং করে থাকতো। অস্ত্রগুলোও তাদের সঙ্গে থাকতো। নায়েক সুবেদার, ল্যান্স নায়েক ও হাবিলদার এই তিনজন থাকতো তিন রুমে। ল্যান্স নায়েকের রুমেই ছিল অস্ত্রের মজুদখানা। চারজন সার্বক্ষণিক সেন্ট্রি ডিউটিতে থাকতো। দুইজন নিচে আর দুইজন ছাদে। সময়ে সময়ে বাঙ্কারেও থাকতো। নায়েক সুবেদারের নাম মনে নাই। তবে সবাই তাকে ‘খান স্যার’ বলে ডাকতো। মাঝবয়সী, স্বাস্থ্য খুব ভালো। হাবিলদারের নাম ছিল মজিবর রহমান। তিনি ছিলেন বাঙালি, বরিশালে বাড়ি। মুখে দাঁড়ি ছিল। ল্যান্স নায়কের নাম মোহাম্মদ খোকা খান। বড় বড় চোখ, মোচওয়ালা। বয়স বেশি হলে ২৩-২৪ বছর। সে-ই ছিল সবচেয়ে খারাপ, বদমেজাজী; নারীদের প্রতি আসক্ত ছিল। রাজাকার ছিদ্দিকের সঙ্গে ওর খুব খাতির ছিল। রাজাকাররা রাতে থানার ব্যারাকে থাকতো আর দিনের বেলায় ক্যাম্পে। রাজাকারদের মধ্যে রাজা মুনশি, শামসু কানা ও আবদুর রহিমের কথা মনে আছে। অনেক দিন আগের কথা তো, সবার নাম মনে নাই। তবে ১০-১২ জন ছিল।
খোকা চৌধুরী প্রায়ই ক্যাম্পে আসতেন। তিনি আর্মিদের ভয় পাইতেন না। আর্মিরা তার কথা শুনতো, সমীহ করতো। খোকা মিয়াকে ধরে নেওয়ার পরদিন ভোর বেলায় আর্মিরা হিন্দুদের সব বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। আমি জ্বালাতে দেখি নাই। তবে সকাল বেলা ক্যাম্পে এসে দেখি হিন্দুবাড়িগুলো জ্বলছে। আমি রান্না শেষ করে ক্যাম্পে আসছি এমন সময় নায়েক সুবেদার আমাকে ডেকে বাংলোর চাবি চাইলো। আমি বলি, ক্যান স্যার? নায়েক সুবেদার বলে, কয়েদি আছে। কাকে ধরে নিয়ে এসেছে, আমার দেখার খুব ইচ্ছা হলো। গিয়ে দেখি আরশাদ কাকা। পরে আমি সুবেদারকে বলি, ‘যাকে ধরে নিয়ে এসেছেন, তাকে আমি চিনি, খুব ভালো লোক। তাকে ছেড়ে দিন।’ সন্ধ্যায় তাকে ছেড়ে দিলো। ওইদিন যে বালুচর গ্রামের আবদুর রব রাড়ীকে নিয়ে এসে হত্যা করে, সেটা আমি দেখি নাই। এর আগে একদিন তারা নয়ানগর গ্রামের আবদুল আউয়াল রাড়ী (আবদুর রব রাড়ীর ভগ্নিপতি)-কে ধরে নিয়ে আসে। আমি অনুরোধ করার পর আর্মিরা তাকে ছেড়ে দেয়।
আমি সকালে ক্যাম্পে আসতাম, সন্ধ্যায় চলে যেতাম। ক্যাম্পে ঠিকমতো কথা বলতে পারতাম না। সারাক্ষণ ভয়ের মধ্যে থাকতাম। তাই কয়েকবার পালানোর চেষ্টা করছিলাম। পরে চিন্তা করলাম, ক্যাম্পের পাশে আমার বাড়ি। আমি চলে গেলে তো আমার বাবা-মাকে ধরে নিয়ে এসে হয়রানি করবে, মারধর করবে। এই ভেবে আর পালালাম না। রাজাকাররা যে পালিয়ে গেছে, সেটা আমি দেখেছি। রাজাকারদের সঙ্গে দুইজন বাঙালি সিপাহিও পালায়। তারা থানার সামনের বাঁশপট্টিতে গিয়ে ড্রেস খুলে পালিয়ে যায়।
আর্মিরা যে চলে যাবে তা আগে থেকে জানতে পারি নাই। ৯ ডিসেম্বর ভোর সাড়ে ৫টায় গিয়ে দেখি সবাই রেডি। বেডিংপত্র সব গুছানো। থানার ঘাটে ভিড়ে আছে একটি ছোট লঞ্চ। রাতেই নাকি লঞ্চটা আসে ওদের নিতে। যাওয়ার সময় ওরা প্রায় ৩০ জনের মতো ছিল। আমি ওদের লঞ্চে উঠিয়ে দিই। নারায়ণগঞ্জের কয়লা ঘাটে যাওয়ার সময় ভারতীয় বিমান বাহিনী ওদের লঞ্চের ওপর বোম্বিং করে। এরপর কী হলো জানি না।
আর্মিরা চলে যাওয়ার পর একজন মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে আমাকে ও আমাদের গ্রামের লাকড়ি বিক্রেতা মস্তানকে ধরে নিয়ে যায়। প্রথমে আমাদের ইসমানিচর গ্রামে নিয়ে যায়। সেখানে আমাদের মেরে ফেলা হতো। তখন গ্রামবাসী বাধা দেয়। খবর পেয়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা আসে। তারা আমাদের ফুলদী সাহেববাড়িতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে দৌলতপুর ক্যাম্পে। সব খোঁজখবর নিয়ে তারা আমাদের ছেড়ে দেয়। তারা আমাদের মারধর করে নাই। আমরাও তাদের সঙ্গে কোনো বেয়াদবি করি নাই।
স্বাধীনতার পর ৩০ বছর ঢাকায় রিকশা চালিয়েছি। এখন আমি খুব অসুস্থ। দেখতে ভালো দেখা গেলেও ভেতরে আমার খুব অসুখ। মাথা ঘুরায়, অস্থিরতা, শ্বাসকষ্ট আছে। ছেলেরা ঢাকায় সিএনজি চালায়। বাড়িতে একটু জমি আছে। সেখানে সবজি লাগাই। এই ভাবেই বেঁচে আছি।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ২৬ মে ২০১৭

আরও পড়ুন :

প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

চতুর্থ পর্ব :   নূরুল আমীন প্রধান

পঞ্চম পর্ব : সালামত জেহাদ

ষষ্ঠ পর্ব : সানোয়ারা বেগম

সপ্তম পর্ব : মনোয়ারা বেগম নার্গিস
অষ্টম পর্ব : ইসহাক মোল্লাহ
নবম পর্ব : রবিদাশী বর্মণ
০ম পর্ব : আরফাত আলী সিকদার
১১ম পর্ব : প্রল্লাদ চন্দ্র বর্মণ
২তম পর্ব : উত্তম কুমার দাশ
১৩তম পর্ব : মোতাহার হোসেন খোকন
১৪তম পর্ব : জহিরুল ইসলাম ভুঞা
১৫ তম পর্ব :  মর ফারুক আখন্দ
১৬ তম পর্ব : আবু বকর ছিদ্দিক
১৭ তম পর্ব : ফাতেমা বেগম
১৮তম পর্ব : কমলা বেগম
১৯তম পর্ব : রেজিয়া বেগম
২০তম পর্ব : নারায়ণ চন্দ্র বর্মণ
২১তম পর্ব :  হরিদাসী বর্মণ
২২তম পর্ব : জাহানারা বেগম
২৩তম পর্ব :  আবদুল হামিদ মোল্লাহ
২৪তম পর্ব : কল্পনা রানী দাশ
২৫তম পর্ব : মোসলেম উদ্দিন প্রধান
২৬তম পর্ব :  হোসেন মোল্লাহ
২৭ তম পর্ব : তানেস উদ্দিন আহমেদ
২৮তম পর্ব : লুৎফর রহমান সরকার
২৯তম পর্ব : সরদার শাহজাহান
৩০ তম পর্ব : আরশাদ আলী
৩১তম পর্ব :  আমিরুল ইসলাম

  ***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments