ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৯ : ০২ মিনিট

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর। রাত তখন আনুমানিক দেড়টা থেকে দুইটা। কয়েকজন সেনা সদস্য একটি পিকআপ করে হাজির হন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে। তখন ঢাকা অস্থিরতার নগরী। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থান নিয়ে নানা রকম কথা শোনা যাচ্ছিল। তারপর বাঙালি জাতির ইতিহাসে আরেক শোকাবহ ও কলঙ্কময় দিন যুক্ত হলো। ঘাতক চক্রে নিহত হলেন জাতীয় চার নেতা স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামান। ২০১০ সালে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সেইদিনের ঘটনা বলতেছিলেন তৎকালিন  ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জেলার আমিনুর রহমান।   

karajadugorরাত দেড়টার দিকে কারা মহাপরিদর্শক টেলিফোন করে বলে  তারে কাছে তাৎক্ষনিকভাবে আসতে। দ্রুত যাবার সময়ে কারাগারের মূল ফটকে দেখি একটি পিকআপে কয়েকজন সেনা সদস্য সশস্ত্র অবস্থায় আছে। তারা মূল ফটকের সামনে এসে কারা মহাপরিদর্শককে একটি কাগজ দিলেন। সেখানে কী লেখা ছিল তা অবশ্য জানতে পারিনি।

মূল ফটক দিয়ে ঢুকে বাম দিকেই ছিল আমার কক্ষ। তখন সেখানকার টেলিফোনটি বেজে উঠে। রিসিভারটি তুলে শুনতে পাই, প্রেসিডেন্ট কথা বলবে আইজি সাহেবের সঙ্গে।’ তখন আমি দৌড়ে গিয়ে আইজি সাহেবকে খবর দিলাম। কথা শেষে আইজি সাহেব বললেন যে প্রেসিডেন্ট সাহেব ফোনে বলছে আর্মি অফিসাররা যা চায়, সেটা তোমরা কর।”

এভাবে মূল ফটকের সামনে কথাবার্তার চলতে থাকে। এক সময় রাত তিনটা বেজে যায়। এক পর্যায়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগের চার নেতাকে একত্রিত করার আদেশ দেওয়া হয়। কারা মহাপরিদর্শক একটি কাগজে চার ব্যক্তির নাম লিখে আমাকে দেয়। নামগুলো হলো : সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামান।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং তাজউদ্দীন আহমদ কারাগারের একটি কক্ষে ছিলেন। ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এবং এএইচএম কামরুজ্জামানকে অপর কক্ষ থেকে এক খানে নিয়ে আসা হয়। আসার আগে ক্যাপ্টেন মনসুর আলী কাপড় পাল্টে নিয়েছিলেন। তাজউদ্দীন সাহেব তখন কোরআন শরীফ পড়ছিলেন। ওনারা কেউ আমাদের জিজ্ঞেস করলেন না আমাদের কোথায় নেও ( নেয়া হচ্ছে)? সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব হাত-মুখ ধুলেন। আমি বললাম আর্মি আসছে।”

চারজনকে একটি কক্ষে একত্রিত করার ক্ষেত্রে কিছুটা সময় লাগার কারণে সেনাসদস্যরা কারা কর্মকর্তাদের নোংরা ভাষায় গালিগালাজ করছিল। মনসুর আলি সাহেব বসা ছিল সর্ব দক্ষিণে। যতদূর আমার মনে পড়ে। আমি মনসুর আলীর ‘ম’ কথাটা উচ্চারণ করতে পারি নাই, সঙ্গে সঙ্গে গুলি। কারাগারের ভেতর এ নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর চার নেতার পরিবার সেদিন জানতে পারিনি।

তাজউদ্দীন আহমদের পরিবার কারাগারের খোঁজ নেবার জন্য সারাদিন চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। পরের দিন অর্থাৎ ৪ নভেম্বর পুরনো ঢাকার এক বাসিন্দা তাজউদ্দীন আহমদের বাসায় এসে জানান যে তিনি আগের দিন ভোরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গুলির শব্দ শুনেছেন।

 

Comments

comments