ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৯ : ০৪ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ ৩১তম পর্ব। জানাবো : মো. আমিরুল ইসলাম, পিতা : মো. রুস্তম আলী ব্যাপারী, মাতা : আয়েশা বেগম, গ্রাম : গজারিয়া, পেশা : ব্যবসা, পদবি : গজারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, বয়স : ৫৭ বছর।

Amirul Islam+swapno71আর্মিদের লঞ্চ আসে আজানের একটু আগ দিয়ে। লঞ্চটি আমাদের বাড়ির সামনে নদীর পাড়ে ভিড়তে চেষ্টা করে। কিন্তু কোনোভাবেই ভিড়তে পারছিল না। পরে থানার পাশে কৃষ্ণ ডাক্তারের বাড়ি বরাবর এসে ভিড়ে। লঞ্চ থেকে আর্মিরা একজন একজন করে নামছে আর শুয়ে পড়ছে। আমি আর আহসান উল্লাহ একটি গাছের আড়াল থেকে সব দেখতে পাচ্ছি। এরপর তারা গ্রামের দিকে গুলি শুরু করলো। কান ফাটানো গুলি। এক ঘন্টার মতো গুলি চললো। আমরা দৌড়ে চলে গেলাম দড়িকান্দি গ্রামের দিকে। এর মধ্যে গ্রাম সব ফাঁকা। যুবকরা সবাই পালিয়ে গেছে। লোকজন চকে পাটক্ষেতে, ইরিক্ষেতে গিয়ে আশ্রয় নিলো। অনেকে অন্য গ্রামে চলে গেলো। কেউ কেউ ফুলদী পাড়ি দিয়ে নিরাপদ গ্রামে চলে গেলো। যারা পালাতে পারলো না, তাদের বেশিরভাগই নারী-শিশু কিংবা বৃদ্ধ। তারা চকির তলা, উগুর তলা, কাঁড়, ধানের গোলা কিংবা মুরগির খোঁয়াড়ের ভেতর লুকালো। আর্মিরা কয়েকটি ভাগে ভাগ হয়ে বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে পড়লো। আর্মিদের লঞ্চ আর গানবোট ফুলদী নদী প্রদক্ষিণ করায় লোকজনের পালানোর পথ রুদ্ধ হয়ে গেলো। হানাদার বাহিনী সেদিন বিনা কারণে তিনশর বেশি মানুষকে হত্যা করলো। গজারিয়া গ্রামের শ্যাম চৌধুরী, খোকা চৌধুরী খবর দিয়ে আর্মিদের নিয়ে আসে। বিষয়টি গোপন না, সবাই জানে। তারা ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের বিপক্ষে, আওয়ামী লীগের বিপক্ষে।
১৯৭১ সালে আমি গজারিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। আমি, আহসান উল্লাহ, নূরুল হক ও বোরহান উদ্দিন ছিলাম প্রায় সমবয়সী। আমাদের বয়স এমন; না যুদ্ধে যাওয়ার, না ঘরে বসে থাকার। তাই বয়সে ছোট হলেও আমরা সারাক্ষণ বড় ভাইদের পেছন পেছন ঘুরি। কমান্ডার রফিকুল ইসলাম ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে বললাম, ‘ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিতে চাই।’ রফিক ভাই বললেন, ‘ভারতে যাওয়ার চেয়ে বরং তুমি এখানেই থাকো, গুপ্তচর হিসেবে কাজ কর। তাতে আমাদের বেশি লাভ।’ রফিক ভাই মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবীর ভাইকে নির্দেশ দিলেন আমার সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখতে।
হুমায়ুন ভাই, কাঞ্চন ভাই সকাল বিকাল আমাদের বাড়িতে আসতেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল আর্মি ক্যাম্প আক্রমণ করার। আমাদের বাড়ি ছিল এক দম থানার কাছে। তা সত্ত্বেও মুক্তিযোদ্ধাদের সমস্ত অস্ত্র থাকতো আমাদের ঘরে। আমার কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করা। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাজীপুরা কবরস্থান ও নদীপাড়ে নলখাগড়া বনে আমাদের কয়েক দফা গোপন মিটিং হয়। পুরো বর্ষাজুড়ে মিটিং চলে। প্লানিং হয় কীভাবে আর্মি ক্যাম্পের সুবেদারকে ধরে আনা যায়। খোকা চৌধুরীকে ধরার জন্য পাঁচ-ছয় দিন অপারেশন চালানো হয়েছে। খোকা চৌধুরীর বাড়ির ভেতর প্রবেশ করা ছিল সাংঘাতিক ব্যাপার। তার বাড়ির গেটে দুটি কুকুর ছিল। নেড়ি কুকুরের ভয়ে কেউ তার বাড়ির ভেতরে যাওয়ার সাহস দেখাতো না।
খোকা মিয়া ভেতরে ভেতরে আমাদের এই চারজনকে খুব ভয় পেতেন। মনে করতেন আমরা যে কোনো সময় তার ক্ষতি করতে পারি। প্রথম দিকে আমাদের বলতেন, ‘তোরা জানিস, সমস্ত গজারিয়ায় চারটি ওয়্যারলেস আছে। কে স্বাধীন বাংলা শোনে, কে কী করে সবকিছুর রেকর্ড আছে। সাবধান, তোরা কিন্তু স্বাধীন বাংলা শুনবি না। পাকিস্তানিরা দেশটাকে তামা করে হলেও দখল ছাড়বে না। পাকিস্তানি আর্মি হলো সারা পৃথিবীতে নাম্বার ওয়ান। ভারত যত কিছুই করুক, কোনো লাভ নাই।’
আগস্ট মাসে এসে তার সুর পাল্টে গেলো। আমাদের বললেন, ‘তোমরা আমাকে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মিলিয়ে দাও। আমি কেমন করে তাদের সহায়তা করতে পারি বলো?’ ওই সময় খোকা মিয়ার সঙ্গে নানা বিষয়ে আমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়। খোকা মিয়া আমাদের কথা দেন, তিনি আর্মি ক্যাম্প আক্রমণে সব রকমের সহযোগিতা করবেন। অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধারা আমাদের বলেছেন, ‘তোমরা আর্মি ক্যাম্পের ভেতরের পরিস্থিতি দেখবা। তোমরা রেকি করার পর আমরা আক্রমণে যাবো।’ মুক্তিযোদ্ধাদের কথামতো আমি আর্মি ক্যাম্প রেকি করি। মাথায় ইলিশ মাছের ডালা নিয়ে আর্মি ক্যাম্পের ভেতরে যাই। ইপিআরের একজন ছিল, বাঙালি। সে আমাকে সাহায্য করেছে।
আর্মিরা মাঝে মাঝেই খোকা মিয়ার বাসায় যেতো। থানায় জব্বর নামে একজন পুলিশ ছিল, খুব খারাপ ছিল সে। তার সঙ্গেই খোকা মিয়ার সবচেয়ে বেশি খাতির ছিল। ওই জব্বর পুলিশই জবরদস্তি করে বাসন্তীকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়। আর্মিরা কখন মুভ করবে, সে খবর আমরা আগেভাগেই পেয়ে যেতাম। তারা সন্ধ্যার পর খুব একটা বের হতো না। ক্যাম্পে ১৪ জন রাজাকার ছিল। রাজাকারদের লিড দিতো মোসলেম।
ওই সময় খোকা মিয়াই ছিল সর্বেসর্বা। থানা পুলিশ তাকে ছাড়া কিছু বুঝতো না। তাই তিনি সহজে মানুষের ওপর অত্যাচার জুলুম করতে পারতেন। তার এইসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে প্রতিষ্ঠিত হয় অগ্নিবীণা সমিতি। অগ্নিবীণাই হলো বড় কাল! অগ্নিবীণার ওপর ক্ষিপ্ত হয়েই তারা তাদের প্রভু পাকিস্তানি আর্মিদের খবর দেয়। ফলে সাধারণ মানুষকে জীবন দিয়ে তার খেসারত দিতে হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা ছিল, তারা খোকা মিয়ার সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। কীভাবে আর্মি ক্যাম্প আক্রমণ করা যায়, সে বিষয়ে কথা বলবেন। সেই অনুযায়ী বোরহান তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে আসে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা খোকা মিয়াকে ধরে নিয়ে যায়। এর দুই দিন আগে আমি ১৪ জন রাজাকারকে আত্মসমর্থনের ব্যবস্থা করেছি। রাজাকাররা লাইন ধরে থানা থেকে বেরোয়। রাজাকার ছিদ্দিক যেতে চায় নাই। তাকেও পাঠানোর ব্যবস্থা করেছি। যেদিন যাওয়ার কথা ছিল, সেদিন যেতে পারে নাই। গেলো পরের দিন।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ১৫ এপ্রিল ২০১৫

আরও পড়ুন :

প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

চতুর্থ পর্ব :   নূরুল আমীন প্রধান

পঞ্চম পর্ব : সালামত জেহাদ

ষষ্ঠ পর্ব : সানোয়ারা বেগম

সপ্তম পর্ব : মনোয়ারা বেগম নার্গিস
অষ্টম পর্ব : ইসহাক মোল্লাহ
নবম পর্ব : রবিদাশী বর্মণ
০ম পর্ব : আরফাত আলী সিকদার
১১ম পর্ব : প্রল্লাদ চন্দ্র বর্মণ
২তম পর্ব : উত্তম কুমার দাশ
১৩তম পর্ব : মোতাহার হোসেন খোকন
১৪তম পর্ব : জহিরুল ইসলাম ভুঞা
১৫ তম পর্ব :  মর ফারুক আখন্দ
১৬ তম পর্ব : আবু বকর ছিদ্দিক
১৭ তম পর্ব : ফাতেমা বেগম
১৮তম পর্ব : কমলা বেগম
১৯তম পর্ব : রেজিয়া বেগম
২০তম পর্ব : নারায়ণ চন্দ্র বর্মণ
২১তম পর্ব :  হরিদাসী বর্মণ
২২তম পর্ব : জাহানারা বেগম
২৩তম পর্ব :  আবদুল হামিদ মোল্লাহ
২৪তম পর্ব : কল্পনা রানী দাশ
২৫তম পর্ব : মোসলেম উদ্দিন প্রধান
২৬তম পর্ব :  হোসেন মোল্লাহ
২৭ তম পর্ব : তানেস উদ্দিন আহমেদ
২৮তম পর্ব : লুৎফর রহমান সরকার
২৯তম পর্ব : সরদার শাহজাহান
৩০ তম পর্ব : আরশাদ আলী

 ***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments