ঢাকা, বৃহষ্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০৮ : ৫৫ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ ৩০তম পর্ব। জানবো : আরশাদ আলী, পিতা : আবদুল মান্নান, মাতা : রাবেয়া খাতুন, গ্রাম : গজারিয়া, পেশা : ব্যবসা (বর্তমানে গজারিয়া বাজারে জ্বালানি তেলের ব্যবসা করেন), বয়স : ৬৯ বছর।

Arshad Ali_swapno71ওই সময় গজারিয়া বাজারে আমার ছোট্ট একটা চায়ের দোকান ছিল। আমার দোকানে খোকা মিয়া প্রতিদিন সকাল বিকাল চা খেতে আসতেন। ওইদিন মাগরিবের নামাজের কিছুক্ষণ আগে খোকা মিয়া আমার দোকানে এলেন। চকির ওপর বসে আমাকে বললেন, ‘আরশাদ মিয়া, একটা চা বানাও।’ আমি চা বানিয়ে দিলাম। খোকা মিয়া চা খাচ্ছেন। এর মধ্যে উনারা (সরদার শাহজাহান ও আবদুস সাত্তার খান) এসে হাজির হলেন। আমাকে চোখে ইশারা করলেন। খোকা মিয়ার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেন, চা খেলেন। এরপর খোকা মিয়া কোনো শব্দ না করে তাদের সঙ্গে চলে গেলেন। রাতে চারদিকে এই খবর ছড়িয়ে গেল। খবর পেয়ে আর্মিরা রাতেই খোকা মিয়ার বাসায় গেলো। খোকা মিয়ার বড় বউয়ের কাছে ঘটনার বৃত্তান্ত জানতে চাইলো। বড় বউ বললো, ‘আমি তো কিছু বলতে পারবো না। তবে সে আরশাদের দোকানে বসে চা খাচ্ছিল। সেখান থেকে তাকে ধরে নিয়ে গেছে বলে শুনেছি।’ রাতে আর্মিরা খোকা মিয়াকে খোঁজাখুঁজি করলো। না পেয়ে ক্যাম্পের সামনের সব হিন্দুবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।

পরদিন সকাল ৭টা। সবে দোকান খুলে বসেছি। এমন সময় দোকানে ১০-১২ জন আর্মি আসে। উর্দুতে আমাকে জিজ্ঞাসা করে-‘তোমার নাম কি আরশাদ?’ আমি বলি, জ্বি। তাদের একজন বলে, ‘তুমি আমাদের সঙ্গে চলো। তোমার সঙ্গে কথা আছে।’

তারা আমাকে থানায় নিয়ে যায়। সেখানে একটি রুমের মাঝখানে বসিয়ে তারা চারদিক থেকে নানা রকম ইন্টারোগেশন শুরু করে। বলতে থাকে , ‘খোকা মিয়াকে কারা ধরে নিয়ে গেছে বলো?’ আমি বলি, ‘আমার দোকানে প্রতিদিন অনেক লোক আসে। চা খায়, গল্প করে। কারা তাকে ধরে নিয়ে গেছে, আমি জানি না।’ আর্মিরা বলে, ‘চারদিকে নদী। মাঝখানে তোমার দোকান। তুমি চেনো না, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ আমি বলি, ‘স্যার, মুখ দেখলে চিনতে পারবো।’
গজারিয়া থানার দক্ষিণ পাশেই থানা কাউন্সিল হল। এটাই হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প। এই ক্যাম্পের পেছনে টিনের তৈরি একটি চৌচালা বাংলো। কিছুক্ষণ পর আমাকে ওই বাংলোয় নিয়ে যাওয়া হলো। ডানপাশের একটি রুমে আমাকে দাঁড় করানো হলো। আমার সামনে দুইজন আর পেছনে দুইজন মেলিটারি। সামনের একজন বলে, ‘তুমি যদি সত্য কথা না বলো, তাহলে কেমন করে সত্য বের করতে হয় দেখাচ্ছি।’ আমি ভাবছি, ‘আমি তো শেষ! এখন আমি যদি তাদের নাম বলি, তাহলে আর্মিরা তাদের বাড়ি গিয়ে ঘরবাড়ি, গ্রাম জ্বালিয়ে দিবে। ওদের বাবা, মা আর স্বজনদের ধরে এনে শেষ করে দিবে।’ সিদ্ধান্ত নিলাম, মরতে হয় মরবো; কিন্তু জীবন থাকতে কারো নাম বলবো না।’

কিছু বলছি না দেখে এক আর্মি আমার ডান গালে জোরে একটা থাপ্পড় দিলো। থাপ্পড় খেয়ে আমি ঝাপসা দেখতে শুরু করি। পরে বাম গালে আরেকটা থাপ্পড় দেয়। এভাবে আমাকে একেপর এক থাপ্পড় দিতে থাকে। কমপক্ষে ২৫-৩০টা হবে। আমি তখন ইয়ং। কতোই বা বয়স, ২২-২৩ বছর হবে। এবার বন্দুকের ট্রিগার টিপতেই চকচকে সাদা বেয়নেট বের হলো। বেয়নেটটি আমার পেটে ধরে বলল, ‘এবার সত্য বল। না হলে পুরোটা ঢুকিয়ে দেবো।’ আমি নির্বিকার। এরপর ওরা আমার গায়ের জামা খুলে আমাকে হাত বেঁধে ঘরের একটি আড়ার সঙ্গে টাঙালো। শুরু হলো কিল, ঘুষি আর লাথি। এভাবে নির্যাতন চলতে থাকল।
ঘন্টাখানেক পর বালুচর গ্রামের আবদুর রব রাড়ীকে নিয়ে আসা হলো। রব ভাই আমাকে বললেন, ‘কেন আমাকে নিয়ে আসে, বুঝতে পারছি না।’ রব ভাই জানালেন, ‘মুন্সিগঞ্জ থেকে গয়না নাওয়ে করে তিনি গজারিয়া আসছিলেন। ঘাটে নামতেই আর্মিরা তাকে ধরে নিয়ে আসে।’ আমার সামনের আড়ায় রব ভাইকে টাঙানো হলো। আমরা দুইজন শূন্যে ঝুলে আছি। রব ভাইকে প্রথমে হাতে মারতে শুরু করে। তারপর রাইফেলের বাঁট দিয়ে। রব ভাইয়ের নাক-মুখ দিয়ে ফেনা ফেনা রক্ত বের হচ্ছে। টপটপ করে রক্ত পড়ছে। রক্তে মেঝে ভিজে গেলো। ২০ মিনিটের মধ্যে উনার মাথাটা কাত হয়ে গেলো। কোনো সাড়াশব্দ নাই।

এরপর আমার হাতের রসি খুলে দেয়। আমাকে ঘরের ভেতর রেখে দরজায় তালা লাগিয়ে দেয়। আমার সামনে ঝুলছে রব ভাইয়ের নিথর দেহ। ওরা চলে যাওয়ার পর আমি টিনের ছিদ্র দিয়ে দেখি বাংলোর চারপাশে চারজন বন্দুক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের পাহারা দিচ্ছে। সন্ধ্যার দিকে এক কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে ওসি সাহেব ক্যাম্পে আসলেন। তার সঙ্গে আমাদের গ্রামের মুরব্বি নৈমুদ্দিন পোদ্দার আর পান্ডব আলীও এলেন। তারা সুবেদারের সঙ্গে কথা বললেন। কী কথা বললেন জানি না। দূরে মাগরিবের নামাজের আজান শোনা যাচ্ছে। আর্মি ক্যাম্পের বাবুর্চি আকরাম আলী লস্কর আমার কাছে এসে বললেন, ‘কাকা, চিন্তা কইরেন না। ওসি সাহেব আসছে আপনাকে ছাড়িয়ে নিতে।’ কিছুক্ষণ পর ওসি সাহেব আমাকে নিতে এলেন। ওসি সাহেবের জিম্মায় আমাকে ছাড়া হলো। ছাড়ার সময় আর্মির ওই সুবেদার আমাকে কিছু শর্ত দিলো। ওসি সাহেব আমাকে নিয়ে তার রুমে গেলেন। বললেন, ‘বাড়ি যেতে পারবা, না সাহায্য লাগবে?’ বললাম, ‘পারবো।’

অন্ধকার পথে থানার গোপাট ধরে বাড়ি ফিরছি আর ভাবছি, আজ খুব কাছ দিয়ে মৃত্যু চলে গেলো!

সাক্ষাৎকার গ্রহণ  : ২৮ এপ্রিল ২০১৭

আরও পড়ুন :

প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

চতুর্থ পর্ব :   নূরুল আমীন প্রধান

পঞ্চম পর্ব : সালামত জেহাদ

ষষ্ঠ পর্ব : সানোয়ারা বেগম

সপ্তম পর্ব : মনোয়ারা বেগম নার্গিস
অষ্টম পর্ব : ইসহাক মোল্লাহ
নবম পর্ব : রবিদাশী বর্মণ
০ম পর্ব : আরফাত আলী সিকদার
১১ম পর্ব : প্রল্লাদ চন্দ্র বর্মণ
২তম পর্ব : উত্তম কুমার দাশ
১৩তম পর্ব : মোতাহার হোসেন খোকন
১৪তম পর্ব : জহিরুল ইসলাম ভুঞা
১৫ তম পর্ব :  মর ফারুক আখন্দ
১৬ তম পর্ব : আবু বকর ছিদ্দিক
১৭ তম পর্ব : ফাতেমা বেগম
১৮তম পর্ব : কমলা বেগম
১৯তম পর্ব : রেজিয়া বেগম
২০তম পর্ব : নারায়ণ চন্দ্র বর্মণ
২১তম পর্ব :  হরিদাসী বর্মণ
২২তম পর্ব : জাহানারা বেগম
২৩তম পর্ব :  আবদুল হামিদ মোল্লাহ
২৪তম পর্ব : কল্পনা রানী দাশ
২৫তম পর্ব : মোসলেম উদ্দিন প্রধান
২৬তম পর্ব :  হোসেন মোল্লাহ
২৭ তম পর্ব : তানেস উদ্দিন আহমেদ
২৮তম পর্ব : লুৎফর রহমান সরকার

২৯তম পর্ব : সরদার শাহজাহান

  ***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments