ঢাকা, রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | ১২ : ৫৭ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ ২৯তম পর্ব। জানবো : সরদার শাহজাহান, পিতা : সরদার জয়নাল আবেদীন, মাতা : হবিলা বেগম, গ্রাম : গোসাইরচর, পদবি : মুক্তিযোদ্ধা। পেশা : ব্যবসা। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে বসবাস করেন। বয়স : ৬৩ বছর।

Sorder Shajahan_swapno71১৯৭১ সালে আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। দেশটা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এগিয়ে চলছিল। বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার মতো আমাদের এলাকাও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে উজ্জীবিত ছিল। শুধু এই অপরাধে হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ৯ মে আমাদের সুন্দর সাজানো গোছানো গ্রামটার সবাইকে মেরে শ্মশান বানিয়ে দিলো। এই এক মর্মান্তিক কাহিনী। এই ঘটনা বলতে গেলে এখনো আমার গলা ভারী হয়ে আসে। ওরা আসে কাকডাকা ভোরে আর সবকিছু তছনছ করে ফিরে যায় শেষ বিকেলে। এ ঘটনায় মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। সিদ্ধান্ত নিলাম এর বদলা নিবোই। একদিন কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে উধাও। সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে গেলাম ভারতে। যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে আগস্ট মাসের শেষের দিকে দেশে চলে আসি। গ্রামে ঢুকে আমার যে কী রকম অনুভূতি হলো, বোঝাতে পারবো না। কতদিন মাকে দেখি না! মা আমাকে দেখে বললেন, ‘তোমার এ কী হাল! এতদিন তুমি কোথায় ছিলা?’ ছোট ছেলে বলে মা আমাকে একটু বেশিই ভালোবাসতেন। মাকে বললাম, কোথায় ছিলাম, এগুলো পরে বলবো, আগে খেতে দাও। খেতে খেতে মাকে বললাম, ‘মা, আমার আশা বাদ দাও। মনে করবা তোমার একটাই ছেলে আছে। আমি ফিরতেও পারি, না-ও পারি।’ মার চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছে।
থানার খুব কাছে আমাদের গ্রাম। তাই গ্রামে থাকা নিরাপদ না। ছোট বোনের জামাই রাজা মুনশিকে ডেকে বললাম, ‘তুমি রাজাকার বাহিনীতে যোগ দাও।’ রাজা মুনশি বলেÑ‘কী কন ভাই!’ আমি বললাম, ‘যা বলি, তা-ই কর। সেখানকার সব ইনফরমেশন আমাদের লাগবে।’ রাজা মুনশিকে চর হিসেবে রাজাকার বাহিনীতে ভিড়িয়ে দিলাম। এর এক মাসের পরের ঘটনা। নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ের এক সন্ধ্যায় রাজা মুনশির নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন রাজাকার এলো গোসাইরচর সোনালি মার্কেটের শেষ মাথায়, খেয়াঘাটের কাছে। আজকের সোনালি মার্কেট তখন ছিল না। রাস্তা বলতে ছিল একটি গোপাট। রাজাকারদের বন্দি করে ফেললাম। কিছু অস্ত্র আর গোলাবারুদ পাওয়া গেলো। রাজাকার ছিদ্দিককে পরের রাতেই মাইনাস করে দিলাম। ছিদ্দিক ছিল খুব খারাপ। সে নারীদের খুব অত্যাচার করতো।

রাজাকারদের স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণের পর আমাদের মনোবল আরও বেড়ে গেলো। আমরা আর্মি ক্যাম্প আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু গ্রামবাসী বলছিল, ‘ক্যাম্পে আক্রমণ করা হলে আর্মিরা গ্রাম জ্বালিয়ে দিবে। নির্বিচারে মানুষ মারবে। তাই এখনই এটা করা ঠিক হবে না।’ কিন্তু আমরা গজনবী আহমেদ চৌধুরী খোকা মিয়াকে ধরে আনার সিদ্ধান্তে অটল থাকি। খোকা মিয়া ছিল অত্যন্ত ঠাঁটাবাজ টাইপের, আর্মিদের পেয়ারে দোস্ত। তার জন্যই গজারিয়াবাসীর জীবনে ৯ মে বিভীষিকা নেমে আসে। তখন আমাদের ক্যাম্প ছিল ফুলদী নদীর মাঝ বরাবর, প্রধানেরচরের কাছে। এখানকার একটি নৌকায় আমরা কয়েকজন অবস্থান নিয়ে আছি। এর মধ্যে খোকা মিয়াকে ধরতে আমি বেশ কয়েকবার গজারিয়া বাজারে যাই কিন্তু টার্গেট মিলে না। বারবার ফেল করি। এক রাতে অল্পের জন্য বেঁচে যায় খোকা মিয়া।

নভেম্বর মাসের প্রায় শেষ। জমি থেকে পানি নেমে গেছে। ভাবলাম, আজ তাকে ধরে নিয়ে আসবোই। আমি ডেসপারেট। প্রতিশোধ না নেওয়া পর্যন্ত মনে শান্তি নাই। দুপুরে খাওয়া-ধাওয়ার পর সবাইকে বললাম, যে কোনো কিছুর বিনিময়ে আজ তাকে ধরে আনবোই, এতে যদি জান যায় যাবে। কে যাবেন আমার সাথে, বলেন? কেউ রাজি হয় না। তখন বাঁশগাঁও গ্রামের আবদুস সাত্তার খান বললেন, ভাই আমি যাবো। *[*সাত্তার খান আমার থেকে বয়সে বড়। ইপিআরে চাকরি করতেন। গভর্নর হাউসে (বর্তমানে বঙ্গভবন) ডিউটি ছিল তার। ২৫ মার্চের পর চাকরি ফেলে গ্রামে চলে আসেন। পরবর্তী সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আস্তানা গাড়েন।] আমি বললাম, ঠিক আছে, চলেন। ব্যাগে স্টেনগান, দুটি ম্যাগজিন আর দুটি গ্রেনেড নেন। এরপর আমরা দুইজন বাঁশগাঁও হয়ে কাজীপুরা গ্রামে দপ্তরি চাচার বাড়িতে গিয়ে উঠলাম। দপ্তরি চাচার নাম আসলে ফৈইজ উদ্দিন। তিনি আমাদের স্কুলের দপ্তরি ছিলেন। তাই তাকে আমরা দপ্তরি চাচা বলে ডাকতাম। খবর নেওয়ার জন্য দপ্তরি চাচাকে গজারিয়া বাজারে পাঠালাম। তিনি ফিরে এসে বললেন, ‘খোকা মিয়া এখনো বাজারে আসে নাই।’

বিকেল পেরিয়ে যাচ্ছে। পরে আরেকজন সোর্স পাঠালাম খবর নিতে। সোর্স এসে বললো, ‘একটু আগে সে বাজারে এসেছে।’ বাজারে গিয়ে দেখি তিনি আরশাদ আলীর চায়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছেন। সামনে গিয়ে তাকে বড় করে একটা সালাম দিলাম। আমাকে দেখে খোকা মিয়া বললেন, ‘আরে ভাতিজা! তুমি আইছো? বস, বস। কী খবর বলো।’ আরশাদকে বললেন, ‘অ্যাই চা দাও।’ পাঁচ-সাত মিনিট তার সঙ্গে কথা বললাম, চা খেলাম। কিছুক্ষণ পর বললাম, ‘চাচা, আপনার সঙ্গে কথা আছে, চলেন।’ খোকা মিয়া বললেন, ‘কোথায় যেতে হবে?’ আমি বললাম, ‘গেলেই বুঝবেন।’ চোখ পাকিয়ে বললাম, ‘যাবেন; না যাবেন না?’ খোকা মিয়া বললেন, যাবো। সাত্তার ভাইকে বললাম, জিনিসটা দেখাইয়া দেন। খোকা মিয়া বললেন, ‘দেখাতে হবে না। আমি জানি।’ এরপর তাকে নিয়ে লঞ্চঘাটের কাছে নদীর কিনারে গেলাম। দুইজন কথা বলছি। কাউকে কিছু বুঝতে দিচ্ছি না। সাত্তার ভাইকে বললাম, ‘আপনি একটু অবজারভেশনে থাকেন। দেখেন কেউ আমাদের লক্ষ করছে কিনা?’ এর মধ্যে স্টেনগানটা বের করলাম। বললাম, ‘হৈচৈ করবেন না, করলে একটা টান দিবো।’ খোকা মিয়া কোনো হৈচৈ করলেন না। আমি চাচ্ছিলাম সন্ধ্যা হোক। অন্ধকার হওয়ার আগে তাকে নেওয়াটা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ গ্রামবাসী তাকেও চেনে, আমাদেরও চেনে। কিছুক্ষণের মধ্যে সন্ধ্যা নেমে এলো। অন্ধকারের ভেতর গোপাট ধরে তাকে কাজীপুরা গ্রামের দিকে নিয়ে গেলাম। তাকে গোপাট দিয়ে নিয়ে যাওয়া কঠিন। লোকজন দেখলে বিপদ! তাই আমরা বিলে নেমে গেলাম। একটু হাঁটার পর সাত্তার ভাইকে বললাম, ‘চোখটা বেঁধে ফেলেন।’ সাত্তার ভাইয়ের একটা ভালো গুণ ছিল, উনি আমার বাইরে চিন্তা করেন নাই। যখন যা করার দরকার ছিল, তা-ই করেছেন। একটু দেরিও করেন নাই আবার নিজে নিজে অ্যাডভান্সডও হন নাই।

খোকা মিয়াকে নিয়ে যখন ক্যাম্পে যাই, তখন রাত প্রায় ৮টা। আমাদের নৌকা বাঁধা ছিল প্রধানেরচরের পুবপাশে। নৌকায় উঠিয়ে তাকে তলায় অস্ত্রগুলো দেখালাম। তিনি সব অস্ত্র চেনেন। ঘন ঘন চা-সিগারেট খেতেন খোকা মিয়া। নৌকায় তার জন্য সব ব্যবস্থা রাখা হলো। তাকে নৌকায় দিয়ে চলে গেলেন সাত্তার ভাই। সে রাতেই খোকা মিয়াকে নিয়ে আমরা চলে গেলাম বৈদ্যারগাঁওয়ের কাছে। তাকে পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব দিই রাজা মুনশিকে। খোকা মিয়ার বয়স তখন পঞ্চাশের কাছাকাছি। তিনি বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি ও উর্দুতে কথা বলতে জানেন। এলএমজিসহ প্রায় সব ধরনের অস্ত্র চালাতে জানেন। সিরাজ-উদ-দৌলা নাটকে তিনি লর্ড ক্লাইভের ভূমিকায় অভিনয় করতেন। কথাও বলেন লর্ড ক্লাইভের মতো। আমি তাকে কৌশলে নানা কথা জিজ্ঞাসা করি। কিন্তু কেউ সহজে নিজের কথা স্বীকার করতে চান না। আমি বলি, আর্মিদের তালিকায় কার কার নাম আছে, বলেন? খোকা মিয়া বলেন, ‘আর্মিদের কাছে হোল অব দ্যা টেরিটরির যুবকদের লিস্ট আছে। দেশটা তামা করে হলেও পাকিস্তানিরা তাদের রাজত্ব কায়েম করবে।’ কারা বেশি ঝুঁকিতে আছে? খোকা মিয়া বলেন, ‘বাড়ির সামনে তো তোমরাই আছো।’ স্পষ্ট করে নাম বলেন। খোকা মিয়া বলেন, ‘ফজলু, খালেক, কাশেম, আলী হোসেন, হাকিম, তুমিসহ আরও অনেকে।’ আমাকে পরিষ্কার ভাবে বলছেন, ‘তুমি হঠাৎ হঠাৎ গজারিয়া বাজারে যাও, আবার বিদ্যুতের গতিতে চলে আসো। তুমি গজারিয়া বাজারে যাবা না। তোমাকে ওরা হন্যে হয়ে খুঁজছে। তোমাকে পেলে ওরা নাস্তা করবে।’ আপনি কি আমার কথা আর্মিদের কাছে বলছেন? খোকা মিয়া বলেন, ‘দেখো বাবা, তোমরা আমার পেটের পোলা। জন্মের পর থেইক্যা তোমাদের চিনি। আমি জানি তুমি আমার কথা বিশ্বাস করবা না। তবে আমি তোমার কথা বলি নাই। আমি এখন পর্যন্ত তোমার কোনো ক্ষতি করি নাই।’

ওই রাতেই খবর পেয়ে ফুলদী থেকে মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবীরের বাবা আবদুর রহিম সাহেব এলেন। তিনি বললেন, ‘শাহজাহান, তুমি যে কাজ করেছো, তোমার সাহসিকতার প্রশংসা না করে পারছি না। আমার ছেলে যা পারে নাই, তুমি তা করেছো, তুমি কী উপহার চাও, বলো?’ পরের দিন সকালে ক্যাম্পে আমার বড় ভাই এলেন। বললেন, ‘আর্মিরা আরশাদকে ধরে নিয়ে গেছে। থানার পাশের সব হিন্দু ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। খবর পেলে আমাদের বাড়িঘরও জ্বালিয়ে দিবে। তুই খোকা মিয়ারে ছেড়ে দে।’ আমি বলি, ‘ঠিক আছে ছেড়ে দিব, এখন আপনি বাড়ি চলে যান।’ এর মধ্যে খবর পাই আর্মিরা আমাদের ক্যাম্পের খোঁজ পেয়ে গেছে। যে কোনো সময় হামলা হতে পারে। আমাদের প্রধান কাজ ছিল, হিট অ্যান্ড রান। ফলে আমরা স্থান পরিবর্তন করে রসুলপুরের দিকে চলে যাই। খোকা মিয়াকে তিনদিন আমাদের সঙ্গে রাখি। তাকে শারীরিকভাবে কোনো আঘাত করা হয়নি। সব সময় যথাসাধ্য ভালো ব্যবহার করেছি। তাই তিনি কিছুটা নিশ্চিত ছিলেন, তাকে বোধহয় আর কিছু করা হবে না।

অগ্রহায়ণের সন্ধ্যা। সাদা সাদা কুয়াশায় ঢেকে গেছে চারপাশ। ফুলদী নদীর নিস্তব্ধ সীমানা পেরিয়ে মেঘনার মোহনায় এসে থামে আমাদের ছইয়া নাও। বিপরীত দিক থেকে আসে আরেকটি ছইয়া নাও। সেই নাওয়ে জনা পাঁচেক মুক্তিযোদ্ধা। তারা খোকা মিয়াকে তাদের নৌকায় তুলে নেয়। এরপর তারা খোকা মিয়াকে বেয়োনেট চার্জ করে গভীর মেঘনায় ভাসিয়ে দেয়। নদীর অতল জলে চিরদিনের জন্য ডুবে থাকে খোকা মিয়া।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ২৫ এপ্রিল ২০১৭

আরও পড়ুন :

প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

চতুর্থ পর্ব :   নূরুল আমীন প্রধান

পঞ্চম পর্ব : সালামত জেহাদ

ষষ্ঠ পর্ব : সানোয়ারা বেগম

সপ্তম পর্ব : মনোয়ারা বেগম নার্গিস
অষ্টম পর্ব : ইসহাক মোল্লাহ
নবম পর্ব : রবিদাশী বর্মণ
০ম পর্ব : আরফাত আলী সিকদার
১১ম পর্ব : প্রল্লাদ চন্দ্র বর্মণ
২তম পর্ব : উত্তম কুমার দাশ
১৩তম পর্ব : মোতাহার হোসেন খোকন
১৪তম পর্ব : জহিরুল ইসলাম ভুঞা
১৫ তম পর্ব :  মর ফারুক আখন্দ
১৬ তম পর্ব : আবু বকর ছিদ্দিক
১৭ তম পর্ব : ফাতেমা বেগম
১৮তম পর্ব : কমলা বেগম
১৯তম পর্ব : রেজিয়া বেগম
২০তম পর্ব : নারায়ণ চন্দ্র বর্মণ
২১তম পর্ব :  হরিদাসী বর্মণ
২২তম পর্ব : জাহানারা বেগম
২৩তম পর্ব :  আবদুল হামিদ মোল্লাহ
২৪তম পর্ব : কল্পনা রানী দাশ
২৫তম পর্ব : মোসলেম উদ্দিন প্রধান
২৬তম পর্ব :  হোসেন মোল্লাহ
২৭ তম পর্ব : তানেস উদ্দিন আহমেদ
২৮তম পর্ব : লুৎফর রহমান সরকার

 ***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments