ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮ | ১০ : ৪২ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ ২৮তম পর্ব।  জানবো : লুৎফর রহমান সরকার, পিতা : জাফর আলী সরকার, মাতা : রাবেয়া খাতুন, গ্রাম : গজারিয়া, পেশা : ব্যবসা, বয়স: ৭৬ বছর।

লুৎফর রহমান সরকার। ছবি : সাহাদাত পারভেজ

লুৎফর রহমান সরকার। ছবি : সাহাদাত পারভেজ

আমি তখন ঢাকায় ওয়াসাতে চাকরি করি। গোসাইরচরের আনসার আলী মাস্টার আর আমি ঢাকায় একসঙ্গে থাকি। পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর বন্ধে ৮ মে আমরা দুইজন একসঙ্গে বাড়ি আসি। ৯ মে ভোরে আমি ঘুম থেকে উঠি। তখন আমার ছোট ভাই আমিনুল হক দৌড়ে এসে বললো, মিয়াভাই মেলিটারি আইসা পড়ছে। আমি তাকে বললাম, ‘মেলিটারি আসছে তো কি হইছে? তারা হয়তো থানায় ইনকোয়ারিতে আসছে। কাজ শেষে চলে যাবে।’ আমি তখনো ঘটনা বুঝতে পারি নাই। ও তখন বললো, ‘ভাই এটা কিন্তু আমাদের বাঁচা-মরার ব্যাপার।’ এমন সময় দুটি গুলির শব্দ হলো। আমার মনে কামড় খাইল, গুলি তো হওয়ার কথা না। তখন আমি চিন্তিত হয়ে পড়লাম। স্বর্ণের জিনিসপত্র যা ছিল তা দুইটা পোঁটলার ভেতর ভরে বাড়ির পাশে একটি গর্ত করে রাখলাম। ভাইবোনদের বললাম, ‘তোরা যে যেখানে পারিস, চলে যা।’

আমি আমার বৃদ্ধ মা আর স্ত্রী নাছিরা আক্তারকে নিয়ে রওনা হলাম। মাকে ধরাধরি করে ধানক্ষেতের আল ধরে সামনের দিকে আগালাম। মানুষ পিঁপড়ার জাঙ্গালের মতো ছুটছে। গুলি হচ্ছে বৃষ্টির মতো। গুলি খেয়ে আমার আশপাশের বেশ কয়েকজন পড়ে গেল। আমার দুই পাশ দিয়ে গুলি যাচ্ছে। সৌভাগ্যবশত আমাদের গায়ে গুলি লাগে নাই। আমরা বাঁশগাঁওয়ের কাছাকাছি গেলাম। পুকুরপাড়ে মানুষের অভাব নাই। ভাবলাম এত মানুষের মধ্যে থাকা ঠিক না। তখন আমরা নাজিরচর গ্রামে আরশাদ স্যারের বাড়িতে গেলাম। স্যারের দোতলা বাংলাঘরেও লোকজনের অভাব নাই। ওখানে গিয়ে গজারিয়া থানা সার্কেল অফিসার সৈয়দ জামিলুর রহমান ও তার প্রতিবন্ধী ছেলেকে দেখতে পেলাম। পাশের একটি চৌচালা ঘরে মা ও স্ত্রীকে রেখে একাই ছুটলাম। কলসেরকান্দি গ্রামের সামনে একটি বুকসমান পাটক্ষেতে অনেক ছেলেপেলে লুকিয়ে আছে। এর মধ্যে আর্মিরা গুলি ছাড়তেছে। যে মাথা উঁচু করে সে-ই ধাপাইয়া পড়ে। এভাবে ওরা সাতজনকে মেরে ফেলল। আমি দূর থেকে দেখে ভাবলাম, এ কোথায় আসলাম! বিলম্ব না করে ওখান থেকে আবার গেলাম বাঁশগাঁও। ওখানে একটি মসজিদে গিয়ে আশ্রয় নিলাম।

এরপর বাড়ির দিকে রওনা হলাম। বাড়ির কাছে যখন আসি তখন বিকেল প্রায় সাড়ে ৩টা। বাড়ির সামনে দেখলাম একটা লাশ। কাছে গিয়ে দেখি লাশটি আবদুল লতিফ চৌধুরী রাজা মিয়া সাহেবের। উনি খুবই পরহেজগার ও সম্ভ্রান্ত মানুষ। উনি এলোমেলো হয়ে পড়ে আছেন। পামসুগুলো পরা। বাতাসে উনার দাড়িগুলো উড়ছে। তবজিটা আলখাল্লার বাইরে পড়ে আছে। উনার পিঠ দিয়ে গুলি লেগে বুক দিয়ে বের হয়েছে। এরপর একটা তিলক্ষেতের কাছাকাছি আসলাম। এক হিন্দু মহিলা তিলক্ষেত থেকে উঠে দাঁড়ালো। আমাকে বলল– ‘কেডারে বাবা, আমারে একটু ধইরা নিবি? আমারে একটু বাঁচা।’ সেদিকে আমার খেয়াল নাই। আমার চিন্তা ভাইবোনদের নিয়ে। তাদের কোনো হদিস নাই। এমন সময় দেখি আখড়াবাড়ির ভেতর খোকা চৌধুরী ও আরেকটা লোক হন্যে হয়ে দৌড়াচ্ছেন। আমি খোকা মিয়াকে বললাম, ‘চৌধুরী সাব, আপনার সঙ্গে আমার লাস্ট একটা কথা আছে। আপনি কিন্তু আমারে খুব খারাপ চোখে দেখেন। এই যে রাজা মিয়া সাহেব আপনেগো মুরব্বি। উনার ডেড বডিটা নিয়ে তো আপনি কিছু একটা ব্যবস্থা করেন।’ এই কথা বলায় তিনি আমার সঙ্গে ফায়ার হয়ে গেলেন। আমি বুঝলাম, উনার সঙ্গে আমার জপ দেওয়ার আর কিছু নাই।

এরপর বাড়িতে আসলাম। বাড়িতে এসে দেখি বাড়ির সমস্ত জিনিস এলোমেলো হইয়া পইড়া আছে। আর্মিরা লোকজন না পেয়ে সব কিছু তছনছ করে রেখে গেছে। আমি বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলাম চকের মধ্যে। ওখানে গিয়ে দেখি বহু লাশ। একজন অপরিচিত হিন্দু মহিলা মরে পড়ে আছে। তার কোলে দুইটা বাচ্চা কানতেছে। ওদের কান্না দেইখ্যা আমি আর বরদাশত করতে পারলাম না। রাস্তার সামনে গিয়ে দেখি, আর্মিরা নাজিরচর থেকে লাইন ধরাইয়া মানুষ নিয়া আসতেছে। তাই একটু ব্যাক করলাম। দূর থেকে দেখলাম, নদীর পাড়ে লাইন ধরাইছে। ৯ মে’র এই ঘটনার পর আমি বাড়িতে থাকতে পারতাম না। আমার ওপর টার্গেট ছিল। আমাদের থানায় আর্মি ছিল। ওরা প্রায়ই আমাদের বাড়িতে আসতো।

এই যে এত বড় ঘটনা, এর মূল হোতা হলো খোকা চৌধুরী। সে-ই খবর দিয়া আর্মি আনছে। আর্মি হেড কোয়ার্টারে পর পর তিনটা চিঠি গেছে। এই চিঠিগুলো ড্রাফট করছে খোকা চৌধুরীর বড় ভাই শ্যাম চৌধুরী। সে ছিল ব্যাংকার। শিক্ষিত লোক। এই চিঠি তাকে ছাড়া আর কারো পক্ষে লেখা সম্ভব না। দুইটা চিঠিতে লেখা হইছে এখানে অনেক হিন্দু আছে। পরের চিঠিতে লেখা হইছে, এখানে মুক্তিবাহিনীর সঞ্চার হচ্ছে। তারা এলাকার একটা ড্রয়িংও পাঠাইছে। চিঠিদাতা যে শ্যাম, এটা নো ডাউট।

১৯৬৪ সালের দাঙ্গার সময় খোকা চৌধুরীর উত্থান। দাঙ্গার সময় এক রাতে খোকা মিয়া তার সহযোগীদের নিয়ে গজারিয়া গ্রামের মাখন লালের বাড়িতে ঢুকে তাকে ও তার শাশুড়িকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। মাখন লালের স্ত্রী ও দুই কন্যাকে কুপিয়ে জখম করে। মাখন লালের বাড়ি লুট করে। মাখন লাল ছিলেন স্বর্ণকার। লোকজন সোনাদানা বন্ধক রেখে তার কাছ থেকে টাকা নিত। ক্ষমতাধর জানান দিতেই খোকা মিয়া এই হত্যাকা- ঘটায়। এই ঘটনার পর হিন্দুরা তার ভয়ে গ্রাম ছাড়তে শুরু করে। এরপর তিনি মুরারীমোহন সাহা ও কিশোরীমোহন সাহার বাড়ি দখল করেন। এর আগে তিনি আগে ট্রেনে ডাকাতি করতেন। তার গ্যাং ছিলো। নিষিদ্ধ পল্লীতে যাতায়াত করতেন। সেখানে তিনি একটি বিয়েও করেন। সেই কারণে তাকে তার জ্ঞাতিগোষ্ঠীরা দেখতে পারতো না। পরে আবার গ্রামে বিয়ে করে।

চৌধুরীবাড়ির ছেলে হিসেবে আমরা আগে তাকে ভালো মনে করতাম। সেই হিসেবে আমি, মনির হোসেন ব্যাপারি, আনর আলী মুনশি ও দেলু মিয়া তার সঙ্গে মিশতাম। আমরা তখন স্কুলে পড়ি। খোকা মিয়া একদিন সেনিটারি ইন্সপেক্টর অফিসের সামনে আমাদের চারজনকে বিশ^াস করে তার পেছনের সব ঘটনা খুলে বললেন। পায়ে কিছু দাগ দেখালেন। আমি তখন আমার তিন বন্ধুকে বললাম, ওনার সঙ্গে আমাদের আর চলাফেরা করা ঠিক হবে না। উনি সামাজিক না। তারা আমার কথা শোনে নাই।

১৯৭১ সালের ৯ মে গণহত্যার পর যত ঘরবাড়ি, দোকানপাটে লুটপাট হইছে সব খোকা মিয়ার নেতৃত্বে হইছে। বনেদি ব্যবসায়ী রমেশ সাহার মাকেও খুন করছে খোকা মিয়ার লোকজন। আবদুল জলিল চৌধুরী, ছিদ্দিক, শামসু, নাসির মুনশি রাজাকার ছিল। এদের অনেকে এখন খোলস পাল্টাইছে। ওরা স্বীকার করুক আর না-ই করুক, এটাই বাস্তবতা।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ  : ৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭

আরও পড়ুন :

প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

চতুর্থ পর্ব :   নূরুল আমীন প্রধান

পঞ্চম পর্ব : সালামত জেহাদ

ষষ্ঠ পর্ব : সানোয়ারা বেগম

সপ্তম পর্ব : মনোয়ারা বেগম নার্গিস
অষ্টম পর্ব : ইসহাক মোল্লাহ
নবম পর্ব : রবিদাশী বর্মণ
০ম পর্ব : আরফাত আলী সিকদার
১১ম পর্ব : প্রল্লাদ চন্দ্র বর্মণ
২তম পর্ব : উত্তম কুমার দাশ
১৩তম পর্ব : মোতাহার হোসেন খোকন
১৪তম পর্ব : জহিরুল ইসলাম ভুঞা
১৫ তম পর্ব :  মর ফারুক আখন্দ
১৬ তম পর্ব : আবু বকর ছিদ্দিক
১৭ তম পর্ব : ফাতেমা বেগম
১৮তম পর্ব : কমলা বেগম
১৯তম পর্ব : রেজিয়া বেগম
২০তম পর্ব : নারায়ণ চন্দ্র বর্মণ
২১তম পর্ব :  হরিদাসী বর্মণ
২২তম পর্ব : জাহানারা বেগম
২৩তম পর্ব :  আবদুল হামিদ মোল্লাহ
২৪তম পর্ব : কল্পনা রানী দাশ
২৫তম পর্ব : মোসলেম উদ্দিন প্রধান
২৬তম পর্ব :  হোসেন মোল্লাহ
২৭ তম পর্ব : তানেস উদ্দিন আহমেদ

 ***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments