ঢাকা, রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮ | ১১ : ২৯ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ ২৬তম পর্ব।  জানবো : মুক্তিযোদ্ধা তানেস উদ্দিন আহমেদ, পিতা : সালামত উল্লাহ সরদার, মাতা : তালেহা বেগম, গ্রাম : ইসমানিচর,  গজারিয়া উপজেলা পরিষদের সদস্য। বয়স : ৭২ বছর।

Tanes Uddin Ahmed_Swapno71 (1)১৯৭১ সাল। সারাদেশ তখন আন্দোলনে উত্তাল। আমরা তখন আমাদের গ্রামের বাড়িতে শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে ব্যস্ত। আমাদের স্কুলঘর কিংবা বাংলাঘরে তাদের যথাসাধ্য সাহায্যের চেষ্টা করি। ২৫ মার্চের পর এলাকার যুবকরা একত্র হওয়ার চেষ্টা করি। ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সহসভাপতি শেখ আতাউর রহমান গ্রামের বাড়ি গজারিয়ায় এলেন। তার সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়। তিনি জানান, আ স ম আবদুর রব আমাদের খবর দেবেন। তার নির্দেশমতো আমরা সিদ্ধান্ত নেব।

৪ মে বিকেলে আমরা বেশকিছু যুবক গজারিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি কক্ষে একত্র হয়ে ছাত্র সমাবেশ করি। সমাবেশের মাধ্যমে আমরা একটা চেইন অব কমান্ড তৈরি করি। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ট্রেনিংয়ের জন্য কীভাবে ভারতে যাওয়া যায়।

৯ মে সকালবেলা আমি ছিলাম ঘুমে। মা আমাকে ও আমার ছোট ভাই বোরহানকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলল। ইতোমধ্যে আমাদের গ্রামের সামনের চরে হানাদার বাহিনীর সৈন্যরা এসে নেমেছে। হঠাৎ একটা গুলির শব্দ কানে এলো। চরের পাশে এক নৌকায় হরিন্দ্র ও তার ভাগিনা দীনেশ মাছ ধরছিল। সেই গুলিটি হরিন্দ্রের জীবন কেড়ে নেয় আর দীনেশের হাতে লেগে তাকে রক্তাক্ত করে।

গুলির শব্দ শুনে আমাদের গ্রামে কোনো লোক নেই। সবাই গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে পাশের নাজিরচর গ্রামে। আমি গ্রামের গোপাটে দাঁড়িয়ে আছি। গ্রামের ভেতর থেকে সব দেখা যাচ্ছে। ২০-২৫ জন আর্মি পজিশন নিচ্ছে। ১০-১৫ মিনিট পর গজারিয়ায় ফায়ার আরম্ভ হয়ে গেলো। বৃষ্টির মতো গুলি হচ্ছে। আমাদের গ্রামের মাথায় একটি কাঠের সেতু। ওই পাড়ে গজারিয়া ইউনিয়নের কলসেরকান্দি গ্রাম।

আমাদের ইসমানিচর গ্রামটি পড়েছে হোসেন্দী ইউনিয়নের মধ্যে। সেতুর পাশে একটি দোকান। সেখানে বসে বসে সব অবজারভ করছি। সবাই ভয়ে সন্ত্রস্ত। আমাদের গ্রামে আর্মি ঢুকলো না। তারা মার্চ করে এগিয়ে গেলো সামনের দিকে। তখন দুপুর ২টা হবে। দীনেশ এলো। সে হাতে গুলি খেয়েছে। আমি দীনেশের হাত ব্যান্ডেজ করে দিয়ে তাকে পাটখেতে আশ্রয় নিতে বললাম। কলসেরকান্দি গ্রামের মাথায় একটি বাগানবাড়ি ছিল। সেই বাড়ি থেকে দেখি ফুলদী গ্রাম দিয়ে পাকবাহিনী নাজিরচর গ্রামের দিকে আগাচ্ছে। ওই গ্রামে বেশ কয়েকটি গুলি হলো।

আমি দড়িকান্দি গ্রামের পাশে একটি নলখাগড়া বনে আশ্রয় নিলাম। গিয়ে দেখি শত শত নারী ও শিশু সেখানে আশ্রয় নিয়েছে। সবার চোখে-মুখে আতঙ্ক। শিশুরা কান্নাকাটি করছে। চিন্তা করলাম এখানে থাকাটা নিরাপদ না। তাই পাশের ইরিক্ষেতে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে দেখি। তারা ৪০-৪৫ জন লোককে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিয়ে আসছে। সামনেও আর্মি, পেছনেও আর্মি। সামনে সবচেয়ে লম্বা লোকটা দেখে চিনতে পারলাম। তিনি আমাদের সার্কেল অফিসার জমিলুর রহমান। ওরা কলসেরকান্দি, দড়িকাদি, কাজীপুরা হয়ে গজারিয়া থানার দিকে চলে গেলো। আমিও বাড়ি চলে গেলাম।

এর মধ্যে খবর নেওয়ার জন্য বলাকী গ্রাম থেকে আমার ফুফাতো ভাই বজলুর রহমান খান এলো। বজলুকে নিয়ে গোসাইরচরের দিকে রওনা হলাম। বাঁশগাঁও দিয়ে গোসাইরচরে গেলাম। এখন যেখানে সোনালি মার্কেট সেখানে গেলাম। তখন প্রায় বিকেল সাড়ে তিনটা। দেখি লোকজন বাঁশের সঙ্গে বেঁধে লাশ নিয়ে যাচ্ছে। গুলিবিদ্ধ আবুল হোসেনের সঙ্গে দেখা হলো। তার ব্লিডিং হচ্ছে। সে বলল, ‘মিয়াভাই, আমাকে আল্লাহ বাঁচাইছে।’

এরপর গোসাইরচর গ্রামের ভেতর ঢুকি। আখন্দবাড়িতে ঢুকে দেখি, নাইয়া মিয়াভাইয়ের (রেহান উদ্দিন আখন্দ) পায়ে আর কমলার বাবার (মোজাফ্ফর আলী আখন্দ) মুখে গুলি লেগেছে। দুজন উঠানে পড়ে আছে। এরপর ভুইয়াবাড়িতে গেলাম। ঘরের সামনে পড়ে আছে আহেদ আলী জেহাদের লাশ। মাটিতে তার মগজ পড়ে আছে। বাড়ির মহিলারা বললেন, তিনি তখন ফায়ার ব্রিগেডে চাকরি করতেন। আর্মিরা যখন আক্রমণ করতে আসে, তখন তিনি তার আইডি কার্ড দেখান।

আর্মিরা সেদিকে কর্ণপাত না করে তাকে মারতে আসেন। আহেদ আলীও ছেড়ে দেওয়ার লোক না। আর্মিদের সঙ্গে তার অনেকক্ষণ ধস্তাধস্তি হয়। পরে আর্মিরা বন্দুকের বাঁট দিয়ে তার মাথায় আঘাত করতে থাকে। এরপর যাই মোবারক মাস্টারের বাড়িতে। একটু আগে তার ছোট ছেলে মোয়াজ্জেম হোসেনের লাশ ধরাধরি করে বাড়িতে আনা হয়েছে। গোসাইরচর গ্রামের প্রতি বাড়িতেই লাশ! সবাই এত হতভম্ব যে কেউ কাঁদতে পারছে না।

এরপর আমরা গজারিয়া মিয়াবাড়িতে গেলাম। বাড়ির উঠানে একটি খাটে আবদুল লতিফ চৌধুরীর লাশ। ভেতরে তার ছেলে মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী গুলিবিদ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছে। বিকেল হয়ে আসে। আমি আর বজলু কাজীপুরা দিয়ে আমাদের বাড়ির দিকে যেতে থাকি। এমন সময় গজারিয়া গ্রামের ভেতর থেকে আরেকটি গুলির শব্দ শুনতে পেলাম। এটি আসলে আর্মিদের গুলি না। গ্রামে আতঙ্ক ছড়াতে রাজাকাররা এই ফাঁকা গুলি করে। শুরু হয় গ্রামজুড়ে লুটপাট।

এরপর আমি ট্রেনিংয়ের জন্য ভারতে চলে যাই। ফিরে এসে বেশ কয়েকটি অপারেশনে অংশগ্রহণ করি। স্বাধীনতার পরপর একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানতে পারি, গজারিয়া থানা শান্তি কমিটির আহ্বায়ক আবদুল গফুর চৌধুরী ঢাকার গোরিয়ায় আত্মগোপন করে আছে। তাকে ধরে আনার জন্য চারজন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়ে শহীদ আবদুল লতিফ চৌধুরীর গে-ারিয়ার বাসায় গিয়ে হানা দিই। ইচ্ছে ছিল তাকে ধরে এনে গজারিয়ার জনগণের কাছে সোপর্দ করব। সেখানে গিয়ে লতিফ চৌধুরীর ছোট ছেলে মোরশেদ আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে দেখা।

৯ মে অপারেশনের সময় তিনিও গুলি খেয়েছিলেন। মোরশেদ জানালেন, গফুর চৌধুরী এখানে থাকে না। খোঁজ নিয়ে জানলাম, গফুর চৌধুরী পটুয়াখালীতে পলাতক আছে। ৩৬ বছর থানা কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। অনেকের কাছে আবেদন করেছি কিন্তু কেউ তেমনভাবে এগিয়ে আসেনি। এতগুলো বছরে শহীদ পরিবারের জন্য যা করেছি বা করতে চেষ্টা করেছি, তা অতি সামান্য। যা করার কথা ছিল আমরা তা পারি নাই।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ৩০ এপ্রিল ২০১৭

আরও পড়ুন :

প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

চতুর্থ পর্ব :   নূরুল আমীন প্রধান

পঞ্চম পর্ব : সালামত জেহাদ

ষষ্ঠ পর্ব : সানোয়ারা বেগম

সপ্তম পর্ব : মনোয়ারা বেগম নার্গিস
অষ্টম পর্ব : ইসহাক মোল্লাহ
নবম পর্ব : রবিদাশী বর্মণ
০ম পর্ব : আরফাত আলী সিকদার
১১ম পর্ব : প্রল্লাদ চন্দ্র বর্মণ
২তম পর্ব : উত্তম কুমার দাশ
১৩তম পর্ব : মোতাহার হোসেন খোকন
১৪তম পর্ব : জহিরুল ইসলাম ভুঞা
১৫ তম পর্ব :  মর ফারুক আখন্দ
১৬ তম পর্ব : আবু বকর ছিদ্দিক
১৭ তম পর্ব : ফাতেমা বেগম
১৮তম পর্ব : কমলা বেগম
১৯তম পর্ব : রেজিয়া বেগম
২০তম পর্ব : নারায়ণ চন্দ্র বর্মণ
২১তম পর্ব :  হরিদাসী বর্মণ
২২তম পর্ব : জাহানারা বেগম
২৩তম পর্ব :  আবদুল হামিদ মোল্লাহ
২৪তম পর্ব : কল্পনা রানী দাশ
২৫তম পর্ব : মোসলেম উদ্দিন প্রধান
২৬তম পর্ব :  হোসেন মোল্লাহ

 ***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments