ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১১ : ১৬ মিনিট

খোকা যুদ্ধে চলে যায়
মধ্য দুপুর, গনগনে রোদের তাপ, চৌচির করা মাঠ ঘাট
এরই মাঝে বেজে চলছে যুদ্ধের দামামা
রণ হুঙ্কার শহর পেরিয়ে গ্রাম-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ে।
সতের বছরের যুবা, খোকা কিছুই বুঝতে পারে না
বাড়ির আর সকলের সাথে দুপুরের খাওয়া শেষে
বসার ঘরের এক কোণে বিছানাতে অস্বস্তিকর গরমে
ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দেয়। হঠাত কিছু মানুষের গুঞ্জরন। জানালা গলিয়ে উঁকি দিতেই চমকে উঠে খোকা।
বাড়ির উঠোন পাকবাহিনীর কালচে সবুজ রঙের হেলম্যাটে ছেয়ে আছে।
কিছু বুঝে উঠার আগেই বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে বের  হয়ে পোষা ছাগলের মুখটি চেপে ধরে  কাঁধে তুলে নেয়।
বাগানের  ভেতর দিয়ে ঝোপ জঙ্গল পেরিয়ে ছুটতে থাকে খোকা।
বেশ কিছুদূর যেতেই পাটক্ষেতে দেখে, বোন কুহিনূর
থরথর করে কাঁপছে। বললো, পাকবাহিনীরা আমাদের বাড়িতে
হামলা করেছে। খোকাও ভয়ে কাঁপছে। বাবা মা কোথায়?
একটু মাথা উঁচু করে দেখার চেষ্টা করলো চারদিক, কোথাও
কেউ নেই।  ঠিক তখনই এক বিকট শব্দ। তারপরেই দাউদাউ আগুন।
পাকবাহিনীরা আগুন ধরিয়ে দেয় সারা বাড়িতে।
দূর থেকে খোকা আর কূহিনূর দেখে, শত বছরের পুরনো বাড়ি আগুনে পূড়তে থাকে।
সারা রাত পাটক্ষেতে কাটিয়ে দিয়ে
সূর্য উঠার আগেই বুবুর হাতে পোষা ছাগলটা দিয়ে
খোকা চলে যায়, খোকা চলে যায়, খোকা চলে যায়….
খোকা যুদ্ধে চলে যায়…
ভাতের তৃষ্ণা 
বিজয় উল্লাস চারদিকে
তোপধ্বনি আর জয়ধ্বনিতে প্রকম্পিত
বাংলার আকাশ বাতাস।
খোকা ফিরে আসে যুদ্ধের ময়দান থেকে,
চোখে  বিজয়াশ্রু।
পায়ে  হেঁটেহেঁটে গ্রামের পর গ্রাম
ছুটছে তো,    ছুটছে খোকা…
কখন মায়ের হাতের গরম ভাত খাবে
এই ভেবে ভেবে অস্থির ছুটছে খোকা!
ভাতের তৃষ্ণা যে কত মারাত্মক!
খোকা টের পাচ্ছে তার সমস্ত অস্থিমজ্জা দিয়ে।
পথিমধ্যে গ্রামের এক মা’কে দেখে লাকড়ি ঠেলে দিচ্ছে উনুনে
আর অনবরত   ফু দিয়ে যাচ্ছে।
আহা! এ দৃশ্য তো খোকার মায়ের নিত্যদিনের দৃশ্য!
খোকা আর নিজেকে  ঠিক রাখতে না পেরে
এক দৌড়ে ছুটে যায় রান্নারত মহিলার কাছে।
হাতজোড় করে মিনতির সুরে  বলে,মা একটু ভাত দিবে?
আর কিছু না থাকলে শুধু লবন মরিচ দিয়ে দাও…
ভাতের বড় তৃষ্ণা পেয়েছে মা। আমার মাকে কবে দেখতে পাবো জানি না।
তুমিই আমার মা। আমায় একটু ভাত দিবে, মা?
এমন মিনতি ভরা আকুতি দেখে মহিলার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে।
বললো, বাবা,তুমি  মুক্তিযোদ্ধা?  খোকা শুধু মাথা নাড়ে।
খাওয়া শেষে মা’কে স্যালুট দিয়ে
জয় বাংলা ধ্বনি তুলে আবার খোকা ছুটতে থাকে।
ভাতের সে কী তৃষ্ণা খোকা আজও তা মনে করে!
ওদের জন্য কষ্ট হয়
ওদের জন্য কষ্ট হয়।
মনে হয় নিজের শরীর কোনো এক নরপশু ছিড়েছিড়ে খাচ্ছে। যন্ত্রণায় মূঢ় হয়ে আছি। আজ কোনো কথা নেই, লিখতে গেলে কোনো ভাষা নেই। কষ্টে নীল হয়ে আছি।  শুধু কী এক তনু! এমন কত  তনু আনাচ-কানাচে ভুগছে, মরছে কিম্বা মেরে ফেলছে। শুকুনের ছোবলে এ দেশ এখন রক্তাক্ত।
বাংলা এখনো একাত্তুরের বিভীষিকা বয়ে বেড়াচ্ছে। চারদিক শুধু কান্নার শব্দ। তনুদের মত আমরাও যে কাঁদি। নারীর সম্মান যে দেশে নেই, সেই দেশ কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। দেশ এগিয়ে যাওয়ার মত বুলি আওড়াই শুধু। কিন্তু নারীর সম্মান যতদিন রক্ষা না হচ্ছে, ততদিন এই দেশে কিছুই হবে না। দেশ  অন্ধকারেই তলাবে, শুধু অন্ধকারে…
একাত্তরের হাতিয়ার
দেশ নিয়ে না ভেবে কবিতা লিখে কী হবে!
আছে তোমার কবিতাঘরের দরজা খোলা!
আছে কী তার দখিনা জানালা খোলা!
এই বদ্ধ ঘরে কী কবিতা হবে!
কবিতা নয় অস্ত্র তোলো
ভাঙ্গ ঘরের কপাট
গর্জে উঠুক আবার
একাত্তরের হাতিয়ার
মুঠোবন্দী নিঃশ্বাস 
আমরা সবাই মুঠোবন্দী করে নদীপথ পাড়ি দেই।
ঝড়ঝঞ্ঝায় কেঁপে উঠি। আমাদের মুঠি আর খোলে না।
নদীপথে কে একবার বলেছিল, ‘নিরর্থক কিছু বয়ে নিয়ে যাচ্ছো।ইচ্ছে হলে জলেই হাত ঝেড়ে ফেলতে পারো।’ আমরা আসলে কোনো কিছুই বয়ে নিয়ে যাই না। শুধু মুঠোবন্ধী করে নিঃশ্বাসটুকু নিতে পারি। বুকের নিঃশ্বাসটুকু মুঠোয় এসে কিভাবে যে বন্দি হলো, আজো তা জানি না। নদীপথ পার হয়ে দিগন্তে পা রাখতেই একঝাঁক  শূন্যতা এসে ভর করে। আমাদের মুঠি আর খোলে না। শঙ্কা এসে জড়তাকে আগলে ধরে। আমরা শুধু নিজের মধ্যে বাঁচতে শিখেছি, মানুষের মাঝে আর নেই। আমাদের মুঠোবন্দী জীবনে অজস্র শীতের আনাগোনা,
বসন্ত আর আসে না।

Untitled-2 copyআঞ্জুমান রোজী : কবি। তাঁর বাবা : আব্দুল মতিন প্রধান; মা : মরহুমা শাহান আরা বেগম। বর্তমানে কানাডা প্রবাসী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর তিনটি কবিতার বই এবং একটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। কবিতা : ‘এক হাজার এক রাত’, ‘বৃষ্টির অন্ধকার’, ‘নৈঃশব্দ্যের দুয়ারে দাঁড়িয়ে’ এবং গল্পের বই : ‘ মূর্ত মরণ মায়া’।  

Comments

comments