ঢাকা, রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | ১২ : ৪০ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ ২৬তম পর্ব।  জানবো :  হোসেন মোল্লাহ, পিতা : আবদুল হক মোল্লাহ, মাতা : ফাতেমা বেগম, গ্রাম : নয়ানগর, পদবি : অবসরপ্রাপ্ত ডাকপিয়ন, বয়স : ৬৩ বছর।

26. Hossain Molla copyঘটনার দিন ভোরে আমি আর আমার মামা আবদুর রউফ মোল্লাহ কোলার জমিতে ডাটা উঠাইতেছিলাম। এমন সময় দুটি গুলির শব্দ হইল। মামাকে কইলাম, ঘটনাটা কী? মামা আর আমি সামনে আগাইয়া দেখি আমাগো গেরামের দিকে একটি লঞ্চ আসতেছে। বাড়িতে গিয়া কইলাম, তোমরা সবাই পালাও, আর্মি আইতাসে। মামা কইলো, যার যার জীবন নিয়া পালাও। বাড়ির সবাইকে একটা জংলায় লুকিয়ে রাখলাম। আমার তখন ১৪-১৫ বছর বয়স। আমি ঘরের কাঁড়ে উইঠ্যা লুকায়ে আছি। আর্মিরা এসে দেখে ঘরের দরজা জানালা সব খোলা। ঘরে ঢুকে আর্মিরা বলে, ‘এদার কোনো আদমি নেহি হ্যায়।’ এই বলে তারা চলে গেলো। এরপর আমি কাঁড় থেকে নাইমা ছালার মধ্যে শরীর ঢুকিয়ে গইরাইতে গইরাইতে মুরগির খোঁয়াড়ের ভেতরে গেলাম। এর মধ্যে আর্মিরা আরও দুইজনকে ধরে কয়, ‘তোমরা মুসলমান হ্যায়? দরজা খোলকে রাখো। কোনো ডর নেহি হ্যায়।’ ওরা দরজা খুইলা বইসা রইছে। খোঁয়াড়ের ভেতর দুর্গন্ধ, থাকা যাচ্ছে না। আমি ভাবলাম, আমারেও বুঝি আর কিছু কইবো না। তাই আমিও ঘরের ভেতরে গিয়া বইসা রইলাম। আমারে দেইখ্যা আর্মিরা আমার কাছে আসলো। বললো, ‘তুম কি মুসলমান হ্যায়?’ আমি বললাম, জি। বলে, ‘কাপড় উৎরাও।’ আমারে লেংটা চোংটা করে দেখলো। পরে আমাকে বললো, আমাদের সঙ্গে থাক।
কয়েকজন আর্মি আমাগো মসজিদের ইমাম সাহেবকে চক থেকে লাইতাইথে লাইতাইথে মসজিদের বগলে নিয়া আসতাছে। আইন্যা কয়, এই শালায় মালোয়ান। আমি কই, ‘না স্যার, হেয় তো মসজিদকা ইমাম হ্যায়।’ তারা কয়, ‘কোন মসজিদকা ইমাম হ্যায়?’ আমি কই, ‘এই মসজিদকা ইমাম হ্যায়।’ পরে উনারে ছাইড়া দিলো। এরপর আমারে লইয়া সামনের দিকে আগাইলো। সামনে আবদুল নামে একজনরে গুলি করলো। সে পানিতে পইড়া গেলো। পরে সে বাঁচছে। এরপর বাচ্চুকে গুলি করলো। বাচ্চু পাটক্ষেতে গিয়া মারা গেলো। একটা ঘরে ২৫-৩০ জন লোক ছিল। ওখানে গুলি করছে। কিন্তু ঘরের ভেতর থেইকা লোকজন কোনো শব্দ করে নাই। যদি শব্দ করতো, তাইলে সবাইকে মাইরালাইতো। আমি কই, ‘এই ঘরমে কোনো লোক নেহি হায়।’ ওরা আমার কথা শুনলো। কিন্তু আমার মনে ভয় ঢুইকা গেলো। ভাবলাম, মানুষ মারতে মারতে লোকজন পাগল হইয়া যায়। তাই আমি পালাইলাম। এর মধ্যে দেখি, আমাগো গেরামের হাবিব মোল্লাহ দুই হাতে দুই ইট লইয়া দাঁড়ায় আছে। আমি কই, ‘ইট দিয়া কী করবেন?’ কয়, ‘ওরা আইলে মারমু।’ আমি কই, ‘ইট দিয়া মারতে পারবেন? ইট ফালান।’ পরে উনি ইট ফালায়ে দিলো।
আর্মিদের আরেকটা গ্রুপের কাছে আমি আবার ধরা পড়লাম। এর মধ্যে আগে যেই গ্রুপটার সঙ্গে ছিলাম, তারাও চইলা আসলো। তাই বাঁইচা গেলাম। পরে মেলিটারিরা মিয়াবাড়ীর দিকে গেলো। রহমানকে ধরলো। রহমান তাদের সঙ্গে পাছরাপাছরি শুরু করলো। পরে তাকে গুলি করলো। বালুচরের হালিমকেও একই কায়দায় মারলো। এরপর কয়েকটা গুলির শব্দ পাইলাম। ওরা চলে গেলো গোসাইরচরের দিকে। পানিতে মামার লাশ পাইলাম। পাশেই পড়ে আছে ইয়াকুব মোল্লাহর লাশ। তার ছেলে ইসহাক গুলিবিদ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছে। তার নাড়িভুঁড়ি বের হইয়া গেছে।
বাড়িতে কোনো লোক নাই। আমি আর নানি চঙ্গ দিয়া মামার লাশ বাড়িতে নিয়া আসি। গোসল করাইয়া জানাজা দিবো এমন সময় খবর আইলো, আর্মিরা আবার আইতাছে। সবাই মুর্দা রেখে পালাইয়া গেলো। পরে নিজেরাই গর্ত কইরা কবর দিলাম। কিছুক্ষণ পর গজারিয়া গ্রামের দিকে তাকাইয়া দেখি, আর্মিরা অনেক লোককে নদীর পাড়ে দাঁড় করাইয়া রাখছে। খানিক পর পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল আমাগো গেরামের আবদুল কাদের। এসে বললো, ‘খবর পাইয়া ঢাকা থেইকা একজন অফিসার আইছে। সে আইসা বাধা দিছে। তাই কাউরে মারে নাই।’

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ২১ এপ্রিল ২০১৭

আরও পড়ুন :

প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

চতুর্থ পর্ব :   নূরুল আমীন প্রধান

পঞ্চম পর্ব : সালামত জেহাদ

ষষ্ঠ পর্ব : সানোয়ারা বেগম

সপ্তম পর্ব : মনোয়ারা বেগম নার্গিস
অষ্টম পর্ব : ইসহাক মোল্লাহ
নবম পর্ব : রবিদাশী বর্মণ
০ম পর্ব : আরফাত আলী সিকদার
১১ম পর্ব : প্রল্লাদ চন্দ্র বর্মণ
২তম পর্ব : উত্তম কুমার দাশ
১৩তম পর্ব : মোতাহার হোসেন খোকন
১৪তম পর্ব : জহিরুল ইসলাম ভুঞা
১৫ তম পর্ব :  মর ফারুক আখন্দ
১৬ তম পর্ব : আবু বকর ছিদ্দিক
১৭ তম পর্ব : ফাতেমা বেগম
১৮তম পর্ব : কমলা বেগম
১৯তম পর্ব : রেজিয়া বেগম
২০তম পর্ব : নারায়ণ চন্দ্র বর্মণ
২১তম পর্ব :  হরিদাসী বর্মণ
২২তম পর্ব : জাহানারা বেগম
২৩তম পর্ব :  আবদুল হামিদ মোল্লাহ
২৪তম পর্ব : কল্পনা রানী দাশ
২৫তম পর্ব : মোসলেম উদ্দিন প্রধান

 ***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments