ঢাকা, সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮ | ১১ : ৩৯ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ ২৪তম পর্ব।  জানবো : মোসলেম উদ্দিন প্রধান,মুক্তিযোদ্ধা, পিতা : দেলোয়ার হোসেন প্রধান, মা : ফাতেমা বেগম, গ্রাম : গোসাইরচর, বয়স : ৭০ বছর।

Muslem Uddin Prodhanচারদিক ঘিরে ফেলছে গোসাইরচর গ্রামটা। আমাদের মসজিদের টিনে এসে গুলি লাগল। আমার এক চাচা তৈয়ব আলী মাস্টার বলে, ‘তোমরা পালাও।’ আমার দুই ছোট বোন লুৎফন নেসা ও মিনু আরা আর ছোট ভাই মহিউদ্দিনকে নিয়ে প্রধানেরচরের কাছে একটা পাটখেতে গিয়ে আশ্রয় নিই। সারাদিন খাওয়া দাওয়া নেই।

সন্ধ্যায় বাড়ি এসে দেখি আমার দুই জ্যাঠার লাশ। আমার এই দুই জ্যাঠা বাড়িতেই ছিলেন। তারা চোখে কম দেখতে পেতেন। মেলিটারি বাড়িতে ঢুকেছে বুঝতে পেরে আনসব আলী জ্যাঠা বললেন, ‘বাবারা আমি তো চোখে দেখি না, আপনারা বসেন। এখানে কোনো হিন্দু নাই। আমরা সবাই মুসলমান।’ তারা জ্যাঠাকে উঠানে এনে গুলি করে। জ্যাঠা সঙ্গে সঙ্গে মারা যান। মোনসব আলী জ্যাঠা ঘর থেকে বের হয়ে চিৎকার দিতেই তাকেও হত্যা করে।

হানাদার বাহিনী আমার নানা তাইজ উদ্দিন সরকারকে (আমার ছোট চাচা সাহেব আলী প্রধানের শ্বশুর) হত্যা করেন।

পরদিন ভোরবেলা থেকে গ্রামের যুবকরা মিলে লাশ খুঁজতে শুরু করি। এখানে বেওয়ারিশ লাশই বেশি ছিল। যারা আমাদের এখানে আশ্রয় নিয়েছিল, তারা এই এলাকার রাস্তাঘাট তেমন চিনতো না। তাই এই লোকগুলো বেশি মারা গেছে। আম কুড়ানোর মতো আমরা লাশ কুড়িয়ে একেক গর্তে পাঁচ-সাতজন করে মাটিচাপা দিই। আমার দুই জ্যাঠা ও এক ফুফাতো ভাইকে (আবদুস সাত্তার রাড়ী) আমাদের পারিবারিক কবরস্থানের একটি গর্তে কবর দিই। এরপর ঠাকুরবাড়ির কবরস্থানে একটি গর্ত করে আফতাব উদ্দিন ঠাকুর, গিয়াস উদ্দিন ঠাকুর, আউয়াল ঠাকুর, মতিন ঠাকুর, কেরামত আলী ঠাকুর, লুৎফর রহমান ঠাকুর ও আনর আলী সিকদারকে কবর দিই।

এ ঘটনার পর মনে ভীষণ দাগ কাটে। যুদ্ধের আগে আনসার বাহিনীতে চাকরি করতাম। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর ব্রিজে টোল আদায়ের দায়িত্বে ছিলাম। অস্ত্র সম্পর্কে সামান্য জানাশোনা ছিল। ভাবলাম, দেশটা স্বাধীন করার জন্য প্রতিরোধের দরকার।

তাই প্রশিক্ষণের জন্য সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে গেলাম ভারতের মুকুলনগরে। বিএফ ট্রেনিংয়ের পর মেলাঘর থেকে অস্ত্র নিয়ে আবদুল খালেক আলোর নেতৃত্বে একসঙ্গে ১৮ জন দেশে আসি। থানার পাশেই আর্মি ক্যাম্প। তাই মাঝে মাঝে দুয়েকটা গ্রেনেড ফুটিয়ে ওদের আতংকে রাখি। এরপর আবার চলে যাই ভারতের চরিলাম ক্যাম্পে। ওখান থেকে এফএফ ট্রেনিং নিয়ে ৩৮ জন মুক্তিযোদ্ধা দেশে চলে আসি।

আমরা আসলে ৯ মে’র আগেই আমাদের গ্রামে বাঁশের লাঠি দিয়ে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি ট্রেনিং শুরু করি। এর আগে ’৭০ সালে নেজামে ইসলামের নির্বাচনী প্রচারের মাইক ভেঙে দিই। তাই আমাদের গ্রামের ওপর বেশি ক্ষোভ ছিল। গজারিয়া গণহত্যায় গোসাইরচর গ্রামের মানুষ সবচেয়ে বেশি হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ২১ এপ্রিল ২০১৭

আরও পড়ুন :

প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

চতুর্থ পর্ব :   নূরুল আমীন প্রধান

পঞ্চম পর্ব : সালামত জেহাদ

ষষ্ঠ পর্ব : সানোয়ারা বেগম

সপ্তম পর্ব : মনোয়ারা বেগম নার্গিস
অষ্টম পর্ব : ইসহাক মোল্লাহ
নবম পর্ব : রবিদাশী বর্মণ
০ম পর্ব : আরফাত আলী সিকদার
১১ম পর্ব : প্রল্লাদ চন্দ্র বর্মণ
২তম পর্ব : উত্তম কুমার দাশ
১৩তম পর্ব : মোতাহার হোসেন খোকন
১৪তম পর্ব : জহিরুল ইসলাম ভুঞা
১৫ তম পর্ব :  মর ফারুক আখন্দ
১৬ তম পর্ব : আবু বকর ছিদ্দিক
১৭ তম পর্ব : ফাতেমা বেগম
১৮তম পর্ব : কমলা বেগম
১৯তম পর্ব : রেজিয়া বেগম
২০তম পর্ব : নারায়ণ চন্দ্র বর্মণ
২১তম পর্ব :  হরিদাসী বর্মণ
২২তম পর্ব : জাহানারা বেগম
২৩তম পর্ব :  আবদুল হামিদ মোল্লাহ
২৪তম পর্ব : কল্পনা রানী দাশ

 ***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments