ঢাকা, শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮ | ০৬ : ৪৫ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ ২০তম পর্ব। জানবো : নারায়ণ চন্দ্র বর্মণ, পিতা : জগদীশ চন্দ্র বর্মণ, মাতা : সারদা সুন্দরী বর্মণ, গ্রাম : নয়ানগর, পেশা : জেলে, বয়স : ৬৫ বছর।

20. Narayon Chondro Bormon copyআমাদের বাড়ির সামনে একটা খাল। জোয়ারের পানিতে খালটা কানায় কানায় পরিপূর্ণ। নৌকা দিয়া অনেক লোককে খাল পার কইরা দিলাম। এরপর আইলাম সেলাম ব্যাপারীর বাইত। এদের বাড়ির ধান সিদ্ধ করার বড় চুলার ভিতর গিয়া পালাইলাম। ওইখানে দেখলাম দুইটা বন্দুক আর অনেকগুলা গুলি। মহাদেব কাকারে কইলাম, আপনি একটা বন্দুক লন, আমি একটা লই, যা আছে কপালে। কাকা কয়, ‘বাজান, এই কাম করিস না। বাঁচতি না কিন্তু! আমার সঙ্গে চকে চল।’ কাকা আমারে লইয়া চকে গেল।

আমরা পাটখেতে পালাইলাম। পাটখেতে হাঁটু পরিমাণ পানি। এর মধ্যে নিশিকান্তের বউ আইসা কইলো, ‘ভাই, ওরা আমার মুখে গুলি করছে। তোরা পালা।’ চকে গিয়া মাকে পাইলাম। মাদব কাকা ও কাকি মার লগে। মা একটা সুইটকেস নিয়া বের হইছে। আমরা সামনের দিকে আগাইয়া একটা জায়গায় আশ্রয় লইলাম। আমরা বেশ কয়েকজন লুকিয়ে আছি। দশ মিনিট পর দেখলাম পাঞ্জাবিরা আসতেছে। এমনভাবে লাইন ধইরা আসতেছে যে, কারো পক্ষে পালাইয়া থাকা সম্ভব না। ওদের দেখে দাঁড়ায়ে গেলাম। ওরা পুুরুষদের একসঙ্গে করল। নারী ও শিশুদের গুলি করল না। আমাগো লাইন কইরা দাঁড় করাইল। মা কাঁদতেছে। মারে কইলাম, ‘কাইন্দা লাভ নাই। একটু পরে আমাগো মাইরালাইব। ওগো মতিগতি ঠিক নাই। তোমরা পালাও।’

কইতে কইতে গুলি শুরু হইয়া গেলো। গোসাইরচরের একজনরে লাথি দিয়া কয়, চোখ বন্ধ কর। তারপর গুলি করে দিলো। লোকটা ধাফাইতে শুরু করল। এরপর গুলি করল বালুচরের নুরুল আমীনকে। মহাদেব কাকারে গুলি করার সঙ্গে সঙ্গে উনি পইড়া গেলেন। মাধব কাকারে গুলি করার পর কাকা দাপাদাপি শুরু করল। আমারে ভগবানে বাঁচাইছে। আমারে গুলি করার আগেই আমি পানিতে ঝাঁপ দিয়া পড়লাম।

আমারে আবার গুলি করল। সেই গুলি গিয়া লাগল মহাদেব কাকার গায়ে। মহাদেব কাকার রক্তে আমার সারা শরীর ভরে গেল। আমার পায়ের তালুতে ওরা বুট দিয়ে ডলা দেয়। দেখলো, মরছি কি না! কোনো সাড়াশব্দ করলাম না। এরপর বাঁশির শব্দের পর শুনতে পেলাম, ‘আগারছে বাড়ো।’ দুই ঘণ্টা লাশগুলোর সঙ্গে শুইয়া রইলাম। মা, সুইটকেস থেকে একটা শাড়ি বের করে বলল, ‘বাঁচতে চাইলে এটা পর।’ শাড়ি পরলাম, ঘোমটা দিলাম, নারী সাজলাম। সন্ধ্যা ৬টার দিকে মাধব কাকারে লইয়া গেলাম রসুলপুর হাসপাতালে। ১০ দিন পর বাড়ি আসলাম। মা আর ছোট বোন মঙ্গলীকে নিয়া আবার গেলাম রসুলপুরে। সেখান থেকে রামচন্দ্রপুর দিয়া ভারতে চলে গেলাম। ভারতে যেতে আমাগো ১৮ দিন সময় লাগলো। হাপানিয়া ক্যাম্পে রইলাম। কয়েক মাস পর দেশে আসার সিদ্ধান্ত নিলাম। আখাউড়া আসতেই শুনি দেশ স্বাধীন।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ২৭ জুন ২০১৭

প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

চতুর্থ পর্ব :   নূরুল আমীন প্রধান

পঞ্চম পর্ব : সালামত জেহাদ

ষষ্ঠ পর্ব : সানোয়ারা বেগম

সপ্তম পর্ব : মনোয়ারা বেগম নার্গিস
অষ্টম পর্ব : ইসহাক মোল্লাহ
নবম পর্ব : রবিদাশী বর্মণ
০ম পর্ব : আরফাত আলী সিকদার
১১ম পর্ব : প্রল্লাদ চন্দ্র বর্মণ
২তম পর্ব : উত্তম কুমার দাশ
১৩তম পর্ব : মোতাহার হোসেন খোকন
১৪তম পর্ব : জহিরুল ইসলাম ভুঞা
১৫ তম পর্ব :  মর ফারুক আখন্দ
১৬ তম পর্ব : আবু বকর ছিদ্দিক
১৭ তম পর্ব : ফাতেমা বেগম
১৮তম পর্ব : কমলা বেগম
১৯তম পর্ব : রেজিয়া বেগম

 ***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments