ঢাকা, সোমবার, ১৮ জুন ২০১৮ | ১১ : ০২ মিনিট

fatherফাদার মারিনো রিগন ২০ অক্টোবর বাংলাদেশ সময় রাত নটায় ইতালির ভিচেঞ্চয়ায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তাঁর ভাগ্নি মারতা আলেসান্দ্রো জানিন জানিয়েছেন। মারিনো রিগন ইতালির ভিচেঞ্চায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিলেন।

ফাদার মারিনো রিগনের জন্ম ১৯২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ইতালির ভেনিসের অদূরে ভিল্লাভেরলা গ্রামে। ১৯৫৩ সালে বাংলাদেশে মারিনো রিগনের আগমন। মানব সেবার সুবাদে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে অবশেষে স্থায়ী নিবাস গড়ে তুলেছিলেন সুন্দরবন সংলগ্ন মোংলার শেলাবুনিয়া গ্রামে।

ফাদার রিগন জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার প্রিয় মানুষ। রিগনের সামগ্রিক কর্ম প্রবাহের মধ্যে চিরন্তর মানবতাবাদী চরিত্রটি ফুটে উঠেছে বারবার। রবীন্দ্রনাথ ও লালনের জীবনদর্শনে প্রাণিত ফাদার রিগন। অকপটে তিনি বলতেন, “রবীন্দ্রনাথ আমার মাথায় আর লালন আমার অন্তরে।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গীতাঞ্জলিসহ ৪০টি কাব্য, লালন সাঁইয়ের ৩৫০টি গান, জসীমউদদীনের নকশীকাঁথার মাঠ, সোজন বাদিয়ার ঘাট ছাড়াও এ দেশের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের অসংখ্য কবিতা তিনি ইতালিয়ান ভাষায় অনুবাদ করেছেন।

ফাদার রিগন প্রথম ইতালীয় অনুবাদক, যিনি গীতাঞ্জলি সরাসরি বাংলা থেকে ইতালীয় ভাষায় অনুবাদ করেন। ইতালিয়ান ভাষায় গীতাঞ্জলি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৬৪ সালে।
১৯৯০ সালে তাঁর ভাইবোন ও স্বজনদের উদ্যোগে ইতালিতে প্রতিষ্ঠিত হয় রবীন্দ্র অধ্যয়ন কেন্দ্র। রবীন্দ্রচর্চা, অধ্যয়ন, প্রচার ও প্রকাশের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের চিন্তাচেতনার দিকগুলো তুলে ধরার মধ্য দিয়ে বিশ্বভ্রাতৃত্ব ও শান্তি প্রতিষ্ঠার অমর বাণী প্রকাশ করাই সংগঠনটির মূল মন্ত্র। রবীন্দ্র কেন্দ্রের তৎপরতায় রবীন্দ্রনাথের নামে ইতালির ভিল্লাভেরলায় একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ভিয়া আর তাগোরে। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে এই সংস্থা আড়ম্বরপূর্ণ ভাবে পালন করে রবীন্দ্র উৎসব। রবীন্দ্র কেন্দ্রের আয়োজনে ফাদার রিগন কর্তৃক পরিচালিত শেলাবুনিয়া সেলাইকেন্দ্রের নকশিকাঁথার চারটি প্রদর্শনী হয় ইতালির বিভিন্ন শহরে। বাংলার ঐতিহ্যময় এই শিল্পকর্মটি ইতালিতে প্রশংসিতত হয়।

ফাদার রিগনের কর্ম পরিধির বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে শিক্ষামূলক কার্যক্রম। তাঁর হাত দিয়েই মংলার স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেন্ট পল্স উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালে। ফাদার রিগনের প্রত্যক্ষ ভূমিকায় দেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়া হাজার হাজার সুবিধা বঞ্চিত ছেলেমেয়ের স্পন্সরশিপের মাধ্যমে নিরবচ্ছিন্ন পড়াশোনা করার সুযোগ করে দেন তিনি।

ফাদার রিগন মনে করেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মরণীয় ঘটনা। মুক্তিযোদ্ধাদের পুরোটা সময় তিনি এ দেশে কাটান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে। তিনিও মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখেন আর দশজন দেশপ্রেমিক বাঙালির মতো। যুদ্ধপীড়িতদের আশ্রয় দিয়েছিলেন নিজের কাছে। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসাসেবায় এগিয়ে আসেন তিনি। উল্লেখ্য, হেমায়েত বাহিনীর প্রধান হেমায়েত উদ্দীন বীর বিক্রম (পাঁচ হাজার ৫৫৮ জন মুক্তিযোদ্ধার নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি), যার মুখমণ্ডল গুলিবিদ্ধ হয়ে ১১টি দাঁত এবং চোয়ালের একটা অংশ খসে যায়। তিনি যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সুস্থ করে তোলেন।

ফাদার রিগন কেবল বাংলা সাহিত্য নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক দলের নেতৃত্ব দিয়ে এ দেশের সংস্কৃতিকে ইতালির মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন বহুবার। তাঁর নেতৃত্বে যাওয়া নকশীকাঁথার মাঠ অবলম্বনে নৃত্যনাট্যের দল ইতালির সুধীজনের নজর কাড়ে। ১৯৮৬ সালে ফাদার রিগনের সহযোগিতায় আন্তর্জাতিক সংগীত প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় বাংলাদেশি শিশুশিল্পী অরিন হক। রবীন্দ্রনাথ রচিত “আমরা সবাই রাজা” গান গেয়ে অরিন অর্জন করে প্রথম হওয়ার গৌরব, যা ছিল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গৌরবময় ঘটনা। ফাদার রিগন ছিলেন সে ঘটনার নেপথ্যের মানুষ।

ফাদার রিগনের এ দেশের প্রতি রয়েছে প্রবল মমতা। বাংলার মাটিতে সমাহিত হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করার মধ্য দিয়ে তিনি প্রকাশ করেন এ দেশের প্রতি তাঁর তীব্র অনুরাগ। ২০০১ সাল। ফাদার রিগনের আকস্মিক হূদযন্ত্রে অসুস্থতা ধরা পড়ে। তাঁর উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। ইতালির আত্মীয়স্বজন জেনে যায় তাঁর অসুস্থতার খবর। তারা উন্নত চিকিৎসার জন্য ইতালিতে যাওয়ার অনুরোধ করে তাঁকে। ফাদার রিগন ভয় পেলেন এই বুঝি মারা যাবেন! “মরলে বাংলার মাটিতেই মরব!” তিনি কিছুতেই ইতালিতে যাবেন না। স্বজনদের প্রবল অনুরোধ ও আকুতি-মিনতির পর অবশেষে রাজি হলেন এই শর্তে−ইতালিতে তাঁর যদি মৃত্যু হয়, তাহলে মরদেহটি বাংলাদেশে পাঠাতে হবে। ইতালির স্বজনেরা মেনে নেন তাঁর জুড়ে দেওয়া শর্ত। অতঃপর তিনি উন্নত চিকিৎসায় ইতালি যান। সেখানেও অস্ত্রোপচারের আগে স্বজনদের কাছে তাঁর শেষ মিনতি ছিল, “আমার মৃত্যু হলে লাশটি বাংলাদেশে পাঠাবে।” এই হলো বাংলাদেশের প্রতি তাঁর ভালোবাসার বাস্তবিক এক রূপকথা।
সম্প্রতি ফাদার রিগনকে এ দেশে তাঁর শিক্ষামূলক ও সৃজনশীল কর্মকান্ডে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের সম্মানসুচক নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়েছে।
ফাদার মারিনো রিগনের প্রকাশিত বই : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর :  কড়ি ও কমল , সোনার তরী,  চিত্রা, চৈতালী, কণিকা, কথা , কাহিনী, কল্পনা , নৈবেদ্য ,স্মরণ, শিশু, গীতাঞ্জলি, বলাকা, লেখনী, মহুয়া, শ্যামলী, নবজাতক, রোগশয্যা, আরোগ্য,  জন্মদিন, স্ফুলিঙ্গ, শান্তিনিকেতন উপদেশমালা (১ম খন্ড) , শান্তি নিকেতন উপদেশমালা (২য় খণ্ড), শান্তিনিকেতন উপদেশমালা (৩য় খন্ড) , চিত্রাঙ্গদা। জসীমউদদীন : নকশী কাঁথার মাঠ , নির্বাচিত কবিতা, সোজন বাদিয়ার ঘাট,  শরৎচন্দ্র : চন্দ্রনাথ, পণ্ডিত মশায়, বাংলাদেশের নির্বাচিত কবিতা ও লালনের ৩৫০টি গান বই।

রবিশঙ্কর মৈত্রী : কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মী (প্যারিস থেকে)

Comments

comments