ঢাকা, শনিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৮ | ০৭ : ২২ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান আজ ১৭তম পর্ব। জানবো : ফাতেমা বেগম, পিতা : ইসমাইল সিকদার (শহীদ), মাতা : জোবেদা বেগম, স্বামী : মজনু মিয়া, গ্রাম : গোসাইরচর, পেশা : গৃহিণী, বয়স : ৫৮ বছর।

Fatema-Begum_swapno71সকাল ছয়টার সময় গুল্লির আওয়াজ হইতাছে। মানুষ দৌড়াদৌড়ি কইরা যাইতাছে । আমার আব্বায় মসজিদ থেইকা নামাজ পইড়া বাড়িতে আইছে। আমি গেলাম মসজিদে আরবি পড়তে। হুজুর (আরব আলী কারি) আমাগো ছুটি দিয়া গেরামের বাড়ি বাঁশগাঁও যাইতে লইছে। মাঝপথে আর্মিরা তাকে গুল্লি কইরা মারে। এই কথা শুইন্যা আমি চিক্কুর দিয়া কইলাম, ‘আব্বা, আর্মিরা আমাগো ওস্তাদিরে মাইরাইলাইছে। চলেন পালাই।’ আব্বায় আমারে কয়, ‘মা, আমারে একটা টিক্কা আঙ্গায়ে দেও।’ আমি টিক্কা ধরাইয়া দিলাম। আব্বা ওক্কার নইছা টাইনা তামাকটা খাইলো। এর মধ্যে আমাগো এক তালুই মোজাফ্ফর রাড়ী এসে কইলো, ‘গেরামে হানাদার বাহিনী আইছে, যারে পায়, তারেই গুল্লি করে। সবাই পালান।’ আব্বায় নড়ে না, স্থির ঘরে বইসা রইছে। আব্বা কয়, ‘আমি গেরামের মাদবর মানুষ, আমারে কেউ মারতো না।’ আব্বা আমারে লইয়া মনু মিয়া আখন্দের বাড়িতে গেলো। আব্বা কয়, ‘মনু মিয়া, এখন কী করা?’ মনু মিয়া চাচা কয়, ‘কিছু করার নাই, পালান।’

আমার মায় গেছে কই, ভাইয়েরা গেছে কই খবর নাই। আমিই কেবল আব্বার লগে। আমার ভাইপোলা হারুন ও বইনপোলা আনোয়ার উঠানে গইড়াইয়া কানতেছে। হেগো থুইয়াই সবাই পালাইছে। এমন সময় খবর শুনলাম, আর্মিরা আমার বড় ভাই আবুল কালামকে মাইরালাইছে। তখন আব্বা বড় কইরা একটা চিক্কুর দিছে। এর মধ্যে লাল মিয়া ডাক্তারের বউ (মরিয়ম বিবি) আইলো আমাগো বাড়িতে। উনি সম্পর্কে আমার খালা হয়। তারে দেইখা হঠাৎ আব্বার মনে কামড় খাইলো। আব্বা মরি খালার হাত ধইরা নিঃশ্বাস ফালাইয়া কইলো, ‘আমার ছোট মাইয়াডা! আমি যদি মইরা যাই, তুই সারা জীবন তার দিকে খেয়াল রাখিস বইন।’ আব্বা বাড়িতেই রইলো। আমি ভাইপোলা ও বইনপোলারে লইয়া আহসান ভাই আর মরি খালার লগে প্রধানেরচরে চইলা গেলাম। গিয়া দেখি মা পাগলের মতো ঘুরতেছে। ওখান থেইক্যা গেলাম বৈদ্যারগাঁও। তারপর করিমখাঁ ফুফুর বাড়ি। সেখান থেইক্যা তিনদিন পর বাড়িতে আইলাম। মায়ের লগে ফুফুও আইলো। আর কে কে আইলো মনে করতে পারি না। বাড়িতে আইসা কারো লাশ দেখতে পাই নাই। উঠানে রক্তগুলো চাক্কা চাক্কা হইয়া আছে। আমার এক চাচাতো ভাই কইলো, ‘এগুলো তোর বাবার রক্ত।’ হযরত আলী ভাইজু কইলো, চলে যাওয়ার লগে লগে হানাদাররা আব্বার মাথায় ও বুকে গুলি করছে। উনি টয়লেটের ভিতর খেইক্যা সব দেখছেন।

স্বামী ও ছেলেকে হারিয়ে আমার মা পাগল হইয়া গেছে। গণকবর খুঁইড়া মাথার খুলি নিয়া আইসা মোয়াজ্জেম ভাইয়ের আব্বারে কইতো ‘মিয়াভাই দেখেন, মোয়াজ্জেম, মুকবিল, আবুল কালাম ও তার বাপের মাথা লইয়া আইছি।’ আমার মা খুব কষ্ট কইরা আমারে বড় করছে। একদিন পাশের বাড়ির মনু মিয়াভাই কইলো, ‘ওরে আমাগে বাইত দিয়ালান।’ মা কইলো, ‘এইটা আমার সাদা শস্যের ধুতি (অতি আদরের)। এই ধুতি আমি কারো কাছে দিমু না। বাপ-ভাইহারা মাইয়া, মাইনষে ওরে ওকুম দিব, ও কষ্ট পাইবো, এইটা আমি সহ্য করতে পারমু না। দরকার হয় ভিক্ষা করমু তবু ওরে কারো বাসায় কাম করতে দিমু না।’

আমি সবার ছোট হিসাবে কালাম ভাই আমারে সবচেয়ে বেশি আদর করতো। একটু মোটা ছিলাম বলে আমারে কইতো শ্যামদাসী। আমি তার বড় আদরের বইন ছিলাম। সে ছিল আমার চার বছরের বড়, জোড়ার ভাই। কালাম ভাই তখন নাইনে পড়তো। আমাগো প্রাইমারি স্কুলে মুক্তিযুদ্ধের টেনিং নিত। আমিও তার লগে গিয়া লেফ রাইট করতাম। এখন আর কী কমু! এই ঘটনা কইতে গেলে বুকে টেউ ওঠে। আপনারা বছরে একবার আইয়েন আর কান্দাইয়া থুইয়া যান। এতদিন ছিলাম সব ভুইল্যা। এখন ঘুমের ঘোরে আগুন দিলেন জ্বালাইয়া। এখন চোখে আর পানি নাই। এখন সব ভাসাইয়া দিছি দুঃখের সাগরে। সারা জীবন কেউ বাঁইচা থাকে না, এটা সত্য। কিন্তু মন তো সয় না। আমি বাপ-ভাইহারা এক হতভাগী, সব হারাইয়া পথে পথে ঘুরি, কেউ আমার খবর নেয় না।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ২৪ জানুয়ারি ২০১৭

প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

চতুর্থ পর্ব :   নূরুল আমীন প্রধান

পঞ্চম পর্ব : সালামত জেহাদ

ষষ্ঠ পর্ব : সানোয়ারা বেগম

সপ্তম পর্ব : মনোয়ারা বেগম নার্গিস
অষ্টম পর্ব : ইসহাক মোল্লাহ
নবম পর্ব : রবিদাশী বর্মণ
০ম পর্ব : আরফাত আলী সিকদার
১১ম পর্ব : প্রল্লাদ চন্দ্র বর্মণ
২তম পর্ব : উত্তম কুমার দাশ
১৩তম পর্ব : মোতাহার হোসেন খোকন
১৪তম পর্ব : জহিরুল ইসলাম ভুঞা
১৫ তম পর্ব :  মর ফারুক আখন্দ
১৬ তম পর্ব : আবু বকর ছিদ্দিক

***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments