ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ মে ২০১৮ | ০৯ : ০০ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ ১৩তম পর্ব। জানবো : মোতাহার হোসেন খোকন, পিতা : আনসার আলী মাস্টার, মাতা : জমিলা খাতুন, গ্রাম : গোসাইরচর, পেশা : গৃহায়ন অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী, বয়স : ৬১ বছর।

মোতাহার হোসেন খোকন। ছবি : লেখক

মোতাহার হোসেন খোকন। ছবি : লেখক

আমার আব্বা ঢাকায় গৃহনির্মাণ পরিদপ্তরে চাকরি করতেন। ৮ মে সকালে আব্বা তার এক সহকর্মী আবদুল হাকিমকে নিয়ে বাড়ি আসেন। ৯ মে সকালে আক্রমণ শুরু হয়। ভোর ৫টায় আব্বা আমাদের সবাইকে টেনে তুললেন। মাকে বললেন, খোকার মা, তুমি সবাইকে নিয়ে পালিয়ে যাও। আমি, আম্মা, ছোট ভাইবোন স্বপন, রিপন ও জাহানারাকে নিয়ে প্রধানেরচরের কাছে একটি বিলে চলে গেলাম। আব্বা তার সহকর্মীকে নিয়ে বাড়িতেই রইলেন। আব্বার ধারণা ছিল, তিনি সরকারি চাকরিজীবী, পরিচয় দিলে হয়তো তাকে মারবে না। হঠাৎ আম্মার কী যেন মনো হলো! বললো, খোকা, তুমি তোমার আব্বাকে নিয়ে আসো। আমি বাড়ির দিকে রওনা হলাম। ইতোমধ্যে মেলিটারিরা সড়কের ওপর উঠে গেছে। চারদিকে গুলি হচ্ছে। গুলির শব্দে কান বন্ধ হয়ে আসছে।

আমাদের গ্রাম বরাবর একটা ছোট ব্রিজ। তার নিচ দিয়ে বয়ে গেছে একচিলতে খাল। সেই খাল সাঁতরে বাড়িতে এলাম। আমাদের বাড়িতে প্রায় ৭০ জন লোক। আব্বা, দাদা, চাচাতো ভাই সবাই আছেন। গুলির শব্দে আব্বার শরীর কিছুক্ষণ পরপর ঝাঁকি মেরে উঠছে। বুঝতে পারছি আব্বা খুব ভয় পাচ্ছেন। তবু তিনি কিছু বলছেন না। সবার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। কিছুক্ষণ পর ২০-২২ জন পাকসেনা আসলেন। ওরা যেভাবে মানুষ মেরেছে, তাতে ওদের আর পাকসেনা বলতে ইচ্ছে করে না। আমার দৃষ্টিতে ওরা হচ্ছে নাপাক সেনা। আমরা দরজা লাগিয়ে ঘরের ভেতর লুকিয়ে আছি। আমার এক দাদা মুনশি রহমত আলী হাওলাদার (আব্বার চাচা) দরজার খিলির কাছে বসে আছেন। ওরা দাদাকে বলছে, ‘তুম ঘর খুলে দাও।’ আমি দরজা খুলে দাদার পাশে দাঁড়ালাম। ওরা দাদাকে বললো, ‘তুম মে মুক্তি হ্যায়?’ দাদা বললেন, ‘নেহি।’ দাদাকে আবারও বললেন, ‘আপকা পাছ মুক্তি হ্যায়, বন্দুক হ্যায়?’ দাদা বললেন, ‘মেরা পাছ মুক্তি নেহি, বন্দুক নেহি।’

কমান্ডার জোরে ডাকলো, মুসা, খামুসা, মাহবুব, তোমরা ইধার আইয়ে, দেখো উসকা পাস কেতনা বাঙালি। কয়েকজন আর্মি দৌড়ে এলো। আর্মিরা সবাইকে উঠানে লাইন ধরে দাঁড় করালো। কমান্ডার বললো, ‘মুসা তুম ফায়ার।’ মুসা মানুষ মারতে মারতে এত ক্লান্ত যে সে অস্ত্রটা উঠাতে পারছে না। গুলি করার মতো শক্তি তার শরীরে নেই। কমান্ডার বললো, ‘খামুসা, তুম ফায়ার।’ সেও পারলো না। তারপর কমান্ডার বললো, ‘মাহবুব, তুম ফায়ার।’ মাহবুব ছিল মাঝবয়সী। মুখে কাঁচা-পাকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি। সে অস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো। আমাদের পাশের বাড়ির হায়দার আলী ভুইয়া লাইনের প্রথমে ছিলেন। সে হায়দার আলী চাচাকে প্রথমে গুলি করল। তার কোথায় গুলি লাগলো, লক্ষ করতে পারিনি। তবে দেখলাম, উনি মাটি থেকে ১২-১৪ ফুট উপরে উঠে গেছেন। এরপর আমার চাচা সিরাজুল হক হাওলাদার (পরবর্তী সময়ে শ্বশুর)-কে গুলি করলো। তার বুকের ডান দিকে গুলি লাগে। ভরা কলস থেকে যেভাবে পানি বের হয়, সিরাজ চাচার শরীর থেকে সেভাবে রক্ত বের হচ্ছে। সমগ্র উঠান রক্তে ভেসে যাচ্ছে। আমার চাচি মনোয়ারা বেগম আব্বাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ছয়টি সন্তান নিয়ে এখন আমার কী হবে?’ আব্বা বললেন, ‘আমি যদি বোন না-ও থাকি, তাহলে আমার খোকা তোমার সংসারে থাকবে।’

এবার আব্বার পালা। আমি চিৎকার দিয়ে সামনে পড়ে গেলাম। ওদের কমান্ডার বললো, ‘হোল্ড।’ আমাকে বুকে চাপা দিয়ে ধরলো। আমার মাকে উদ্দেশ করে এমন গালি দিলো, যেটা আমি বলতেও লজ্জা পাই। তারপর বললো, ‘হট যাও।’ আমি একপা দুইপা করে বাড়ির পশ্চিম দিকে পুকুরপাড়ে চলে গেলাম। কোনো শব্দ পাচ্ছি না। তাই ঘরের ভেতর গেলাম। ঘরের বেড়ার ছিদ্র দিয়ে দেখলাম, সবাই পালিয়ে যাচ্ছে। দুই চাচার লাশ মাটিতে পড়ে আছে। আমি আমার দাদিকে খুঁজছি। দাদি (তাহেরজান বিবি) ধান সিদ্ধ করার ড্রামে লুকিয়ে ছিলেন। দাদিকে বললাম, ‘আব্বা পালিয়ে গেছে। চলো আমরাও পালাই।’ এমন সময় দেখি আব্বা খিলখিল করে হাসছেন। আবার সেরু বলে চিৎকার দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর আবার হাসছেন। বাবাকে নিয়ে ঘরের ভেতর ঢুকলাম।

সাড়ে ১১টার দিকে আরেকটা দল আসে। তারা এসে আব্বাকে ও তার সহকর্মীকে নিয়ে গেলো। বাড়ির পশ্চিম দিকে একটা জঙ্গলে গিয়ে বসলাম। জঙ্গলের পাশ দিয়ে একটি সরু রাস্তা গেছে। আব্বাকে ওরা পুকুরপাড়ে নিয়ে গেলো। আব্বার সহকর্মীকে বলল, ‘তুম হিয়াপার আগ বারো।’ উনি আগে বাড়তেই পেছন দিক থেকে উনাকে গুলি করে দিলো। উনি পড়ে গেলেন। আব্বা চিৎকার করে ওদের সঙ্গে ইংরেজিতে তর্ক শুরু করে দিলেন। ওরা আব্বার বুকে একটা বেয়নেট চার্জ করে বসলো। আমার চোখের সামনে দিয়ে কালবৈশাখী ঝড়ের মতো কী যেন একটা গেলো! জ্ঞান হারিয়ে জঙ্গলেই পড়ে রইলাম। মাথায় যে গুলি করছে, সেটা দেখি নাই। তিন দিন পর্যন্ত আব্বাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শেষে আহমেদ উল্লাহ চাচা পুকুরে জাল দিয়ে খেও দিলেন। জালে আব্বার লাশ উঠে এলো। আমি আর চাচা চঙ্গ দিয়ে বাবার লাশ বাড়ি নিয়ে আসলাম। আব্বার মরদেহে এক কলস পানি ঢেলে দিলাম। পুরাতন শাড়ি পেঁচিয়ে দেড় হাত গর্ত করে আব্বাকে মাটিচাপা দিলাম।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ৬ জুলাই ২০১৭

পড়ুন :
প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

চতুর্থ পর্ব :   নূরুল আমীন প্রধান

পঞ্চম পর্ব : সালামত জেহাদ

ষষ্ঠ পর্ব : সানোয়ারা বেগম

সপ্তম পর্ব : মনোয়ারা বেগম নার্গিস
অষ্টম পর্ব : ইসহাক মোল্লাহ
নবম পর্ব : রবিদাশী বর্মণ
০ম পর্ব : আরফাত আলী সিকদার
১১ম পর্ব : প্রল্লাদ চন্দ্র বর্মণ
২তম পর্ব : উত্তম কুমার দাশ

 ***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments