ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১১ : ৩৩ মিনিট

October 13th, 2017

কাজী লাবণ্য

কাজী লাবণ্য

হলুদ তিতলি

সুদূর উইলো বনের আড়াল থেকে হলুদ পরাগ তিতলি উড়ে এসে
বসে ঘুমহীন  চোখের ডানায়
ওর পাখায় সাগরের যৌবন ঢেউ..
লেবুগন্ধা দেহবল্লরীর ঘ্রাণ কাটারিভোগ চালের
ভাতের মতো
তোমার ঘুম আসে না ? কেন, কিসের নেশায়, কোন সে আশায়
জেগে কাটাও জগতজুড়ে অন্ধকারে একা একা?  আমার খুব ইচ্ছে করে
মেঘের ভেলায় উড়তে…  সেবার জমিন থেকে উড়াল দেবার পর
তখন অবসন্ন বিকেলের ছোঁয়া সমস্ত আকাশজুড়ে
তুলো ছড়ানো মেঘে লালের আবীর, নীল, গোলাপী, বেগুনী
আমিশর্ষে হলুদ তিতলির মতই  হয়ে উঠি অশান্ত
এ কেমন আকাশ মন অস্থির করে তোলে! ইচ্ছে করে আকাশবালকের হাত ধরে
ভাসতে থাকি গন্তব্যহীন…

তোমার  চোখের সংশয় হৃদয়ের স্বপ্নিল মিলিয়ে কোথাও অদ্ভুত
এক পৃথিবীময়তা সৃষ্টি হয়, যেন প্রগাঢ় নীল অপরাজিতার ফুল
আমি অনিচ্ছায় সরে আসি, চোখ ঘুরিয়ে নেই, মন ফিরিয়ে নেই

কেবল ফেরাতে পারিনা বিমোহিতা ।

 

হৃদয় পুড়বে বলে
অবশেষে আমি হার মানলাম,
তোমার পাথুরে কাঠিন্যের কাছে
আমি হেরে গেলাম
এই আগ্রাসী থাবার কষ্টের কাছে

শুধু তোমার কাছে ফিরে যাবার-
নিটোল প্রত্যাশা ছিল
সে প্রত্যাশার ভাগারে ফেলে দিলাম-
নিষ্ঠুর অভিশাপ

কবিদের কষ্টের চেয়ে আর
ভারী কোন পদার্থ নাই
তারা কথার মালায়
সেই কষ্টকে উপহারের ডালায়
সাজাতে চায়, বারংবার

নির্মোহ ফুল হয়ে ফোটে-
রূপকে, ছন্দে, গানে, বীণায়, এস্রাজের তারে
যুগ যুগ বেঁচে থাকে-
মনে মননে অজস্র জটিলতায়

তুমি তারার আলোয় জেগে থাকা
অন্ধকারের জোনাক
তাকে ধরতে চাইনি
হৃদয় পুড়বে বলে ।

মা কন্যা 

সবাই তো মা, যে উৎপন্ন ও বিনাশ করে
মা হলো মানুষের খোলস
সাপের নিমোর্ক খুলে বেরিয়ে আসে নিজস্ব রূপে
তাই মা নিজের মৃত্যুকে পায় না ভয়
তার সকল আগ্রহ সন্তানকে ঘিরে
কারণ তারাই তো তার নতুন রূপ
মায়ের মৃত্যুতে সন্তানের কান্না
মূলত পরিচিত জনপদের বিলয়
তার সামনে কেবল আজানা পথ
তাকেও নির্মোক খুলে বেরিয়ে আসতে হবে
মিলিয়ে যেতে হবে খোলসের মায়ায়
তুমি জান সাপ তার ডিম্বকে প্রাণদানকারী
পুরুষ সঙ্গীকেও খেয়ে ফেলে
অথচ সেই মা ডিমের প্রতি রাখে যত্ন
মৃত্যুর আগে খোলসে লুকায় নিজের সত্তা
এইভাবে অসংখ্য ডিম মিলে গোলাকার ভ্রমাণ্ড
প্রদক্ষিণ করে উত্তপ্ত সূর্য
রবির উষ্ণতা ছাড়া অস্পষ্ট প্রাণের স্পন্দন
মায়ের মৃত্যুতে দুঃখ করো না
কারণ মা অবিনাশী
সন্তান বলে কিছু নাই
নাম ও রূপের পার্থক্য আমাদের ভ্রম
তুমি কষ্ট পাচ্ছ,
কারণ এখন খোলস পাল্টানোর কাল
তুমিও মা, তোমার কন্যাও
তুমি জান তার জয়ায়ুতে আছে নানির ডিম্বক
এবার বল কে মা আর কে কন্যা
একটা দৃশ্যমান সুতার তুমি মধ্যবিন্দু
আমরা সকলেই নিজের মা ও কন্যার
পারাপারের সেতু ভিন্ন অন্য কিছু নই
চল মাকে কন্যার কাছে পৌঁছে দিই।

পদধ্বনি

না ফেরার দেশ থেকে মানুষ ফেরে না

তোমার বুকে জন্মাক সবুজ পাহাড়
নিশ্চিত জানি তুমি আর ফিরবে না।কিন্তু তারপরও
তোমার ফেরার পদধ্বনি গুঞ্জরিত হয়। যেমন ফিরতে দূরদেশ থেকে
যেমন ফিরতে নিত্য কাজ থেকে,যেমন ফিরতে ইস্পাত কঠিন অভিমান থেকে…

জানালায়, দরোজায়, কাপড় শুকানো তারে বসে এক অবিরাম ঘুঘু
ডেকে ডেকে গলার শিরা ফুলিয়ে ফেললে
আমি কেবল কাকতাড়ুয়ার ভুমিকা পালন করি
চারপাশে অদৃশ্য কাগজনামার ঘেরাটোপ
নিজের মধ্যে আরেকজন আমি, সেও নিশ্চুপ

ঘোর লাগা দুপুরে,  সিলিং গোনা রাতে যখন চোখদুটো
বাক্সের খোলা ডালার মত, তখন আমার ঘুঘু ডাকের তৃষ্ণা পায়
সেই অবিরাম সুরে রীড মেলাতে ইচ্ছে করে
ইচ্ছেরা যখন প্রবল হয়ে ডানা মেলতে যায়- ঠিক তখনি
তোমার ফেরার পদধ্বনি পাকি  সৈনিকের বুটের শব্দ হয়ে যায়।

বনমালি
নেইলপলিশ বিহীন নখগুলি সামান্য মার্জিন অতিক্রম করলেই ইদানীং আঙুলের ডগা ভার হয়ে থাকে। ভয় সংশয় সর্বত্র -এক্যুরিয়ামের কচ্ছপের গায়ে শ্যাওলা ব্রাশিং করতে গেলে মরার ভয় লিফটে উঠলে আটকে পড়া গল্পের গরু গাছে না চড়া আর খাবারে ফরমালিন। কত শীত চলে গিয়ে আবার নবান্নের আয়োজনে ব্যস্ত কিষাণীরা। ধানে নাকি আবারও বাম্পার ফলন গোবিন্দগঞ্জের কালো মানিকদের  হিম্মতের মত। ভেজাল বিহীন খাঁটি জলপাই তেলের খোঁজে আলমাস বসুন্ধরা যমুনা থেকে টোকিও স্কয়ার বেসাতিতে বণিকেরা যুগে যুগে সত্যবান যুধিষ্ঠির। আসন্ন বইমেলার  প্রচ্ছদ পকেটে ভরতে ভরতে লেখক শিল্পীর গুরুগুরু গুঞ্জন। কাঁচামিঠে রোদ এখন রোদেলা করে দখিনের বারান্দা। কে কাকে শাসন করে! সময় নাকি আমি!  এইত ট্রেনের জানালায় শালবনের মতো নভেম্বর গিয়ে এলো বলে ডিসেম্বর। তারপর বড়দিন। বড়দিন কত বড় শুভময়! তখন রুমাল নেড়ে যাদুবলেকোনোযাদুকরকি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবে! সময় মরে বাসনা মরেনা!

বোনের বাসায় মা মায়ের বাড়ি খালি, আত্মজা সেই তেপান্তরে আমি বনমালি।

কাজী লাবণ্য : কবি, লেখক। তিনি নিয়মিতভাবে লিখছেন কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও উপন্যাস। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো : জোনাক বনে জোছনা, বিষন্ন জলের কারিকা, ত্রয়ী, নাকছাবি, রাঙা গোধূলি। জন্মস্থান : রংপুর
বর্তমান :  ঢাকা।

Comments

comments