ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮ | ০৪ : ১৬ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ অষ্টম পর্ব।  জানবো : ইসহাক মোল্লাহ, বাবা : ইয়াকুব মোল্লাহ, মা : শামসুন নাহার, গ্রাম : নয়ানগর, পেশা : বেকার (বর্তমানে ছেলেদের সঙ্গে ঢাকার সারুলিয়ায় বসবাস করেন), বয়স : ৬৬ বছর।

 ইসহাক মোল্লাহ। ছবি : লেখক

ইসহাক মোল্লাহ। ছবি : লেখক

গণ্ডগোলের সময় নারায়ণগঞ্জের ডেমরায় করিম জুট মিলে চাকরি করি। যখন গণ্ডগোল পুরোপুরি লাইগা গেলো, তার সপ্তাহ খানেক পর নিরাপত্তার জন্য বাড়ি চইলা আসলাম। মাস খানেক ভালোই কাটাইলাম। হঠাৎ একদিন পাকস্তানি বাহিনী আইলো দুটি লঞ্চ নিয়া। ভোর ৬টায় আমাদের গ্রামটাকে অ্যাটাক করলো। কিছু লোককে ঘরের ভেতর গিয়ে মারলো আর কিছু লোককে পাটখেতে। আমার বাবা তখন নামাজ পড়তেছিল। মা-ও নামাজ পড়ছিল। বাবাকে ওরা ঘর থেকে ধরে নিয়ে গেলো। আমি দৌড়াচ্ছিলাম। হঠাৎ কীভাবে যেন তাদের সামনে পড়ে গেলাম। বাবা আমাকে ডাক দিলো। আমি বাবার কাছে গেলাম। আমাগো দুই জনরে একলগে দাঁড় করাইলো। বাবাকে ওরা দুটি গুলি করলো। একটি বুকে লাগলো, আরেকটি গলায়। বাবা সঙ্গে সঙ্গে পইড়া গেলেন। বাবার গায়ের গুলি আইসা লাগলো আমার ডান হাতে। গুলিটি হাতের এক পাশ দিয়ে ঢুকে আরেক পাশ দিয়ে বের হইয়া যায়। গুলি খাইয়া আমিও মাটিতে পইড়া গেলাম। আমার কোনো হুশজ্ঞান ছিল না। পাটখেতেই অজ্ঞান হইয়া পইড়া আছি। বিকাল বেলা আমার মা আর বড় বোন আমাকে খুঁইজা পাইল। তারা আমাকে ধরাধরি কইরা বাড়ি নিয়া গেলো। ক্ষতস্থানে শক্ত করে গামছা দিয়ে বাঁধা হইল।

ওইদিন সন্ধ্যায় আমাকে নৌকায় করে নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পথে একজন বলল, হাসপাতালে গুলিবিদ্ধ রোগী ভর্তি করলে ইনজেকশন দিয়ে মাইরা ফেলে। মা বললো, ‘রোগী নিতাছি ভালো করার জন্য। যদি মাইরাই ফেলে, তাইলে হাসপাতালে ভর্তি করার দরকার কী! তারচেয়ে বরং বাড়িতে মরাই ভালো।’ আমাকে বাড়িতে ফেরত আনা হলো। বাড়ি নিরাপদ না। তাই আমাকে মামাবাড়ি বাঘাইকান্দি গ্রামে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হলো।

বাঘাইকান্দির পাশেই হোগলাকান্দি গ্রাম। সেখানে প্রফুল্ল চন্দ্র শীল নামে এক ডাক্তার আছেন। মামা গেলেন সেই ডাক্তারের কাছে। সব বৃত্তান্ত খুলে বললেন। মামা ডাক্তারকে সঙ্গে নিয়ে আসলেন। ডাক্তার আমাকে দেইখা বললেন, ‘আমি রোগীকে সারাতে পারবো। তবে আমার একটা অনুরোধ আছে, আমি কোনো টাকা পয়সা চাই না। আপনারা যদি আমার মা, ছেলে আর বউকে আপনাদের সঙ্গে মুসলমান পরিচয়ে থাকতে দেন, তাহলে চিকিৎসা শুরু করতে পারি।’ তিন মাস চিকিৎসার পর ভালো হইলাম।
বাবাকে কেমন করে কবর দেওয়া হইল জানি না। পরে শুনেছি, পুরনো চাদর পেঁচিয়ে একটি গর্ত করে বাবাকে মাটিচাপা দেওয়া হইছে। আমার মা আর বোনজামাই মাটি খুঁইড়া বাবাকে কবর দেয়। বাবা জন্ম দিলো, লালন-পালন করলো, বড় করলো, সেই বাবাকে মাটি দিতে পারলাম না। এই দুঃখ সারা জীবন বয়ে বেড়াচ্ছি। এখন খুবই কষ্টে দিনযাপন করছি। কোনো ভারী কাজকর্ম করতে পারি না। ডাক্তারের নিষেধ আছে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ৩১ মার্চ ২০১৭

পড়ুন :
প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

চতুর্থ পর্ব :   নূরুল আমীন প্রধান

পঞ্চম পর্ব : সালামত জেহাদ

ষষ্ঠ পর্ব : সানোয়ারা বেগম

সপ্তম পর্ব : মনোয়ারা বেগম নার্গিস

***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments