ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৯ : ২১ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ্ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ সপ্তম পর্ব।  জানবো : মনোয়ারা বেগম নার্গিস, পিতা : আনর আলী সিকদার, মাতা : সানোয়ারা বেগম, স্বামী: আবদুর রহমান, গ্রাম : গজারিয়া, পেশা : গৃহিনী, বয়স : ৪৮ বছর।

মনোয়ারা বেগম নার্গিস । ছবি : সাহাদাত পারভেজ

মনোয়ারা বেগম নার্গিস । ছবি : সাহাদাত পারভেজ

তখন আমার বয়স দেড় বছর। তাই ওই সময়ের কোনো স্মৃতি আমার মনে নাই। মা আর বড় বোনের কাছে সব শুনছি। ঘটনার সময় আমি মায়ের কোলে ছিলাম। আমার বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিক রফিক ছিলেন আমার বাবার কোলে। রফিক ভাইয়ের বয়স ছিল তিন বছর। আর আমার বড় বোন সালেহা বেগম রেনুর ছিল ছয় বছর। আমরা পিঠাপিঠি ভাইবোন। জ্ঞান হওয়ার পর কোমরে দাগ দেইখ্যা একদিন মাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমার কোমরে দাগ কেন?’ তখন মা আর রেনু আপা সব খুইলা কইলো। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন নাকি আমার বাবাকে গুলি করতেছে ছিলো তখন মা সামনে গিয়া বাধা দিলো। তখন মাকেও গুলি করলো। আমি ছিলাম মায়ের পাতাল্যা কোলে। তাই আমার গায়েও গুলি লাগলো। মায়ের লাগলো ডাইন পাও-য়ে। আর আমার কোমরের ডাইন দিকে। মা আর আমি আহত হইলাম। বাবা লগে লগে মইরা গেলো।
আমি খুবই দুর্ভাগা। মেয়েরা তার বাবার স্মৃতি নিয়া বাঁচে। আমার কাছে বাবার কোনো স্মৃতি নাই। বাবার নাকি একটা সাদা কালো ছবি ছিল। আমার এক ফুফু আইসা মারে কইলো, ‘ভাউজ, মরা মাইনষের ছবি ঘরে রাখতে নাই। গুনাহ হয়।’ হেই কথা বিশ^াস কইরা মা ছবি ফালাইয়া দিছে। বাবাও আমাগো কাছে চিরতরে নাই হয়ে গেলো।

ছোট ছোট ছেলে মেয়ে লইয়া মা যে কী কষ্ট করছে তা বলার মতো না। আমরা খাইয়া না খাইয়া বড় হইছি। এমনও দিন গেছে সারা দিনে এক বেলা খাইছি। অভাবের কারণে মা আমাগো পড়াশোনা করাইতে পারে নাই। আমি ক্লাশ ফাইভ পর্যন্ত পড়েছি। বড় বোন সালেহা বেগম রেনু স্কুলে যায় নাই। বড় ভাই আবু বকর ছিদ্দিক রফিককে ছোটবেলাই মিস্ত্রিকাজে দিয়া দিছে। মামারা সাহায্য করছে। কিছু জমি ছিলো, মামারা বর্গা দিছে।

১৯৮৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি গজারিয়া গ্রামে আবদুর রহমানের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। বিয়ে পর আমার স্বামী কোমরে দাগ দেইখ্যা রাগ করে উঠলো। পরে ঘটনা শোনার পর মাইন্যা নিছে। কোমরে এখনো দাগ আছে। আমার তিন মেয়ে ছোটবেলায় জিজ্ঞাসা করতো, কেমন করে এমন হলো। ঘটনা শোনার পর এরা কান্নাকাটি করতো। এখনো প্রায় নানা প্রশ্ন করে। ঘটনা মনে করতেই চোখে পানি এসে যায়।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ  : ১৫ আগষ্ট ২০১৭

পড়ুন :
প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

চতুর্থ পর্ব :   নূরুল আমীন প্রধান

পঞ্চম পর্ব : সালামত জেহাদ

ষষ্ঠ পর্ব : সানোয়ারা বেগম

 

***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments