ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮ | ০৪ : ১৬ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ্ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ ষষ্ঠ পর্বজানবো :সানোয়ারা বেগম, স্বামী : আনর আলী সিকদার, গ্রাম : গোসাইরচর, পেশা : গৃহিণী, বয়স : ৬৭ বছর।

সানোয়ারা বেগম । ছবি : সাহাদাত পারভেজ

সানোয়ারা বেগম । ছবি : সাহাদাত পারভেজ

শেষ রাতে আমার স্বামী গাঙ্গে গেছে মাছ ধরতে। ভোরবেলায় গোলাগুলি শুরু হইয়া গেছে। ছোট ছোট পোলামাইয়া লইয়া আমি লড়তে পারি না। অপেক্ষা করতাছি উনি কখন আইবো। কিছুক্ষণ পর আমার স্বামী দৌড়াইয়া আসলো। পোলাপাইন লইয়া আমরা চকে গেলাম পালাইতে। পাটক্ষেতে পালাইয়া আছি। আমার কোলে দেড় বছরের মাইয়া নার্গিস। স্বামীর কোলে তিন বছরের পোলা রফিক। ছয় বছরের বড় মাইয়া রেনু আমাগো লগেই। খানাপিনা নাই, ক্ষুধায় কোলের বাচ্চা হঠাৎ চিৎকার দিয়া উঠলো। তাই সবাই মিল্লা আমাদের ওইখান থেইক্যা বের কইরা দিলো। আমরা দাঁড়াইতেই মেলিটারির সামনে পড়লাম। মেলিটারিরা আমার স্বামীকে বলে, ‘কোল থেকে বাচ্চা নামা।’ সে বাচ্চাকে ছাড়লো না। তাকে গুলি করার জন্য হাত ধইরা টেনে নিয়ে যাইতেছে।

আমি সামনে গিয়া হাত বাড়াইয়া বাধা দিয়া কইলাম, ‘তারে ছাড়া দুনিয়ায় আমার কেউ নাই। তারে যদি মাইরা ফেলেন তাইলে আমারে আর বাঁচায় রাইখা লাভ নাই। আমারেও মাইরা ফেলেন।’
ওরা জিগায়, তোমরা কি মুসলমান? আমি বলি, জ্বি। বলে, কলমা পড়। কলমা পড়লাম। কলমা পড়লে কী হইবো, ওরা কী আর কলমা বোঝে! পাশের একজন জিগায়, ভোট দিছো কারে? জীবনের ভয়ে কইলাম, বাদশা মিয়ারে। ওরা হা হা কইরা হাইসা উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে ওরা আমাকে গুলি কইরা দিলো। আমার বাম পায়ের রানে গুলি লাগলো। ছোট মাইয়া আমার কোলেই ছিল। মাইয়ার কোমরেও গুলি লাগলো। গুলি খাইয়া পইড়া গেলাম।কলিজা মুহূর্তে শুকায়ে গেলো পানির তিয়াশে।

পাটখেতে বৃষ্টির পানি না জোয়ারের পানি বুঝতে পারলাম না। দুই হাতে পানি নিয়া চুমুক দিলাম। তখন যেন আমার রুহটা ফিরা আইলো। পাশে তাকাইয়া দেখি, আমার স্বামীর লাশ পইড়া আছে। বড় মাইয়া কইলো, তার বাবারে বুকে ও মাথায় গুলি করছে। আমার পা বাইয়া রক্ত পড়তাছে। আমার শরীরের রক্তে পানি লাল হইয়া গেছে। আউর পাইড়া বাড়িতে আসলাম। আমার রক্ত বন্ধ হইতেছে না। বাড়িতে কচুগাছ ছিল। আমার জালেরা মানকচুর ডগা কাইটা আমার রানের মধ্যে ঢুকাইয়া দিলো। তারপর কাপড় দিয়া টাইট কইরা বাইন্দা দিলো।
পরেরদিন সকালে লোকজন আমার স্বামীরে ঠাকুরবাড়ির সামনে কবর দিলো। সাত জনরে একলগে কবর দিছে। দাফন-কাপন হয় নাই। দুপুর বেলা আমার বড় ভাই রহম আলী মোল্লাহ আমাগো দুই জনরে নিয়া রওনা হইল নারায়ণগঞ্জে, ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে। সাড়ে তিন মাস হাসপাতালে ছিলাম। বিকাল বেলা দেখতাম, রোগীগো বিছানার সামনে আত্মীয়স্বজনের অভাব নাই। আর আমার সিথানে একটা কাউয়াও নাই। ভাইয়ে যে হাসপাতালে ভর্তি কইরা দিয়া আইছে, এরপর আর একবারও যায় নাই ডরে। পাঁচ বছর লাগছে আমার পুরোপুরি ভালো হইতে। ভালো হইছি ঠিকই কিন্তু রক্তশূন্যতা কমে নাই। মাঝে মাঝে মৃগী রোগীদের মতো হইয়া যাই। কোনো রকমে বাঁইচা আছি। সরকার যদি একটু দয়া করতো, তাইলে ডাইল-ভাত খাইয়া বাকি জীবনটা বাঁচতে পারতাম।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ :  ২৬ মার্চ ২০১৭

পড়ুন :
প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

চতুর্থ পর্ব :   নূরুল আমীন প্রধান

পঞ্চম পর্ব : সালামত জেহাদ

***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments