ঢাকা, সোমবার, ১৮ জুন ২০১৮ | ১১ : ০৫ মিনিট

October 6th, 2017

ছবি : লেখক

ছবি : লেখক

৬ অক্টোবর, শুক্রবার। রোদ্রে চকচক করেছে সকালটা। অফিস নেই। প্রতিদিনের মতো সেই রকমের তাড়াও নেই। তবে যত তাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য বের হওয়া্। মুটোফোনটা বেজে উঠে। দেখি কাজী শান্তার ফোন। ‘ভাইয়া, শুভা আপুর খুব জ্বর আর বমি। তাই তিনি আর যেতে পারবে না। কিন্তু আমরা যাচ্ছি। বলেন, কোথায় থাকতে হবে।’
ফোন করে জেনে নিলাম মুক্তিযোদ্ধা আবদুল সালামের কাছে। শান্তাকে বললাম, তোমরা খিলক্ষেতের রেলগেইটের ওখানে থেকো। সাড়ে ১০টার মধ্যে পৌঁছায় যাব।

সেই হিসেবে লালবাগ থেকে বের হলাম। বাসের অপেক্ষায় কেটে গেল বেশ কিছুক্ষণ। ওদিক থেকে শান্তার ফোন, ‘ভাইয়া, আর কতদূর।’
‘এইতো বেশিক্ষণ আর লাগবে না। একটু দেরি হয়ে গেল।’

IMG_20171006_122528২.
খিলক্ষেত থেকে যাত্র্রা শুরু হলো ইঞ্জিলচালিত অটোরিক্সাতে চড়ে। যত যাচ্ছি, ততেই যেন গ্রামের কথা মনে পড়ে।  এমন তো আমাদেরও গ্রাম। শহরে ভিতরে এমন কেন? রাস্তাঘাট তো আমাদের গ্রামে চেয়ে খারাপ। ভাঙাচোরা রাস্তার দিয়ে হেলেদুলে যাচ্ছি। এর মধ্যে যতকথা ছিল একের পর এক বলে যাচ্ছে শান্তা আর ইরিন। তিনশ ফিট দিয়ে যাওয়ার সময় দু ‘চোখ ভরে উঠে শরতের শুভ্রকাশফুল দেখে। ড্রেসিং করা বালিগুলো যেন সাদা রঙের সামিয়ানা দিয়ে ঢেকে রেখেছে কেউ। অপূর্ব এক সুন্দর। সুনীল আকাশে যেন বড় বড় চোখ করে দেখছে সেই দৃশ্য।

পৌঁছায় ডুমনীতে। সেখানে থেকে তলনা বাজারের স্কুলের যেতে হলো অন্য একটি অটোরিক্সা নিতে হবে। আমরা তিনজন। আরও ছিল চারজন যাত্রী। উচু নিচু। কখনো কখনো পাকা রাস্তা, কখনো আবার কাচা রাস্তা। এভাবে চলছি। অজপাড়া গ্রামের মতো শান্ত পরিবেশ। শহরে মতো এতো কলাহল নেই। জনমানুষের ব্যস্ততা ঢলও নেই। বাজারে পৌঁছায় মাত্র মসজিদে আজানের ধ্বনি। ঘড়িতে তখন বেলা বারটা দশ মিনিট।  আমাদের প্রতীক্ষায় থাকা মুক্তিযোদ্ধারা এর মধ্যে চলে গেছেন  নিজ কাজে। কেউ কেউ নামাজে। মুক্তিযোদ্ধা আবদুল সালামকে ফোন করে বুঝতে পারি, নামাজের পর ছাড়া সাক্ষাৎকার নেওয়া অসম্ভব।

তারপর শুরু হলো আমাদের প্রতীক্ষার প্রহর। কখন আসবেন মুক্তিযোদ্ধারা। বালিনদীর পাড়ে, কাঠের গুড়ির উপর বসে শুরু হলো আমাদের নানা কথাবার্তা। পাশে কয়েকজন ছেলে ঘুরঘুর করছে। ঘরে নতুন অতিথি আসলে যেমন মানেুষের মনে আনন্দ লাগে ঠিক তাদের মনে আমাদের দেখে তেমন মনে হচ্ছিল। গাছ থেকে দুটো ডাব পেরে এনে আমাদের সামনে সেইগুলো সাইজ করতে শুরু করে। শান্তা তা দেখে খাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করলে তারা আমাদের একটা ডাব দিয়ে দেয়। ডাবের পানি চুম দিতে থাকে শান্তা আর ইরিন। এর মধ্যে তাদের সঙ্গে আমাদের কিছু কথা হয়। তারা বলে, আপনারা কোথায় থেকে এসেছেন?
শান্তা বলে, ‘ঢাকা ্থেকে।’
ছেলেগুলো বলে, ‘এটাও ঢাকা।’
IMG_20171006_123712আসলেই তো এটা তো ঢাকায়। গ্রামের মতো মনে হলেও এটা তো ঢাকা শহরেই একটি গ্রাম। খিলক্ষেত থানার একটি গ্রাম। নাম তলনা। বালিনদী পাশ দিয়ে বয়ে গেছে। মালপত্রবাহী লঞ্চগুলো কিছুক্ষণ পর পর আসছে। কিছু সখিন মানুষও নদীতে ইঞ্জিন চালিত নৌকা ভাড়া করে ঘুরতে বেড়িয়েছে। ছোট নদীর কিন্তু স্রোত অনেক বেশি। গ্রামের অনেক মানুষ এই নদীতে গোসল করেন। কাপড়-চৌপড় পরিস্কার করেন। নদীতে পা ডুবতে না পারলে যেন অসমাপ্ত থেকে যাবে এমনটি মনে করে শান্তা। তাই তো তিনি ঘাটের পাড়ে বসে নদীর পানিতে দুটো পা জলে ভিজে শান্তিতে নেচে উঠে। ইরিনেও সেই ইচ্ছে। কিন্তু তার একটু ভয় করে।

পানিতে ইরিন পা দিতেই একজন মহিলা বলেন, এখানে কিছুদিন আগে একজন শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। তার মা প্রায় ১৫ দিন এখানে বসেছিলেন। নদীটা ছোট হলোও স্রোত ধাক্কা মারে।

মহিলার কথা শুনে থমকে যায় ইরিন। তার আর নদীর পানি ছোঁয়া হলো না। অাফসোস থেকেই গেল। দুপুরের ঝলমল আলোটা অন্ধকারের ছেঁড়ে যায়। যেন এখনেই বৃষ্টি নামবে। তবুও আমাদের প্রতীক্ষার প্রহর শেষ হচ্ছে না। পেট খিদে চৌ চৌ করছে। আশপাশে ভালো খাবার দোকানো নেই। যেটা পেলাম সেটা নাকি এই গ্রামের সবচেয়ে ভালো খাবার দোকান। ওখানে দুপুরে খাবার সরে তলনা নুর হোসেন স্কুলে অপেক্ষা করতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পরে একজন মুক্তিযোদ্ধা আসার পরে আমাদের বুকে আশা জেগে উঠল। যেন ক্লান্তির অবসান ঘটে।

ঢাকার মধ্যে একটু স্বস্তি পেতে এই গ্রামে যেতে পারেন। শান্ত, সবুজঘেরা, বালিনদীর ঘাট- আপনাকে মূগ্ধ করবেই। নীরবে কিছুটো সময় আপনাকে আনন্দ দিবেই। আমাদের সবুজ শ্যামল, শান্তা, সাদা মনের বসতি মানুষগুলো চিরদিন যেন ঠিক থাকে।

কিভাবে যাবে :
খিলক্ষেত থেকে ইঞ্জিলচালিত অটোরিক্সা করে ডুমনীতে যাবেন। ভাড়া নিবে ৩০টাকা। সময় লাগবে ২৫মিনিট। সেখান থেকে তলনা বাজার বা স্কুল যাওয়ার জন্য ইঞ্জিলচালিত অটোরিক্সা ১০টাকা ভাড়া করে যেতে পারেন। আবার সরাসরি ভাড়া করেও যেতে পারেন।

Comments

comments