ঢাকা, শুক্রবার, ২৫ মে ২০১৮ | ০৯ : ০৩ মিনিট

October 5th, 2017

Jobs_swapno71প্রযুক্তি যুগে  কে শুনেনি স্টিভ জবসের নাম। সেই প্রযুক্তি উদ্ভাবক স্টিভ জবসের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি ১৯৫৫ সা্লে ২৪ ফেব্রুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার স্যানফ্রান্সিসকোতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মসূত্রে বাবা আবদুল ফাত্তাহ জান্দালি ও মা জোয়ান সিম্পসন তাঁকে দত্তক দিয়ে দেন। পল ও ক্লারা জবসের মধ্যবিত্ত পরিবারেই বড় হন জবস। তবে তিনি যে তার পিতা-মার দত্তক পুত্র সন্তান একটা আবিষ্কার করেন ২৭ পর।

জবস কুপারটিনো জুনিয়র হাই স্কুলে এবং হোমস্টিড হাইস্কুলে পড়াশোনা করেন। তিনি প্রায়ই হিউলেট-প্যাকার্ড কোম্পানির লেকচারগুলোতে অংশগ্রহণ করতেন। যেখানে পরবর্তীতে তিনি গ্রীষ্মকালীন কর্মচারী হিসাবে স্টিভ ওজনিয়াকের সঙ্গে কাজ করেন। ১৯৭২ সালে তিনি হাইস্কুল শেষ করেন এবং রীড কলেজ়ে ভর্তি হন। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ না থাকার কারণে তিনি পরবর্তীতে কলেজ ছেড়ে দেন। তারপর তিনি ক্যালিগ্রাফীসহ আরও কিছু ক্লাসে যোগদান করেন। বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তন অনুষ্ঠোনের তিনি বলেন ,‘যদি আমি ওই কোর্সে না যেতাম তবে ম্যাকের কখনোই বিভিন্ন টাইপফেস বা সামঞ্জস্যপূর্ণ ফন্টগুলো থাকতো না।’

তিনি স্টিভ ওজনিয়াক এবং রোনাল্ড ওয়েনের সঙ্গে ১৯৭৬ সালে “অ্যাপল কম্পিউটার” প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি অ্যাপল ইনকর্পোরেশনের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ও সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি “পিক্সার এ্যানিমেশন স্টুডিওস”-এরও প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম ও সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। ১৯৮৫ সালে অ্যাপল ইনকর্পোরেশনের “বোর্ড অব ডিরেক্টর্সের” সদস্যদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে তিনি অ্যাপল ইনকর্পোরেশনের থেকে পদত্যাগ করেন এবং নেক্সট কম্পিউটার প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৬ সালে অ্যাপল কম্পিউটার নেক্সট কম্পিউটারকে কিনে নিলে তিনি অ্যাপলে ফিরে আসেন। তিনি ১৯৯৫ সালে টয় স্টোরি নামের অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন।

জবস তারপর নিজের মতোন করে পথ চলতে শুরু করেন। ছোট্ট একটি দল নিয়ে তিনি নিজের খুদে প্রকল্পের কাজ করতে থাকেন। পুরনো দিনে জলদস্যুরা যে রকম মাথার খুলি ও হাড় আঁকা পতাকা ওড়াত, স্টিভ জবসও বাড়ির ছাদে তেমন পতাকা ওড়ান। তিনি এও বলতেন, ‘নৌবাহিনীতে নিয়মানুবর্তী সৈন্য হওয়ার চেয়ে স্বাধীনচেতা জলদস্যু হওয়াই ভালো।’ নেক্সট নামে নতুন একটি কোম্পানি খোলেন স্টিভ জবস। টেক্সাসের বিলিয়নেয়ার ও পরবর্তীতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী রস পেরো তার পাশে দাঁড়ান। ভেঞ্চার পুঁজির সমর্থন পেয়ে জবস অ্যানিমেশন কোম্পানি পিক্সার কিনে নেন। এ কোম্পানি ডিজনির সঙ্গে মিলে ‘টয় স্টোরি’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করে। ছবির ক্রেডিট লাইনে নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে জবসের নাম উল্লেখ করা হয়।

এদিকে অ্যাপলের দিন ভালো যাচ্ছিল না। কোম্পানির ব্যবসা দিন দিন পড়তির দিকে যাচ্ছিল। করপোরেট বাস্তবমুখিনতা প্রমাণ করে অ্যাপল ১৯৯৬ সালে নেক্সটকে কিনে নেয়। কোম্পানির পতন ঠেকাতে স্টিভ জবসকে দ্রুত পদোন্নতি দেয়া হয়। ২০০০ সালে স্টিভ জবস অ্যাপলের সিইও হন। তার বেতন ছিল নামকাওয়াস্তে, বার্ষিক ১ ডলার। মূলত কোম্পানির শেয়ারের মাধ্যমে জবসের বেতন পরিশোধ করছিল অ্যাপল। তার প্রাপ্ত শেয়ারের দাম তত দিনে ২০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যায়।

জবস বরাবরই হ্যাকার সংস্কৃতির কাছের মানুষ ছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় বেড়ে ওঠার সুবাদে কাউন্টার-কালচারে প্রভাবিত ছিলেন তিনি। সত্তরের দশকে তিনি প্রায়ই হ্যাকারদের বিভিন্ন ইভেন্টে স্যান্ডেল পরে হাজির হতেন। পরবর্তীতে জাকারবার্গ ফেসবুক অফিসে একই রকম কাজ করতেন। ভারত ভ্রমণের পর জবস বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। কিছুদিন ফিদেল কাস্ত্রোর মতো দাড়িও রেখেছিলেন। এছাড়া তিনি নিরামিষ খাওয়ারও অভ্যাস করেন।

নব্বইয়ের দশকে এক ভাষ্যকার স্টিভ জবসকে ‘সিলিকন ভ্যালির সবচেয়ে বিপজ্জনক লোক’ আখ্যায়িত করেন। কারণ হিসেবে ওই ভাষ্যকার বলেন, ‘জবস অর্থের জন্য সিলিকন ভ্যালিতে আসেননি বলেই তিনি বিপজ্জনক। বিল গেটস পারসোনাল কম্পিউটারকে দেখেছেন অন্যের অর্থ নিজের পকেটে পুরে নেয়ার উপায় হিসেবে। নিজের পকেটে অর্থ পুরতে পারলে বিল গেটস কম্পিউটারের সঙ্গে মানুষের মিথস্ক্রিয়া কেমন হয়, সে ব্যাপারে তোয়াক্কা করেন না। কিন্তু জবস এ বিষয়টি নিয়ে ভাবেন। তিনি পৃথিবীকে কম্পিউটিংয়ের উপায় বাতলাতে চান। বিল গেটসের কোনো স্টাইল নেই। অন্যদিকে স্টাইলকে হিসাবের বাইরে রাখলে স্টিভ জবসের কিছুই থাকে না।’

সিলিকন ভ্যালির মুক্তচিন্তা, অন্যদিকে নো-ননসেন্স বস; একদিকে সৃজনশীল কারিগর, অন্যদিকে একচেটিয়াত্বের পূজারি পুঁজিপতি। অনেকটা মোহগ্রস্ত ডিজাইনার ও প্রযুক্তিবিদ স্টিভ জবস অ্যাপলের প্রতিটি উদ্ভাবন ও প্রডাক্ট লঞ্চকে উপাসনার উপলক্ষ করে তুলেছেন। গোড়ার দিকের অ্যাপল ম্যাক থেকে শুরু করে আইপড, আইপ্যাড, আইফোন— প্রতিটি পণ্য প্রতিবার বিশ্বজুড়ে অ্যাপলের শোরুমে ভিড় জমিয়েছে। তরুণ ভক্তরা নতুন পণ্য দেখতে-কিনতে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। ব্র্যান্ড পূজার যে সংস্কৃতি এখন বিশ্বায়িত রূপ নিয়েছে, স্টিভ জবসের পণ্যগুলো সেখানে আলটিমেট স্টাইল স্টেটমেন্টে পরিণত হয়েছে। জবসের কাছে এটাই যথেষ্ট ছিল।

নিজের মেধা অথবা যোগ্যতা প্রমাণ করতে স্টিভ জবসের বাড়তি কিছু করার প্রয়োজন ছিল না। তিনি কেবল এটুকু নিশ্চিত করেছেন, যাতে বিগত পণ্যটির চেয়ে নতুন পণ্যও বাজারে আলোড়ন সৃষ্টি করে। দান-দাক্ষিণ্যের বিষয়েও স্টিভ জবসের মাথাব্যথা ছিল না। অ্যাপলের সিইও পদে ফিরে আসার পর কৃচ্ছ্রসাধনের জন্য তিনি কোম্পানির করপোরেট ফিলানথ্রপি কর্মসূচি বন্ধ করে দেন। কোম্পানির মুনাফা ফুলেফেঁপে ওঠার পরও তিনি এসব কর্মসূচি নতুন করে চালু করেননি। আশির দশকে জবস নিজের দাতব্য ফাউন্ডেশন চালু করেন। কিন্তু পরে সেটি বন্ধ করে দেন, কারণ পেশাদার জনহিতৈষণার দেখানেপনার দিকটি তার ভালো লাগত না। অন্য অনেক ধনকুবেরের মতো তিনি গিভিং প্লেজেও স্বাক্ষর করেননি।

গোড়ার দিকে অ্যাপল-মাইক্রোসফটের দ্বৈরথের কারণে বিল গেটসের সঙ্গে স্টিভ জবসের সম্পর্কের অবনতি হলেও বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুজনই পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে জবস বলেন, ‘আমার মনে হয় পৃথিবীটা এখন আগের চেয়ে ভালো জায়গা, কারণ বিল বুঝতে পেরেছেন যে, সমাধিক্ষেত্রে সবচেয়ে ধনী মানুষ হওয়া তার জীবনের লক্ষ্য নয়।’

জবস শেষ চিঠিতে তিনি লিখেছেন : ‘বাণিজ্যিক দুনিয়ায় আমি সাফল্যের একেবারে সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহণ করেছি। যা আপনাদের কাছে সাফল্যের এক অনুপম দৃষ্টান্ত। কিন্তু এ কথা ধ্রুব সত্য, কাজের বাইরে আমার সামান্যই আনন্দ ছিল। সম্পদের প্রলোভনে বিভোর ছিলাম সারা জীবন। আজ মৃত্যুশয্যায় শুয়ে যখন জীবনটাকে দেখি, তখন আমার মনে হয়, আমার সব সম্মান, খ্যাতি আর অর্জিত সম্পদ আসন্ন মৃত্যুর সামনে একেবারেই ম্লান, তুচ্ছ আর অর্থহীন। অ্যাপলের বিশাল সাম্রাজ্য আমার নিয়ন্ত্রনে ছিল, কিন্তু মৃত্যু আজ আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পৃথিবীর অন্যতম ধনী ব্যক্তি অন্ধকার কবরে শুয়ে আছে সেটা আদৌ কোনো বড় ব্যাপার না। প্রতি রাতে নিজের বিছানায় শোয়ার আগে ভাবতাম, সারাদিন কী করলাম সেটাই আসল ব্যাপার। এখন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থেকে অন্ধকার রাতে জীবনরক্ষাকারী মেশিনের সবুজ বাতিগুলোর দিকে চেয়ে আমার বুকের গহীনে হাহাকার করে ওঠে। মেশিনের শব্দের ভিতরে আমি নিকটবর্তী মৃত্যু দেবতার নিঃশ্বাস অনুভব করতেHere-s-Why-Apple-Products-Don-t-Have-On-Off-Switches-468948-2পারি। অনুধাবন করতে পারি-শুধু সম্পদ না, সম্পদের সাথে সম্পর্কহীন জিনিসেরও মানুষের অন্বেষণ করা উচিত।

নির্বোধের মতো সম্পদ আহরণই সবকিছু নয়- আরো অনেককিছু মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। আর তা হলো- মানুষের সাথে সুসম্পর্ক তৈরী করা, সৌন্দর্য্য উপলব্ধি করা আর তারুণ্যে একটি সুন্দর স্বপ্ন নিজের হৃদয়ে লালন করা। শুধু সম্পদের পেছনে ছুটলেই মানুষ আমার মতো এক ভ্রান্ত মানুষে পরিণত হতে পারে। সৃষ্টিকর্তা আমাদের সবার হৃদয়ে ভালবাসা অনুভব করার জ্ঞান দিয়েছেন। কেবলমাত্র এই নশ্বর দুনিয়ায় সম্পদের মোহে জড়িয়ে পড়ার জন্য নয়। এই যে মৃত্যু শয্যায় শুয়ে আছি। কই, সব সম্পদ তো এই বিছানায় নিয়ে আসতে পারিনি। শুধু আজ সাথে আছে ভালোবাসা, প্রেম, মায়া, মমতার স্মৃতিগুলো। এগুলোই শুধু সাথে থেকে সাহস যোগাবে, আলোর পথ দেখাবে। ভালোবাসা পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে আছে- সম্পদ না খুঁজে ভালোবাসা খুঁজে নিতে হয়। সম্পদ কখনো শান্তি আনে না। মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ আর ভালোবাসাই শান্তি আনে। পৃথিবীটাকে দেখুন। শুধু সম্পদের পেছনে ছুটে হাহাকার করলে জীবনটাকে উপভোগ করতে পারবেন না।

পৃথিবীতে সবচেয়ে দামী বিছানা কি জানেন? তা হলো- হাসপাতালের মৃত্য শয্যা। আপনাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য আপনি একজন গাড়ি চালক রাখতে পারেন। আপনার নিযুক্ত কর্মচারীরা আপনার জন্য অনেক টাকাই আয় করে দিবে। কিন্তু এটাই সবচেয়ে বড় সত্য গোটা পৃথিবী চষে, পৃথিবীর সব সম্পদ দিয়ে দিলেও একজন মানুষও পাবেন না যে আপনার রোগ বয়ে বেড়াবে।

বৈষয়িক যে কোনো জিনিস হারালে আপনি পাবেন। কিন্তু একটা জিনিসই হারালে আর পাওয়া যায়না তা হলো মানুষের জীবন। মানুষ যখন অপারেশান থিয়েটারে যায় তখন সে কেবলই অনুধাবন করে- কেন জীবনের মূল্যটা আগে বুঝিনি! জীবনের যে পর্যায়েই আপনি আজ থাকুন না কেন- মৃত্যু পর্দা আপনার জীবনের সামনে হাজির হবেই। সাঙ্গ হবে জীবন। তাই, এই নশ্বর জীবনের পরিসমাপ্তির আগে পরিবারের জন্য, আপনজনের জন্য, বন্ধুদের জন্য হৃদয়ে সবসময় ভালোবাসা রাখুন। নিজের জীবনটাকে ভালোবাসুন। ঠিক নিজের মতো করে অন্যকেও।’

স্টিভ জবস জীবনে অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি ১৯৮৫ সালে স্টিভ ওজনিয়াকের সঙ্গে প্রথম ন্যাশনাল মেডেল অব টেকনোলজি লাভ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্ববিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন ২০১১ সালে ৩২ জনের নাম ‘পার্সন অফ দ্য ইয়ার’ হিসেবে মনোনীত করে। এ তালিকায় – আঙ্গেলা ম্যার্কেল, বারাক ওবামা, সিলভিও ব্যার্লুস্কোনি, লিওনেল মেসি প্রমূখ বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি তিনিও স্থান পেয়েছেন৷

জবস অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারে ভুগে ২০১১ সালের ৫ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন। সূত্র :উইকিপিডিয়াসহ বিভিন্ন অনলাইন

Comments

comments