ঢাকা, রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | ১২ : ২৩ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ্ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ ৫র্থ পর্ব।জানবো : লামত জেহাদ, পিতা : অরযত আলী জেহাদ, মাতা : আয়তন নেসা, গ্রাম : গোসাইরচর, পেশা : পিডব্লিউডির অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী, বয়স : ৭৩ বছর।

5. Salamot Jehadবেইন্যা বেলা ওরা গজারিয়া অ্যাটাক করছে। গেরাম, নদী, চর সব ঘেরাও করছে। গোলাগুলির আওয়াজ পাইয়া আমার শ্বশুর আলমাস আলী আসছে আমাকে নিতে। নাগেরচরে আমার শ্বশুরবাড়ি। গজারিয়া পাইলট হাই স্কুলের সামনে গিয়া মনে হইল, ছেলেটা (নজরুল ইসলাম) ছোট, স্ত্রীও (নূরজাহান বেগম) বাসায় একা, তাদের নিয়ে আসি। শ্বশুরকে বললাম, ‘আপনি বাড়ি যান। আমি ওদের নিয়ে আসি।’ একটু যাওয়ার পর দেখি, ওয়্যারলেস ভবনের সামনে আরব আলী ক্কারী সাবকে গুলি করছে। উনি খাড়ার মধ্যে পইড়া গেলো। উনি রাতে আমাগো গেরামে মিলাদ পড়ছে। সকালে অবস্থা বেগতিক দেইখা পাতালে হেঁটে বাঁশগাঁওয়ের দিকে যাইতেছিল। ভাবলাম হুজুরকেই মাইরা ফেলছে আর আমরা তো কিছু না।দৌড়াইয়া বাড়িতে আসলাম। অবস্থা ভয়াবহ। বউ বাচ্চা নিয়া বাড়ির পাশের জঙ্গলে পালাইলাম। জঙ্গলে অনেক লোক ছিল। ছেলে পানির জন্য কান্নাকাটি করছে। পানির জন্য বাড়িতে আসা মাত্র আর্মিদের সামনে পড়লাম।

আমার চাচা আশ্রাব আলী জেহাদ দরজায় বইসা কোরআন শরীফ পড়ছিল। একজন লাথি দিয়া কোরআন শরীফ ফালাইয়া দিলো। ঘরের কাঁড়ে আমার বড় ভাই আরশাদ আলী জেহাদ পালাইছে। তাকে কাঁড় থেকে নামাইলো। চাচাতো ভাই আনোয়ার আলী জেহাদ আরেক ঘরে চকির নিচে ছিল। তাকেও বাইরে নিয়ে আসলো।

আমাগো চারজনরে একলগে খাড়া করছে। ওরাও চারজন। ওদের শরীরভরা অস্ত্র। এক কুত্তার বাচ্চা কইলো, বস বস। আরেকজন গুলি কইরা দিল। আমার গায়ের গুলি গিয়া লাগলো একটা মুরগির বাচ্চার ওপর। পিছনের তিনজন আমার ওপর আইয়া পড়ছে। আমি কাইত হইয়া পইড়া আছি। তাদের রক্তে আমার সারা শরীর ভিজে গেছে। পাঁচ-সাত মিনিট পর ফলোআপ করার জন্য আরেকটা দল আসলো। সবাই চেগায় বেগাইয়া পইড়া আছি। ওরা চইলা গেলো। আমি সুযোগ খুঁজতাছি, এখান থেইক্যা কেমনে পালামু। একটু পর ঘাডা দিয়া নাইম্যা সোজা পাটক্ষেতের ভিতর গিয়া শুইয়া রইলাম। দেখি, রাড়ী বাড়িতে এক শালায় রাইফেল দিয়া ডাব পাইড়া পাইড়া খায়।

কিছুক্ষণ পর ওরা চলে গেলো ভুইয়া বাড়ির দিকে। পরে আমি হাঁটতে হাঁটতে নয়ানগর ও বালুচরের মাঝখানে একটি ডোবার দিকে গেলাম। ডোবায় বড় বড় কচুরিপানা। সেখানে অনেক মানুষ। কয়েকশ হবে। সেখানে মোজাফ্ফর রাড়ী লুকিয়ে আছেন। স্বাস্থ্যবান লোক। তার গায়ে লোমওয়ালা জোঁক কিলবিল করছে। উনি জোঁক টানতেছেন আর ফেলতাছেন। জোঁকের কামড়ে উনার শরীর থেকেও রক্ত বের হচ্ছে। মোজাফ্ফর রাড়ী কইলো, ‘শ্বশুরমিয়া আপনি বসেন। আপনার গায়ে গুলি লাগছে।’

আমার নাকে যে গুলি লাগছে, এতক্ষণ আমি বুঝি নাই। মোজাফ্ফর রাড়ী বলার পরে বুঝতে পারলাম। তারপর পরনের লুঙ্গি দিয়া নাকে চাপাইয়া ধরলাম। বেলা ৩টা পর্যন্ত ওই ডোবার আইলে শুইয়া ছিলাম। উঁকি দিয়া দেখি, ঠাকুরবাড়ির সামনের রাস্তা দিয়া মেলিটারিরা চলে যাইতেছে। গেরামের মসজিদ থেকে তৈয়ব আলী মাস্টারের কণ্ঠে আজান শোনা যাইতেছে। আমি হাঁটতে হাঁটতে মসজিদের কাছে আসলাম। এখন আর হাঁটতে পারছি না। আমার নানী শাশুড়ি আর ভাগ্নিরা ধরাধরি কইরা বাড়িতে নিয়া আসলো। নানী শাশুড়ি একটা বোনাজি ওষুধ লাগাইয়া দিলো। রক্ত বন্ধ হইল। পরেরদিন রসুলপুর হাসপাতালে গেলাম। সেখানে কোনো ওষুধ নাই। সব ওষুধ মেলিটারিরা নিয়া গেছে। বাধ্য হইয়া গেলাম ভবেরচর বাজারে, কাদির ডাক্তারের ডিসপেনসারিতে। তিন মাস লাগছে ভালো হইতে।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ  : ২৬ মার্চ ২০১৭

পড়ুন :
প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

চতুর্থপর্ব :   নূরুল আমীন প্রধান

***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments