ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৮ | ১২ : ৩২ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ্ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ ৪র্থ পর্ব।জানবো : নূরুল আমীন প্রধান, পিতা : সাদত আলী প্রধান, মাতা : জরিমুন নেসা, গ্রাম : বালুচর, পদবি : পুলিশের কনস্টেবল হিসেবে ২০০৭ সালের ১ আগস্ট স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ। বয়স : ৬৫ বছর।

নূরুল আমীন প্রধান। ছবি : সাহাদাত পারভেজ

নূরুল আমীন প্রধান। ছবি : সাহাদাত পারভেজ

বালুচর আর নয়ানগর পাশাপাশি গ্রাম। এই দুই গ্রামকে সেতু বন্ধনে আবদ্ধ করেছে একটা কাঠের পুল। বালুচরের পূর্ব পাশে আমাদের বাড়ি। সকালে গজারিয়া থানার সামনে শুনতে পেলাম গুলির আওয়াজ। সেই আওয়াজ শুনার পরপরে গ্রামের মানুষ হতভম্ব। উঠানে জড়ো হতে লাগে লাগে মানুষ। ওপর দিয়ে শাঁ শাঁ করে গুলি যাচ্ছে। জীবনের ভয়ে মানুষজন  দক্ষিণ পাশে চরে গিয়ে আশ্রয় নেয়। চরে গলা সমান পাটখেত। মা আর ছোট বোন রহিমা (১৫)-কে নিয়ে ছুটলাম পাটখেতে। রহিমা কেমন করে যেন একটি খেয়া নাওয়ে উঠে দৌলতপুর চলে গেল। পাটখেত থেকে দেখতে পাচ্ছি, আমাদের বাড়িতে ৮-১০ জন মেলিটারি ঢুকে পড়েছে। গ্রামে তেমন লোকজন নাই। বেশিরভাগই চরে চলে এসেছে। লোকজন না পেয়ে ওরা গোসাইরচর গ্রামের চলে যায়। আমরাও আরেকটু দূরে ‘বোরো চক’ চলে আসি। এরপর আমরা চরের উত্তর দিক ধরে অগ্রসর হতে থাকি। আমাদের ধারণা ছিল, খাল ও পানি ডিঙিয়ে ওরা এত দূরে আসতে পারবে না। গোসাইরচর গ্রামের পূর্ব দিকের চরে একটি পাটখেতে বসে আছি। খেতে হাঁটুপানি। এখানে অনেক মানুষ লুকিয়ে আছে। আমাদের সমস্ত শরীর পানিতে ডোবানো।

হঠাৎ কোথা থেকে যেন আর্মিরা আমাদের সামনে চলে এলো। আমরা দাঁড়িয়ে গেলাম। পুরুষদের একসঙ্গে করে ওরা।  অনেক মেলিটারির মাঝে একজন সিভিল লোক ছিল। কালো প্যান্ট পড়া, হাতে ম্যাপ। লোকটি ম্যাপের দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটির পেছনে গিয়ে মেলিটারিরা দাঁড়িয়ে পড়ল। আমাদের বলল, ‘আগে বাড়ো।’ আর নারীদের বলল, ‘তুমলোক ঘর যাও, খানা পাকায়ে খাও।’ মহিলারা দাঁড়িয়েই থাকল। আমরা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছি। মেলিটারিরা আমাদের পেছনে। এর মধ্যে টাস টাস করে তিনটা গুলির আওয়াজ পেলাম। কিছুক্ষণ পর দেখি পানিতে কাত হয়ে পড়ে আছি। নয়ানগরের নারায়ণ চন্দ্র বর্মণ শুয়ে আছে। তার গায়ে গুলি লাগে নাই। আমার পিঠে গুলি লেগে বুক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। প্রচণ্ড রোদ্র। পিপাসায় কলিজা ফেটে যাচ্ছে। মাকে বলি, ‘মা, পানি দাও।’ মা দেখল সামনে সব ময়লা পানি। একটু দূরে গিয়ে মা তার কাপড়ের আঁচল ভিজিয়ে নিয়ে এলো। মা আঁচল চিপে চিপে আমার মুখে পানি দিল।

দুপুর হয়ে গেল। মা বলল, ‘এখানে থাকা ঠিক হবে না। জোয়ারে পানি আরও বেড়ে যাবে।’
আমি বললাম, ‘মা, আমি তো একটু পরে মরেই যাব, আমাকে টানাহেঁচড়া করে কোনো লাভ নেই। তুমি বাড়ি চলে যাও।’
মা বলল, ‘তুমি আমার ছেলে, তোমাকে রেখে আমি যেতে পারি! তুমি যদি মরেও যাও, তবু তোমাকে না নিয়ে বাড়ি যাবো না।’
মা আমাকে ধরে বসে। বদনার নল দিয়ে যেভাবে পানি বের হয়, আমার বুক থেকে সেভাবে রক্ত ঝরছে। মাথাটা এক চক্কর দিলো। আমার চোখে কোনো আলো নেই। আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না। কিছুক্ষণ পর দৃষ্টি ফিরে এলো। দূরে কয়েকজনকে হাঁটতে দেখা যাচ্ছে। কেউ বাড়ি যাচ্ছে। কেউ লোকজন খুঁজতে আসছে। এখন রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে গেছে। ব্যথা যন্ত্রণা নাই। বুকের ডান পাশটা আলগাতে পারছি না। মনে হচ্ছে পাঁচ মণ ওজনের পাথর চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে।

ফুলদী নদীর পাড় দিয়ে আবারও মেলিটারি আসছে। আমরা খাউল্লা বনে লুকিয়ে রইলাম। ওরা দক্ষিণ পাশ দিয়ে চলে গেলো। এর কিছুক্ষণ পর আমাদের সামনে দিয়ে কেউ একজন যাচ্ছে। মা সাহায্যের জন্য জোরে ডাকলেন। তিনি আসতেই আমরা তাকে চিনলাম, আধারমানিকের খালেক মাস্টার। সম্পর্কে আমার ভাগিনা। তিনি আর মা ধরাধরি করে আমাকে বাড়িতে নিয়ে গেলেন। গ্রামে কোনো লোক নাই। হালিম ভুইয়ার লাশ গোসাইরচর থেকে বাড়িতে আনা হয়েছে। পাটখেত থেকে আনা হয়েছে সুবিদ আলী ভুইয়া, তার শ্বশুরের লাশ। তার শ্যালক গুলিবিদ্ধ।

মা সারাদিন ভালোই ছিলেন। বাড়িতে এসেই তিনি অস্বাভাবিক হয়ে গেলেন। লোকজন মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। নয়ানগর গ্রামের হাবিব মোল্লাহ গুলিবিদ্ধদের চিকিৎসার জন্য নারায়ণগঞ্জে নেওয়ার উদ্যোগ নিলেন। ডুবো ডুবো বিকেল। নয়ানগরের ইসহাক মোল্লাহ, আফজাল প্রধান, বালুচরের মহব্বত আলী ভুইয়া ও আমাকে নিয়ে নৌকা চললো নারায়ণগঞ্জের দিকে। কলাগাছিয়ার সামনে যেতেই দেখি মেলিটারিদের অসংখ্য গানবোট। সামনে যাওয়ার অবস্থা নাই। নৌকা ঘুরিয়ে বাড়িতে চলে এলাম। পরদিন করিমখাঁ থেকে ছোট মামা মাহফুজ উল্লাহ সিকদার আমাকে নিতে এলেন। মামা আমাকে নিয়ে গেলেন রসুলপুর সরকারি হাসপাতালে। সেখানে আমাকে ইনজেকশন দেয়, ওষুধপত্র দেয়। এভাবে আরও পাঁচদিন ইনজেকশন নিতে হল। ডাক্তাররা বলল, আমি খুব সৌভাগ্যবান। আমার বুকের হাড়গোড়ে গুলি লাগেনি। ফাঁকা জায়গা দিয়ে বেরিয়ে গেছে। বেশ কয়েক মাস মামাবাড়ি ছিলাম। করিমখাঁ গ্রামে একজন প্রখ্যাত ওলি ছিলেন। তিনি বলতেন, এই গ্রামে কখনো আর্মিরা আসতে পারবে না। কোনো দিন তারা ওই গ্রামে যায়ও নি।
আগস্ট মাসে গ্রামে চলে আসলাম।

আমরা ৫-৬ জন যুবক থাকতাম শাহআলম ভুইয়ার বাংলোঘরে। আমাদের জন্য বাড়ির দক্ষিণ ঘাটে সব সময় একটি নৌকা বাঁধা থাকতো। ঘরে সবার জন্য একটি করে বৈঠা ছিল। মা আমার কাছে দেড়শ টাকা রাখতে দিলেন। কথা ছিল, ফের হামলা হলে আমরা যেন দ্রুত নৌকায় করে কোথাও পালিয়ে যাই। একদিন দুপুরে বাড়ি থেকে দেখলাম কালীপুরের কাছে পাকিস্তানিদের জাহাজে বোম্বিং হচ্ছে।

কিছুদিন পরে দেশটা স্বাধীন হয়ে গেল..

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ১৩ জুন ২০১৭

পড়ুন :
প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

তৃতীয় পর্ব : আবুল হোসেন ভুইয়া

***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments