ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮ | ০৯ : ২১ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ্ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ তৃতীয় পর্ব। শুনবো : আবুল হোসেন ভুইয়া, বাবা : আবদুল করিম ভুইয়া, মা : অলতন নেসা, গ্রাম : গোসাইরচর, পেশা : গেরস্থি। বয়স : ৬৭ বছর।

Abul Hossainআমার তখন ১৯-২০ বছর বয়স। যুদ্ধের বছর আমি ন্যাশনাল সার্ভিসে যোগদান করি। কিন্তু যুদ্ধ লেগে যাওয়ায় আমি পুরো ট্রেনিং করতে পারলাম না। গ্রামের বাড়িতে চলে এলাম। ৯ মে, ১৯৭১। তখন ভোর হয় হয়। হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পেলাম। বাবা, মা আর ভাইদের জাগালাম। আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে গ্রামে পূর্ব দিকের খাল পাড়ি দিয়ে একটা চরে গিয়ে উঠলাম। সেই চরে একটা পুকুর ছিল, সেখানে গিয়ে আত্মগোপন করে রইলাম। আমি জানতাম, ওরা সাঁতার জানে না, পানি ভয় পায়। কিন্তু না। কিছুক্ষণের মধ্যেই আর্মিরা আমাদের চারপাশ থেকে ঘেরাও করে ফেললো। পুকুরে অনেক লোক ছিল। এর মধ্যে ১৭ জন পুরুষ। বাকিরা নারী ও শিশু। পুরুষদের ধরে ধরে একসঙ্গে করল। শুরু করে দিল নানা প্রশ্ন —তুমি কি মুসলমান? কাকে ভোট দিছো, এইসব। এর মধ্যে কাউকে রাইফেলের বাঁট দিয়ে বাড়ি দেয়, লাথিও দেয়। আমি ওদের সব কথা বুঝি, কিন্তু কোনো উত্তর দিই না।

আমার গায়ে একটা আর্মির গেঞ্জি পড়া ছিল। গ্রামের মসজিদের পাশে আমাদের ১৭ জনকে নিয়ে আসে। সেখান থেকে আবার পল্টন সড়কের দিকে নিয়ে যায়। আমাদের সবাইকে লাইন করে দাঁড় করায়। আর্মিদের একজন বাঁশি ফুঁ দেয়। আরেকজন গুলি ছোড়ে। আমি ফুঁ শোনার সঙ্গে সঙ্গে সড়কের পাশের খালে ঝাঁপ দিই। পানির নিচে দম নিয়ে থাকার চেষ্টা করি। কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারি না। নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য মাথা উঁচাতেই ওরা আমাকে গুলি করলো। গুলি খেয়ে আমি খালের পাড়ে মাছের মতো কাত হয়ে রইলাম। আমার পুরো জ্ঞান আছে। চোখ বন্ধ করে আছি। ওরা ভাবছে, আমি মরে গেছি। কিছুক্ষণ পর চোখ মেলে দেখি, ওরা নাই। আমি সাঁতরে সামনের পাটখেতে গেলাম। সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। দাঁড়াতে পারছি না। পড়ে যাচ্ছি। অনেক পাটের পাতা ছিঁড়ি। পাতাগুলো দুই হাতে ডলে দলা করে ডান হাতের ক্ষত স্থানে ঢুকিয়ে দিই। রক্তের চাপে পাটের পাতা বেরিয়ে যায়।

দুপুর ঘনিয়ে আসে। ঘড়িতে তখন দেড়টা হবে। পাশের গ্রামের কয়েকজন লোক সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসে। তাদের দেখে আমি জোরে আওয়াজ করি। তারা আমাকে উদ্ধার করে ডাঙায় তোলে। দেখতে পাই আমার চারপাশে লাশ আর লাশ। শুধু আমাদের গ্রামের আবদুর রউফ সিকদার বেঁচে আছেন। তাঁর বুকে গুলি লেগেছে। লোকজন ধরাধরি করে আমাকে ও রউফ ভাইকে প্রধানেরচর গ্রামের একটি বাড়িতে নিয়ে যায়। আমাদের গরম দুধ খেতে দেওয়া হলো। রউফ ভাই দুধ খাচ্ছেন আর ছিদ্র দিয়ে দুধ গড়িয়ে পড়ছে। কিছুক্ষণ পর হেঁটে হেঁটে বাড়ির দিকে রওনা হই। পথে একজন আমার হাত গামছা দিয়ে বেঁধে দিলো। পরদিন সকালে রসুলপুর হাসপাতালে গিয়ে চিকিত্সা নিই।

সাক্ষাত্কার গ্রহণ : ২৬ মার্চ ২০১৭

পড়ুন :
প্রথম পর্ব   :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

দ্বিতীয় পর্ব : আবদুর রউফ সিকদার

***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

Comments

comments