ঢাকা, বৃহষ্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ | ০৮ : ৫০ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ্ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ দ্বিতীয় পর্ব। শুনবো : আবদুর রউফ সিকদার, পিতা : মোবারক আলী মাস্টার, মাতা : জমিলা বেগম, গ্রাম : গোসাইরচর, পেশা : অবসরপ্রাপ্ত পল্লী চিকিৎসক। বয়স : ৭৭ বছর এর কথা…

আবদুর রউফ সিকদার। ছবি : সাহাদাত পারভেজ

আবদুর রউফ সিকদার। ছবি : সাহাদাত পারভেজ

১৯৭১ সালের  ৯ মে। সুবেহ সাদেকের সময় পাকস্তানি বাহিনীর লঞ্চ এসে নদীর ঘাটে ভিড়ে। নদীর পাড় থেকেই তারা ব্রাশ ফায়ার শুরু করে। মুলি বাঁশ ফাড়লে যেমন আওয়াজ হয়, ঠিক সেই রকম শব্দ হচ্ছে। সব মানুষ পুব দিকে ছুটছে। কেউ কাঁধে বাচ্চা নিয়ে জানপ্রাণ নিয়ে দৌড়াচ্ছে। অনেকে গুলি খেয়ে পড়ে আছে। বাকিরা খালের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ছে চরে আশ্রয় নেওয়ার জন্য। মানুষ এমন হায়হুতাশ করছে, মনে হচ্ছে কেয়ামত হচ্ছে। আব্বা বয়স্ক মানুষ। তাই আমি, ছোট ভাই খালেক, হাবিব আর মোশাররফ আব্বাকে বাড়ির পাশের একটি জঙ্গলে রেখে আসলাম।

আমাদের গ্রামের আখন্দ বাড়ির সামনে একটা খাল। খালটা পেরুলেই একটা বিশাল চর। চরে একটা পুকুর। পুকুরপাড়ে একটি নলখাগড়ার বন। সেখানেই পরিবার-পরিজন নিয়ে আমরা লুকিয়ে আছি। এখানে প্রায় ৫০ জন নর-নারী ও শিশু। দুইজন হিন্দু নারী ছিল। ওদের কপালে সিঁদুর ছিল। আমরা বলার পর তারা সিঁদুর উঠিয়ে ফেললো। আমাদের ধারণা ছিল, ওরা খাল সাঁতরে এখানে আসবে না। আমাদের বসিয়ে দিয়ে খালেক আর মোশাররফ বাড়ির দিকে চলে গেলো। নলখাগড়ার ফাঁক দিয়ে দেখি আর্মিরা আখন্দ বাড়িতে ঘোরাঘুরি করছে। কয়েকটি জেলে নৌকা লোকজন পার করে দিচ্ছে। দুই-তিনজন দৌড়ের মধ্যে গুলি খেয়ে পড়ে গেলো। চরে হাঁটু পানি। কোথাও কোথাও কোমর সমান। মানুষ পাট কিংবা ধানখেতে মাথা জাগিয়ে শুয়ে আছে। আমরা পশ্চিম দিকে তাকিয়ে আছি। ওরা যে বালুচর থেকে লোকজন মারতে মারতে আমাদের দিকে আসছে সেটা খেয়াল করি নাই। পাটখেতের কারণে পেছনের কিছু দেখাও যায় না। হঠাৎ পানিতে ঝপঝপ আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমাদের মাত্র ২০-২৫ হাত দূরে আর্মি। দেখেই আমরা দাঁড়িয়ে আত্মসমর্পণ করলাম।

আমাদের সঙ্গে জহিরুল হক মাস্টারের বাবা সায়েদ আলী ভুঞা ছিলেন। উনি আর্মিদের হাতে-পায়ে ধরে খুব অনুনয় করে বলছেন, ‘স্যার, আমি বুড়ো মানুষ, শর্ষীনার মুরিদান; আমাকে ছাইড়া দেন।’ আমি বললাম, ‘উনি বয়স্ক মানুষ। উনাকে মাইরেন না।’ বলার সঙ্গে সঙ্গে আমাকে পিঠের মধ্যে রাইফেল দিয়ে একটা বাড়ি দিলো। আর্মিরা সায়েদ আলী ভুঞাকে ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দিলো। উনি গড়িয়ে গড়িয়ে নিচের দিকে চলে যাচ্ছেন। এর মধ্যেই ওরা উনার মাথা বরাবর গুলি করলো। উনি বুরবুর করে পানিতে তলিয়ে গেলেন। এরপর আমাদের দল বেঁধে গোসাইরচর মসজিদের কাছে নিয়ে আসা হলো। আমার কোলে ছিল মেজো মেয়ে ডেইজি। আমার শ্বশুর রেহান উদ্দিন আখন্দ হাতে গুলি খেয়ে মসজিদের পেছনের একটা জঙ্গলে পালিয়ে ছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন নজর আলী ভুইয়া। আমাদের এই অবস্থা দেখে তিনি আর্মিদের কাছে চলে আসেন। নজর আলী তাকে বাধা দিয়ে রাখতে পারেন না। তিনি ভাবলেন, মেয়ে, মেয়েজামাই, নাতি-নাতনিদের যদি মেরে ফেলে, তাহলে আর তার বেঁচে থেকে লাভ কী! তাই তিনি আর্মিদের সামনে এসে হাত জোড় করে আমাদের ছেড়ে দিতে বললেন। সঙ্গে সঙ্গে আর্মিরা তাকে গুলি করলো। উনি মাটিতে পড়ে গেলেন।

এরপর আর্মিরা সব বন্দি নারীকে মসজিদের উত্তর পাশের একটি বীজাগারে নিয়ে গেলো। আর আমাদের নিয়ে গেলো পল্টন সড়কের কাছ। সেখানে আমাদের ১৭ জনকে দাঁড় করিয়ে ফায়ার করলো। প্রথম ফায়ারেই আমার কান বন্ধ হয়ে গেলো। আমি মাথায় হাত দিয়ে শুয়ে আছি। আমার যে গুলি লাগছে আমি বুঝি নাই। কিছুক্ষণ পর দেখি আমার হাত নিচের দিকে পড়ে যাচ্ছে। তখন বুঝতে পারি আমার গুলি লেগেছে। আমার বুকে গুলি লেগে পিঠ দিয়ে বের হয়েছে। এরপর আমার চোখ বন্ধ হয়ে গেলো। লালায় আমার মুখ আঠা হয়ে গেলো। একসময় মানুষের কণ্ঠ শুনতে পেলাম। চোখ খুলে দেখি আমাদের গ্রামের রমজান, প্রধানেরচরের আলী মিয়া ও কাদিরসহ কয়েকজন আমাদের উদ্ধার করতে এসেছে। আমার সামনের সবাই মরা! ওইদিন আমার শ্বশুর ছাড়াও ওরা আমার মেজো চাচা আবদুর রহমান সিকদার ও ছোট ভাই মোয়জ্জেম হোসেনকে নির্মমভাবে হত্যা করে। মোয়াজ্জেম আমার সঙ্গেই ছিল।

ওইদিন বিকেলে আমাকে রসুলপুর দাতব্য চিকিৎসালয়ে নিয়ে তুলো ঢুকিয়ে ব্যান্ডেজ করা হলো। কাশি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যান্ডেজ উড়ে গেলো। এরপর আমার এক আত্মীয় মোসলেম মিয়াজী তাদের বাড়ি থেকে একটা নতুন ধুতি নিয়ে আসলেন। সেটা দিয়ে বেঁধে দেওয়া হলো। রাতে রসুলপুরে তাদের বাড়িতেই থাকলাম। আমাকে দেখার জন্য শতাধিক লোক জড়ো হয়ে গেছে। পুরো শরীরে বাতাস ঢুকে গেছে। হাতে চাপ দিলে ফুরফুর শব্দ হতো। গায়ে এক ফোঁটা রক্ত ছিল না। পরেরদিন নৌকায় করে আমাকে নারায়ণগঞ্জে, সেখান থেকে ট্যাক্সি ক্যাবে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানকার দ্বিতীয় তলার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ১৪ নম্বর বেডে ছিলাম টানা পাঁচ মাস।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ২৬ মার্চ ২০১৭

প্রথম পর্ব  পড়ুন :  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী

 

 ***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 

Comments

comments