ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | ০৪ : ১২ মিনিট

গজারিয়ার গণহত্যা নিয়ে স্বপ্ন ’৭১ এ ্ধারাবাহিকভাবে আলোকচিত্রী ও গবেষক সাহাদাত পারভেজ লিখছেন গজারিয়া গণহত্যা : প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান। আজ প্রথম পর্ব।  মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী, পিতা : আবদুল লতিফ চৌধুরী (শহীদ), মাতা : খোদেজা বানু, গ্রাম : গজারিয়া, পদবি : ফিনলে চা লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক। বয়স : ৬৭ বছর।

ছবি : লেখক

মোরশেদ আহমেদ চৌধুরী। ছবি : লেখক

আমরা ঢাকার গ্লোরিয়ায় থাকতাম। সাধনা ঔষধালয়ের পাশে ছিল আমাদের বাড়ি। ৪ এপ্রিল রাতের অন্ধকারে সাধনা ঔষধালয়ের স্বত্বাধিকারী যোগেশচন্দ্র ঘোষকে পাক আর্মিরা হত্যা করে। গ্লোরিয়ায় লুত্ফর রহমানের বাড়িতে আওয়ামী লীগের একটি ঘাঁটি ছিল। ওই বাড়িটি পাকবাহিনী রেইড করে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। আমার মেজোভাই জহুরুল হক চৌধুরী যে বাড়িতে ভাড়া থাকতেন, সেই বাড়িও রেইড হয়েছে। হিন্দুবাড়ি রেইড করার পাশাপাশি কিছু মুসলমান বাড়িও রেইড হয়েছে। নন-বেঙ্গলিরা কিছু কিছু বাড়ি দখল করেছে। এসব কারণে আমাদের পরিবারও ভীতসন্ত্রস্ত ছিল। বাবা বললেন, ‘আমাদের বাড়িও যে কোনো সময় রেইড হতে পারে।’ মা বললেন, ‘এখন আর ঢাকায় থাকা যাবে না। গ্রামে চলে যাবো। গজারিয়া বরং নিরাপদ।’ আমার তিন ভাই আমিনুল হক চৌধুরী, ফরিদ চৌধুরী ও ইমরুল চৌধুরী তখন পেশাগত কারণে পাকিস্তানে ছিলেন। তাদের পাঠানো টাকায় আমাদের সংসার চলতো। যুদ্ধের কারণে সেই টাকা আসাও বন্ধ হয়ে গেলো। টাকা-পয়সাও নেই, নিরাপত্তাও নেই। তাই বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন আমাদের নিয়ে তিনি গ্রামে চলে যাবেন। বাবা বললেন, ‘সেখানে জমিজমা আছে, একটা ব্যবস্থা হবেই। তাছাড়া গজারিয়া ঢাকার থেকে নিরাপদ। সেখানে অন্তত আর্মি নেই।’ মেজোভাই অবশ্য বাবাকে বারণ করেছিলেন। বাবা শোনেননি।

এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে আমরা গজারিয়ার উদ্দেশে রওনা হই। প্রথমে ট্যাক্সিতে করে নারায়ণগঞ্জ। লঞ্চ চলাচল বন্ধ বলে নারায়ণগঞ্জ থেকে নৌকায় করে গজারিয়া গ্রামে পৌঁছি। বাবার তখন ৭৫ বছরের বেশি বয়স। তাছাড়া তিনি খুবই অসুস্থ। ঠিকমতো হাঁটতে পারেন না। কিন্তু নিজের গাঁয়ের বাতাস পেয়ে তিনি যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। তিনি নৌকা থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে বাড়ি গেলেন। ১৯৭১ সালে আমার বয়স ২১ বছর। আমি ভাইবোনদের সবার ছোট। আমি তখন জগন্নাথ কলেজে বিএ পড়ি। কিন্তু তখন জগন্নাথ কলেজ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ হয়ে যাওয়ায় আমি চলে যাই নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজে। কয়েক মাস আগে আমার অ্যাংগেইজমেন্ট হয়। কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে বউ ওঠানো হয়নি। আমি গ্রামে আসবো শুনে সেও আমাদের সঙ্গে চলে এলো। আমাদের বংশের আরও কয়েকটি পরিবারও গ্রামে চলে এলো। গজারিয়ায় আমরা ভালোই ছিলাম। আমাদের বাড়ির পাশেই গজারিয়া থানা। থানায় একটি রেডিও ছিল। থানার সামনে বসে আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতাম। যুবক বয়সী ওসি সাহেব আমাদের ডেকে বসতে দিতেন। জ্যোত্স্না রাতে প্রবল বাতাসে থানার মাঠে আমাদের আড্ডা জমতো। বিকেলে আলো যখন অম্লান হয়ে আসে, তখন কোথা থেকে যেন ঝাঁকে ঝাঁকে বক এসে বসে বাড়ির পাশের বাঁশঝাড়ে। আমরা মুগ্ধতায় দেখতাম সে সব। খুব আনন্দে কাটছিল দিন। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিদিন স্থায়ী হলে না!

৯ মে ভোরে আর্মি এলো। আজানের পরপরই হানাদারবাহিনী থানা ঘিরে ফেললো। এর আগেই নদীর পাড় ধরে যখন গুলি করতে করতে ওরা এগোচ্ছিল, তখন ‘আর্মি এসেছে’ ‘আর্মি এসেছে’ শুনতে পেলাম। লোকজন দৌড়াদৌড়ি করছে। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড়ে আমাদের মসজিদের কাছে গেলাম। হঠাৎ মনে হলো, বাবা তো অসুস্থ। আমি আবার ঘরে গেলাম। বাবা তখন মশারির নিচে শুয়ে ছিলেন। তাকে জাগালাম। বললাম, ‘বাবা আর্মি চলে এসেছে। আমাদের এখনই পালাতে হবে।’ বাবা ঠিকমতো হাঁটতে পারছিলেন না। বাবাকে ধরে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আখড়াবাড়ির কাছে যেতেই আমরা আর্মিদের ব্যারিকেডের মধ্যে পড়ি। ততক্ষণে অনেক লোক ব্রিজ পার হয়ে নিরাপদে চলে গেছে। আখড়াবাড়ির পাশের তিলখেতেই আমরা লুকানোর চেষ্টা করি। আর্মিরা আমাদের সামনে এসে বলে, স্ট্যান্ড আপ। আমরা দাঁড়িয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাচ্চা বয়সী একটা আর্মি অফিসার বাবাকে গুলি করে দিলো। বাবার বুকের বাঁ দিকে গুলি লাগলো। বাবা সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে পড়ে গেলেন। আরও কয়েকটি গুলি চললো। গুলির আওয়াজ শুনেই আমি পড়ে গেলাম। আমি তখন প্রায় অচেতন। অনেকক্ষণ সুনসান নীরবতা। এরপর কে একজন বললো, ‘আদমি সব হালাক কর দিয়া।’ শুনে আরেকজন বললো, ‘ঠিক হায়, তুম প্রসিড করো।’ ওরা নিশ্চিত যে, আমি মরে গেছি। আমাকে ডিঙিয়ে ওরা সামনের দিকে চলে গেলো। অনেকক্ষণ পর কাকের ডাক শুনতে পেলাম। ভাবলাম, ওরা বোধ হয় চলে গেছে। চোখ খুলে উঠে দাঁড়ালাম। দেখলাম, দূরে তিলখেতের আল ধরে ওরা চলে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি মাথা নিচু করে বসার চেষ্টা করলাম। কারণ আমাকে দেখলে ওরা আবার ব্যাক করবে। ইতোমধ্যে ৪০-৪৫ মিনিট কেটে গেছে। আমার সামনে বাবার লাশ পড়ে আছে। পাশে আরও কয়েকটা লাশ। আমার স্ত্রী ও চাচাতো ভাইয়ের বউ পাশেই তিলখেতে লুকিয়ে আছে। তাদের চেহারায় আতঙ্কের ছাপ। আমাকে দেখতে পেয়ে তারা দৌড়ে এসে বললো, ‘আরে, তুমি মর নাই!’

রক্তে আমার জামা ভিজে গেছে। ভাবলাম বাবার গায়ের রক্ত। কিন্তু শার্টের বোতাম খুলে দেখি আমার পেট ফুটো হয়ে গেছে। ছিদ্র দিয়ে বুদবুদ করে পানি বের হচ্ছে। সেই সঙ্গে রক্ত। তখন আমি ভয় পেয়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে আমার গলা শুকিয়ে গেলো। এর মধ্যে পাড়ার অনেক লোকজন এলো। কয়েকজনকে বললাম, ‘আমাকে বাড়ি নিয়ে যান।’ আমার কথায় কান না দিয়ে ওরা বাবার পাঞ্জাবির পকেট হাতিয়ে টাকা পয়সা নিয়ে নিলো। হাতঘড়ি নিলো। পাশেই পড়ে ছিল বাবার চশমা। সেটাও নিয়ে গেলো। আমার স্ত্রীর সোনার গয়না খুলে নিলো।

অনেকক্ষণ পর আমাদের বাড়ির মসজিদের ইমাম সাহেব এলেন। আমাদের এ অবস্থা দেখে তিনি আঁতকে উঠলেন। বললেন, ‘আরে, আপনারা এখানে!’ আমি বললাম, ‘বাবাকে ওরা মেরে ফেলেছে। আমার গায়েও গুলি লেগেছে।’ ইমাম সাহেব বললেন, হাঁটতে পারবেন? আমি বললাম, না। উনি আরেকজনকে সঙ্গে করে নিয়ে এলেন। লোকটির বাড়ি অন্য এলাকায়। চাকরিসূত্রে গজারিয়ায় থাকেন। তারা আমাকে হাতে পায়ে ধরে, পাজাকোলা করে বাঁশঝাঁড়ের ভেতর দিয়ে বাড়িতে নিয়ে এলেন। বাবার লাশ তিলখেতেই পড়ে ছিল। তারা আমাকে ঘরে ঢুকিয়ে বললেন, ‘আপনি শুয়ে থাকেন।’ ততক্ষণে ঘর রক্তে ভরে গেছে। তারা যখন আমার মাথায় পানি ঢালছিলেন, তখন আবার রব উঠলো, আর্মি আসতাছে, আর্মি আসতাছে। তখন তারা আমাকে রেখেই পালিয়ে গেলেন। মা, বউ কোথায় গিয়ে পালালো জানি না। এরপর আরেকজন লোক এলেন। বললেন, তার বাড়ি কুমিলস্নায়। চাকরি করেন ফ্যামিলি প্লানিং অফিসে। আমি বললাম, ‘আপনি চলে যান। আপনাকে ওরা মেরে ফেলবে। ওরা আমার বাবাকেও মেরে ফেলেছে।’ উনি চমকে গিয়ে বললেন, ‘তাই নাকি, চৌধুরী সাহেব মারা গেছেন? তার লাশ কোথায়?’ আমি বললাম, তিলখেতে। তিনি বললেন, ‘আমি বুড়া মানুষ, মুখে দাড়ি। আমারে আর কে মারবে?’

বেলা আড়াইটার দিকে আর্মিরা ব্যাক করলো। কিছুক্ষণ পর তারা আমাদের ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলো। আমাকে দেখে বললো, ‘তুম কিয়া করতা হায়? বাইর হো।’ আমি কীভাবে যে ঘর থেকে বের হলাম, নিজেও জানি না। তারপর রান্নাঘরে গিয়ে কাঁথামুড়ি দিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে রইলাম। তখন ওরা আমার কী হয়েছে জানতে চাইলো। আমি বললাম, গুলি লেগেছে। শুনে ওদের একজন রেগে গিয়ে বললো, ‘গুলি লাগছে? তুম তো শালা মুক্তি হায়।’ আমি বললাম, না। সে বললো, ‘তাহলে গুলি লাগলো কেমনে?’ এরপর ওরা আমার চুলের মুঠি ধরে ঝাঁকালো, চুল ছিঁড়লো। বুট দিয়ে লাথি মারলো। বারবার জানতে চাইলো, আমি কী করি? আমি বললাম, লঞ্চে কাজ করি। সন্দেহ নিয়ে বললো, ‘তুম তো স্টুডেন্ট হায়।’ এর মধ্যে লাথি মারা ও চুল টানা চলছেই। কোথায় গুলি লেগেছে জানতে চাইলো। আমি বললাম, পেটে। তখন সেই বুড়ো লোকটা আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তার কাছে জানতে চাইলো, সে এখানে কেন? লোকটি জানালেন, তিনি এখানে চাকরি করেন। ওরা জানতে চাইলো, তিনি হিন্দু না মুসলমান? তিনি বললেন, ‘আমি মুসলমান। দেখছেন না দাড়ি আছে?’ ওরা তাকে কলমা পড়তে বললো। তিনি ভয়ে কলমা ভুলে গেলেন!

এরপর আরেকটা ট্রুপ এলো। একজনের মাথায় ২০-২৫টা ট্রানজিস্টর, ওয়্যারলেসের মতো নানা যন্ত্র দড়ি দিয়ে বাঁধা। সে অন্য এক আর্মির কাছে জানতে চাইলো, কেয়া হুয়া? সেই আর্মি জানালো, আমার গুলি লেগেছে। এর মধ্যে আরেক আর্মি আমার দিকে গুলি তাক করে বললো, এই খাড়াও খাড়াও। আমি দাঁড়াতে পারছিলাম না। ওদের সঙ্গে এক রাজাকার ছিল। ওকে আমি চিনতাম। নন-বেঙ্গলি, নারায়ণগঞ্জে তার বাড়ি। তোলারাম কলেজে পড়ার সময় তার সঙ্গে একবার মারামারি করেছিলাম। ভাবলাম, ছেলেটা সবকিছু বলে দেবে; কিন্তু সে কিছুই বললো না। সে-ই বরং গুলি করতে দিলো না। সে বললো, ‘খামাখা কেন গুলি খরচা করছো? যেভাবে রক্ত পড়ছে, তাতে ও এমনিতেই মরে যাবে। শালাকে ধুঁকে ধুঁকে মরতে দাও। বাদ দাও, চলো।’ ছেলেটি আমাকে বললো, ‘তুমি ঘরে চলে যাও।’ আমি হেঁটে ঘরে চলে এলাম। সবকিছু যেন মিরাকেল। আমি যেন এক অলৌকিক ঘটনার মধ্য দিয়ে বেঁচে গেলাম। আমাকে তাক করা গুলিতেই ওই বৃদ্ধকে মেরে চলে গেলো ওরা। ওরা যতবার গুলি করেছে, লোকটা ততবার বাবাগো মাগো বলে চিত্কার করেছে। একটি গুলি খেয়ে যদি চুপ করে পড়ে থাকতেন, তাহলে আমার ধারণা হয়তো লোকটি বেঁচে যেতেন।

আমাদের পাশের বাড়ির মহানন্দ কাকার বাড়ি লুট হচ্ছে। আমি ঘরের ভেতর থেকে দরজা ভাঙার আওয়াজ শুনছি। আশপাশের মুসলমান বাড়িও লুট হচ্ছে। রাতে লোকজন এলো। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মা-ও এলেন। শুনলাম বাবাকে আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। সারা রাত রক্তবমি হলো। মনে হলো, রাত পোহানোর আগেই মারা যাবো। পরেরদিন সকালে আমার বড় বোন সুলতানা চৌধুরী, বোনজামাই মোজাফ্ফর আহমেদ ঢালীসহ অনেক আত্মীয়স্বজন এলেন। বিকেলে আমাকে সুলতানা আপার শ্বশুরবাড়ি শ্রীনগর গ্রামে নিয়ে যাওয়া হলো। যাওয়ার আগে মুর্দারের খাটিয়ায় বিছানা করা হলো। মা বললেন, আমি ওকে খাটিয়ায় শোয়াবো না। তারপর বাঁশের সঙ্গে টিন লাগিয়ে আমাকে তার ওপর শোয়ানো হলো। ফুলদী নদী পার হয়ে রসুলপুর ঘাটে নৌকা থেকে নামানোর সময় টিন খুলে আমি গড়িয়ে পড়ে গেলাম। সবাই ভাবলো, এবার বোধহয় আমি শেষ! সন্ধ্যারাতে শ্রীনগর পৌঁছলাম। ওই বাড়ির সবাই সারা রাত সেবা করেছেন। সবাই সিদ্ধান্ত নিলেন, আমাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। রফিক নামে ওদের এক আত্মীয় ছিল। তার গাড়ি ছিল। ভোরে রফিক ভাইয়ের গাড়িতে করে আমাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো।

হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর আমার রক্তের প্রয়োজন হলো। আমার স্ত্রীর মামা ডা. মতিউর রহমান ছিলেন প্যাথলজি বিভাগের প্রধান। তিনি বললেন, শুধু আর্মি ইনজুরি ছাড়া কাউকে রক্ত দেওয়া নিষেধ। উনি বহু কষ্টে দুই ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করলেন। আমার আরও রক্তের দরকার ছিল। তিনি ম্যানেজ করতে পারেন নাই। রক্তের অভাবে আমি সাদা হয়ে গিয়েছিলাম। গুলি আমার পেটের সামনের দিক ফুঁড়ে পেছনে মেরুদন্ডের হাড়ের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেছে। সামান্য ইনজুরি। পেটের ভেতর কোথাও ছিঁড়ে নাই। নাড়িভুঁড়ির ফাঁক দিয়ে পেছনের দুই হাড়ের মাঝখান দিয়ে গুলি বেরিয়ে গেছে। হাড়ে গুলি লাগলে হাড় ভেঙে যেত। ঘটনার রাতে যে রক্তবমি হয়েছে, সেটাই নাকি আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।

প্রতিদিন সকালে ইন্টার্নি ডাক্তারদের সঙ্গে নিয়ে আমাদের ওয়ার্ডে রাউন্ড দিতেন প্রফেসর ডা. আকরাম। আমার ইনজুরি দেখিয়ে ফিতা মেপে তিনি বলতেন, ‘দেখো, এই রোগীটা দেখো, আরেকটু এদিক-সেদিক হলে ওর নাড় ছিঁড়ে যেত। তখন ওর ডাইজেস্টে সমস্যা হতো। অথবা রক্তপাত হতো।’ আমার নাকি নাকের ভেতর পাইপ ঢুকিয়ে রক্ত বের করা হয়েছিল। ভেতরে প্রচুর রক্ত জমে ছিল। ডাক্তার এন্টিবায়োটিক দিয়েছিলেন। সারাক্ষণ শুয়ে থাকতে হতো। শুয়ে থাকতে থাকতে আমার পিঠে ঘা হয়ে গিয়েছিল। গোসাইরচর গ্রামের রউফ ভাই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তিনিও সেদিন বুকে গুলি খেয়েছিলেন। তিনি প্রতিদিন আমার কাছে আসতেন। ২৮ দিন হাসপাতালে ছিলাম। এরই মধ্যে পাকিস্তান থেকে আমার বড় ভাইয়েরা এলেন। আমি ছিলাম ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ২৭ নম্বর বেডে।

সুস্থ হওয়ার পর রিলিজ নেব, এমন সময় আরেকটা সমস্যা দেখা দিলো। রিলিজ প্রসঙ্গ তুলতেই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানালেন, ‘বুলেট ইনজুরির রোগী রিলিজ করা যাবে না। ইনজুরি যুবক এবং ছাত্র। তাই আর্মিতে রিপোর্ট হয়ে গেছে। ওরা বিষয়টি তদন্ত করার পর রিলিজের বিষয়টি দেখা হবে।’ শুনে তো আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার অবস্থা। আমার বোনজামাই আবুল বাশারের বন্ধু নুরুল ইসলাম অনু তখন গভর্নর টিক্কা খানের এডিসি। দুলাভাই অনু ভাইয়ের কাছে গেলেন। আমার রিলিজের ব্যাপারে তার সাহায্য চাইলেন। তিনি বললেন, ‘আমি কোনো চিঠিপত্র দিতে পারবো না। আমি এমনিতেই বাঙালি কর্মকর্তা। কবে যেন আমাকে পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি করে দেয়।’ আমার মা অনেক কান্নাকাটি করলেন। দুলাভাই অনেক অনুরোধ করলেন। শেষে অনু ভাই বললেন, ‘ঠিক আছে, একটা কাজ করতে পারি। আমি হাসপাতালে টেলিফোন করে দেবো, বলবো এই রোগী আমার পরিচিত। আমি এর দায়িত্ব নিলাম। ওকে ছেড়ে দিন। আমি সকাল ১০টার দিকে টেলিফোন করবো। তোমরা দ্রুত ওকে নিয়ে সরে পড়বে।’

পরেরদিন দুলাভাই ও অন্য আত্মীয়স্বজন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল অফিসে গিয়ে জানতে চাইলেন, টিক্কা খান সাহেবের অফিস থেকে কোনো টেলিফোন এসেছিল কি না। অফিসার বললেন, হ্যাঁ। তারপর তিনি তার এক স্টাফকে বললেন, ‘২৭ নম্বর বেডের রোগী টিক্কা খানের এডিসি সাহেবের। কোনো অসুবিধা নেই, তুমি রিপোর্ট দিয়ে ছেড়ে দাও।’ আমরা এক মুহূর্তও দেরি করিনি। তাড়াতাড়ি বাসায় চলে এসেছি। এরপর আমার খোঁজে কেউ বাসায় এলে বলা হতো আমি হাসপাতালে আছি। একদিন একজন এসে বললেন, ‘উনি তো হাসপাতালে নেই। রিলিজ হয়ে চলে এসেছেন। ওনার নামে একটি ইন্টারোগেশনের রিপোর্ট আছে। উনাকে খুব দরকার।’ এর মধ্যে আমার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা হয়ে গেলো। আমি তখন আমাদের গ্লোরিয়ার বাসার ছাদের চিলেকোঠায় ছিলাম। ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত আমি সেখানেই অন্তরীণ ছিলাম। বিজয়ের দিনে চিলেকোঠায় বসেই পেস্ননের ডগফাইট দেখি।

শুনেছি আমার চাচা গজনবী আহমেদ চৌধুরী খোকা, শামসুদ্দীন আহমেদ চৌধুরী শ্যামসহ আরও কয়েকজন মিলে পাক আর্মিদের কাছে একাধিকবার চিঠি পাঠান। তারা আর্মিদের জানিয়েছিলেন, এই এলাকায় অনেক হিন্দু ও মুক্তিবাহিনী আছে। তাদের জন্য আমাদের এখনো শুনতে হয় আমরা নাকি খবর দিয়ে আর্মি এনেছি। এই কলঙ্কের সঙ্গে আমাদের চৌধুরী পরিবারের নামও জড়িয়ে গেছে। তাদের কলঙ্কের বোঝা এখনো আমাদের বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। অথচ বংশ এক হলেও আমরা ছিলাম তাদের বিপরীত মতাদর্শী। যার কারণে আমার বাবাকে প্রাণ দিতে হয়েছে। নিজেও গুলি খেয়েছি। গজারিয়ার গণহত্যার পরে আমাদের চাচাতো ভাই আবদুল গফুর চৌধুরী শান্তি কমিটি গঠন করেন। যুদ্ধের সময় তিনি শান্তি কমিটির আহ্বায়ক হন। যুদ্ধের পর তাকেও নানা জায়গায় পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে।

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : ১০ এপ্রিল ২০১৭

***স্বপ্ন ’৭১ প্রকাশিত লেখা, ছবি, কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার দণ্ডনীয় অপরাধ। অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলে কর্তৃপক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 

Comments

comments