ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮ | ০৪ : ১৭ মিনিট

Rohiggaবর্তমান মিয়ানমারের রোহিঙ্গা (আরাকানের পুরনো নাম) এলাকায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বসবাস। রাখাইন প্রদেশের উত্তর অংশে বাঙালি, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। তাদের কথ্য ভাষায় চট্টগ্রামের স্থানীয় উচ্চারণের প্রভাব রয়েছে। উর্দু, হিন্দি, আরবি শব্দও রয়েছে। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর অন্যদিকে রোহিঙ্গা মুসলিম।

যেভাবে এলো রোহিঙ্গা শব্দটি
বহু প্রচলিত ‘রহম’ শব্দ থেকেই রোহিঙ্গা শব্দের উৎপত্তি। কিন্তু তৎকালিন সেখানকার রাজসভার বাংলা সাহিত্যের লেখকরা ঐ রাজ্যকে রোসাং বা রোসাঙ্গ রাজ্য হিসাবে উল্লে্খ্য করেন। সেই থেকে ধারণা করা হয় রোসাং বা রোসাংগ থেকেও এই রোহিঙ্গা শব্দের আবির্ভাব হতে পারে। ধারণা করা হয়, তখনকার সময় আরাকানে অবস্থানরত ডাচ অধিবাসিদের সন্তান-সন্ততি যাদের তারা বাধ্য হয়ে আরাকানে রেখে যেত তারাই মুসলমান হয়ে যেত, আবার কখনো কখনো তারা চলে যাওয়ার সময় বড় বড় মটকায় করে তাদের স্ত্রী-পুত্রদের তারা লুকিয়ে আরাকান থেকে নিয়ে যেত ডাচ এ। তাহলে বলা যেতে পারে, ইসলামই ছিলো তৎকালীন আরাকানের সমাজ জীবনে মূল প্রভাবক।

মহাকবি আলাওল ‘পদ্মাবতী’ কাব্যে রোসাঙ্গের জনগোষ্ঠীর একটি পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিয়েছেন এভাবে, ‘নানাদেশী নানা লোক শুনিয়া রোসাঙ্গ ভোগ আইসন্ত নৃপ ছায়াতলে। আরবী, মিশরী, সামী, তুর্কী, হাবশী ও রুমী, খোরসানী, উজবেগী সকল। লাহোরী, মুলতানী, সিন্ধি, কাশ্মীরী, দক্ষিণী, হিন্দি, কামরূপী আর বঙ্গদেশী। বহু শেখ, সৈয়দযাদা, মোগল, পাঠান যুদ্ধা রাজপুত হিন্দু নানাজাতি।’ রোহিঙ্গারাই ইতিহাস প্রসিদ্ধ রোসাঙ্গ সভ্যতার বহনকারি। তবে সম্পূর্ন ইতিহাস নানা জাতির সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে এই রোহিঙ্গা জাতি।

ভাষা
মায়ানমারের আরাকান রাজ্যের (রাখাইন) রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আধুনিক লিখিত ভাষাই হল রোহিঙ্গা ভাষা। এটি ইন্দো-ইউরোপীয়ান ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত যার সঙ্গে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার মিল রয়েছে।

পরিচয়হীনতার শুরু
যদিও বলা হয় ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহিঙ্গা স্বাধীন রাজ্য ছিল কিন্তু মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করার পর বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয়। আর ইংরেজ শাসনামলে শাসকরা মিয়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করে যার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা অর্জন করার পর বহুতান্ত্রিক বা বহুমাত্রিক দেশ হিসেবেই রাজনৈতিক ইতিহাসের শুরু হয়েছিল কিন্তু ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয় তারপর থেকেই শুরু হয় বিপত্তি। সামরিক শাসক তাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার করা হতে থাকে। নামাজ আদায়ে বাধা দেওয়া হয়। হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা এ ছাড়াও আছে আরো বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা যেমন বাধ্যতামুলক শ্রমে নিয়জিত করা, বিয়ে করার বাধা, জাতিগত পরিচয়হীনতা, সন্তানের জন্মনিবন্ধন এ বাধাসহ আরো অনেক। মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের অনেকেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে ‘কালা’ নামে অভিহিত করেন। এ নামকরনের প্রকাশ পায় তাদের রোহিংগাদের প্রতি সীমাহীন ঘৃণা ও অবজ্ঞা।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বলা হয় ‘বিশ্বের সবচেয়ে কম প্রত্যাশিত জনপদ’ এবং ‘বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত সংখ্যালঘু’। ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী রোহিগা জনগোষ্ঠী তাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত হয়। এর ফলে তারা সরকারি অনুমতি ছাড়া ভ্রমণ করতে পারে না, জমির মালিক হতে পারে না, দুইটির বেশি সন্তান না নেওয়ার অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হয় এছারাও আরও অনেক নিগ্রহনের স্বীকার হয়। রোহিঙ্গাদের চলাচলের স্বাধীনতা ভীষণভাবে নিয়ণ্ত্রিত এবং তাদের অধিকাংশের মায়ানমার এর নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়েছে। তাদের উপর বিভিন্ন রকম অন্যায় ও অবৈধ কর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাদের জমি জবর-দখল করা, জোর-পূর্বক উচ্ছেদ করা, ঘর-বাড়ি ধ্বংস করা যেন নিত্ত নৈমত্তিক ব্যাপার। রোহিংগা এবং রাষ্ট্রহীন মানুষ/ নিজ দেশে পরবাসীঃ রোহিংগা মুসলিমগন রাখাইন প্রদেশ এর উত্তর দিকে অবস্থা করে যা বাংলাদেশের সীমানা দ্বারা বেষ্টিত। ১৯৪৮ সালে মায়ানমার ব্রিটিশ শাসন থেমে মুক্ত হবার পর ১৯৬২, ১৯৭৭ সালের করা বিভিন্ন আইন ও প্রোগ্রাম এর মাধ্যমে রোহিংগা মুসলিমদের সার্বিক নাগ্রিক অমনুষ্য অধিকার কেড়ে নেওয়া হও এবং সব থেকে মারাত্মক ভাবে যা ছিল তা হলো রোহিংগাদের মায়ানমার এর নাগরিক নয় বরং মায়ানমার এ আগত বাংগালী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

যার ফলশ্রুতিতে রোহিঙ্গা নিধন, ধর্ষন, খুন, মসজিদ ধ্বংস চলতে থাকে অবিরাম এবং এর যের ধরে ১৯৭৮ সালে প্রায় দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হয়। মিয়ামনামারে ১৯৮২ সাথে করা নাগরিক আইন আনুযায়ী তিন ধরনের নাগরিক এর কথা বলা হয় কিন্তু শত বছরের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও রোহিংগাদের কোন ভাগেই রাখা হয়নি যার দারুন এই আইনে রোহিংগাদের উল্লেখ করা হয় বিদেশি নাগরিক কিংবা জাতিহীন (নন ন্যাশনাল)। এবং এর ফলে প্রাত সাত লক্ষাধিক উত্তর রাখাইনের রোহিঙ্গা জনগষ্ঠী আজ মানব হিসেবে প্রাপ্ত ন্যূন্তম অধিকার থেকে বনচিত।

১৯৮২ সাল থেকে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের উদ্বাস্তু বলে ঘোষণা করে আসছে। তাদের দেশটির নাগরিকত্ব দেয়া হয় না। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, এরা বাংলাদেশ থেকে আগত বাঙালি আদিগোষ্ঠী। এদের সঙ্গে মিয়ানমারের কোন সম্পর্ক নেই। এ বিষয় সম্পর্কে মেডিসিনস স্যান ফ্রন্টিয়ারস বলেছে, পৃথিবী থেকে বিলুপ্তপ্রায় আদিগোষ্ঠীর তালিকায় ভয়াবহ অবস্থানে রয়েছে রোহিঙ্গারা।

রোহিঙ্গা এবং গণহত্যা
একটি মানবতা বিরোধী অপরাধ। মিয়ানমারে অবস্থানরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমার সরকারের মানবতা বিরোধী অপরাদের স্বীকার হয়ে আসছে দীর্ঘ অনেক বছর ধরে। যার প্রমাণস্বরুপ নির্বিচারে রোহিঙ্গা হত্যা, ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, ধর্ম পালনে বাধা, স্বাধীনভাবে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, বিনা পারিশ্রমিক এ মজুরি খাটানোসহ অনেক রকমেরর।

১৯৪৮ সালের ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্তের ২৬০ (৩) এর অধীনে গণহত্যা বলতে বোঝানো হয়েছে এমন কর্মকান্ড যার মাধ্যমে একটি জাতি বা ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে নিশ্চিহ্ন করার প্রয়াস নেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে। এবং দুর্ভাগ্যজনকবসত আমরা দেখতে পাই আরাকানে অবস্থিত রোহিঙ্গা উপর চলমান নির্যাতন তাদের চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াড় একটি প্রয়াস।

ইতিহাস পর্যালোচনার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি , পূর্বে আরাকানি মুসলিম, বুদ্ধধর্মাম্বলী মানুষেরা একসাথে ভালোভাবেই বসবাস করে আসছিলো কিন্তু মিয়ানমারে স্বাধীনতা অর্জনের পর সেখানে অবস্থিত ব্রিটিশ বিরোধী অন্দোলনে অগ্রনী ভূমিকা পালনকারী দল “তাখাইন” আরাকানী বুদ্ধদের বোঝাতে শুরু করে যে আরাকানে আবস্থানরত মুসলামরা তাদের জন্য হুমকি স্বরুপ। এবং যখন ‘তাখাইন” মিয়ানমার এর মূল ক্ষমতায় আসীন হলো তখন এই অপ্রীতিকর অবস্থার আরো উন্নতি হয়। তবে এর পেছনে যুক্তি হিসেবে তারা ভবিষ্যত খারাপ অবস্থা মুকাবিলা বা নিজেদের আত্মরক্ষার হাতিয়ারকে দেখানোর চেষ্টা করে যা এখনো কেবল একটি অনুমান মাত্র যা অদূর ভবিষ্যতে ঘটতেও পারে কিংবা না। বর্তমানে চলমান জাতিগত সহিংসতা কেবল তাখাইনদের আরাকান থেমে মুসলিমদের বিতারিত করা কিংবা আজীবন দাস শ্রেণীতে পরিণত করার একটি পদক্ষেপ মাত্র। এবং মিয়ানমার সরকারের আচরণে এটাই বুঝা যায়, এই জাতিগত নিশ্চিহ্ন করার একমাত্র লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য হচ্ছে মুসলিম জনগোষ্ঠি বা ইসলাম ধর্ম।

সহিংসতার নমুনা সমূহের মধ্যে সবথেকে ভয়ংকর পদক্ষেপ হচ্ছে তাদের জাতি হিসেবে পরিচয় না দেয়া এবং তাদের নিজ দেশে তাদের পরবাসি বা উদ্ভাস্তু হিসেবে পরিগণিত করা আর দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাদের ধর্ম বা ঐতিহাসিক ধারনার বর্ষবর্তি হয়ে তাদের যে সমস্ত দেশের অদিবাসি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে সে সমস্ত দেশেও তারা জাতি নয় বরং শরনার্থী হিসেবে পরিচিত। এভাবে দেখা যাচ্ছে একটি সমগ্র জাতি তাদের নিজস্ব দেশ, ভুখন্ড, পতাকা এবং মানচিত্রহীনতায় জীবনযাপন করছে যার ফল স্বরুপ জাতি হিসেবে প্রাপ্য অধিকার থেকে তারা রয়েছে হাজার মাইল দূরে।

নগরায়নের নামে রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমি থেকে স্থানচ্যুতি কারণ এ জোরপূর্বক মজুরীবিহীন কাজে লাগানো তাদের বিরুদ্ধে করা জাতিগত সহিংসতার অন্য একটি রুপ। বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার জন্য এমনকি আরাকান এর রাজাধানীতে যাবার জন্যেও তাদের সরকার কতৃক অনুমতিপ্রাপ্ত হতে হয় যা বেশির ভাগ সময়ই জটিল এবং সময় সাপেক্ষ্য ব্যাপার এতে করে তারা শহুরে সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা থেকে বনচিত। আরাকানে অবস্থিত রোহিংগাদের নেই কোন শিক্ষার অধিকার। তাদের কেউ কেউ উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পেলেও বনচিত হয় তার পরবর্তি শিক্ষা কার্যক্রম হতে কেননা এর পরবর্তি পর্ক্সায় এর জন্য দরকার হয় জাতীয় পরিচয় পত্রের যা রোহিঙ্গা নামক জাতীয় পরিচয়হীন গোষ্ঠীর জন্য দুষ্প্রাপ্য। সে জন্য অধিকাংশ রোহিংগার শিক্ষা স্থানীর মক্তব কিংবা মাদ্রাসা দোড়গোড়া পর্যন্ত। বিয়ে করায় বাধা অন্যতম একটি জাতিগত নিপীরন । বিয়ে করার জন্য কমপক্ষে তিন বছর আগে সরকার বরাবর দরখাস্ত করতে হয় এবং যার জন্য দিতে হয় উচ্চ মাত্রার কর। এবং দিতে অপারগ হলে মেলেনা বিয়ে করার অনুমতি, তার পর রয়েছে দুটি সন্তানের বেশি নয় এমন শর্ত এবং নেই সন্তানের জন্ম নিবন্ধনের অধিকার । এসব কিছুর কারন হিসেবে দেখানো হয় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির বিস্তার লাভে বাধা দান এবং ধীরে ধীরে এই জাতিকে আরাকান থেকে নিশ্চিহ্ন করার একটি সুপরিকল্পিত পরিকল্পনা।।

এই সমস্ত কারণের জের ধরে ২০১২ এবং তার পরবর্তি সময়ে অনেক রোহিঙ্গা পালিয়ে শরনার্থী হিসেবে পারি জমায় বাংলাদেশ , ভারতসহ আশে পাশের বিভিন্ন দেশে। আর এই অন্যায়কে বলা যায় রাষ্ট্র সমর্থিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। অথবা কোন একটি নির্দিষ্ট জাতিকে ধ্বংস করে দেয়ার সুচিন্তিত এনং পরিকল্পিত পরিকল্পনা। ২০১২ সালে ঘটিত মানবতা বিরোধী অপরাধের ধরণ , প্রচারণা এবং রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানো দেখে বোঝাই যায় এটি রোম স্ট্যাটিউট এর ভাষ্যানুযায়ী একটি পরিকল্পিত গণহত্যা।

এভাবে দিন দিন আরাকানে অবস্থিত মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর ন্যাক্কারজনক অত্যাচার দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে যা দেখে মুষড়ে পরছে মানবতা। এবাবে একটি সমগ্র জাতিকে নির্বিচারে অমানুষিক নির্যাতন করা কোন রাষ্ট্রীয় নীতি হতে পারেনা।

 লেখক : শিক্ষক

Comments

comments