ঢাকা, সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮ | ০৬ : ৩৪ মিনিট

image001ভারত-বাংলাদেশ দু’টি দেশের মুক্তি আন্দোলনের সেনানী ‘ছোড়দা’ শিবরাম গুপ্ত। ১৯২১ সালে কৃষ্ণনগর পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে ‘অসহযোগ আর বিদেশি দ্রব্য বর্জন’ আন্দোলনে যুক্ত হয় কয়েক’শ স্বাধীনতাকামী মানুষ। বাবার হাত ধরে উপস্থিত হন আট বছরের এই ছেলেটি । সভার পক্ষ থেকে মতিলাল মান্না ওরফে মতিলাল মাঝি সবা্কই আহ্বান জানাচ্ছেন বিলাতি বস্ত্র আগুনে নিক্ষেপ করতে। ছেলেটি বাবাকে বলে, বাবা, আমার গায়ের জামাটি কী বিলাতি?
উত্তরে বাবা বলেন, ‘হ্যাঁ।’
আবার প্রশ্ন, ‘আমি কি জামাটা আগুনে পুড়ে দিতে পারি।
‘অবশ্যই।’ বাবা এই কথা শুনে ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে গা থেকে জামাটি খুলে আগুনে ছুঁড়ে দেয়। উৎসাহিত মতিলাল বলে উঠলেন ‘ছোড়দা’ নিজের প্রিয় জামা আগুনকে দান করেছে, আপনারাও এগিয়ে আসুন। বিদেশি বস্ত্র আগুনে নিক্ষেপ করুন।

সেদিনের মতিলালের আদর করে ডাকা ‘ছোড়দা’নামটা পরবর্তীকালে সত্যি আট থেকে আশি সকলের প্রিয় ‘ছোড়দা’ হয়ে উঠেছিল। ছোড়দার পোষাকি নাম শিবরাম গুপ্ত ।পিতার নাম মণীন্দ্রনাথ গুপ্ত।তিনি ছিলেন কবিরাজি চিকিৎসক। তাঁর জন্ম কৃষ্ণনগরে ১৯১৩ সালের ১৯ মার্চ। আট বছরের শিবরামের আগুনে বস্ত্র নিক্ষেপ কিন্তু ছেলে খেলা ব্যাপার ছিল না। আসলে কৃষ্ণনগরের পি এল চ্যাটার্জী লেনের বাসিন্দা এই গুপ্ত পরিবারটির সবাই ছিলেন স্বাধীনতাযোদ্ধা।  শিবরামের মা মাসি ছাড়াও দুই দিদি কল্যাণী ও সুনীতি নেপথ্য থেকে
স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাহায্য করতেন। এই বাড়িতে সাহিত্যিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী মানুষেরা আড্ডা দিতেন। জমে উঠতো সাহিত্যের আড্ডা, সংগীতচর্চাও চলতো সমান তালে। নির্ধারণ হতো স্বাধীনতা সংগ্রামীদের রণকৌশল।

ShibRam Gupta (6)১৯২৪ থেকে ১৯২৬ কাজী নজরুল ইসলাম কৃষ্ণনগরে গ্রেস কটেজে থাকাকালীন সময়ে এই বাড়ির আড্ডায় হাজির থাকতেন। কাজী নজরুল এই বাড়ির বাসিন্দা শিবরামের মাসি কবি সরোজবাসিনী গুপ্তকে তাঁর ‘ছায়ানট’  উৎসর্গ করেছিলেন। ১৯২৮ সালে শিবরাম পিতার সঙ্গে কলকাতায় মতিলাল নেহরুর সভাপতিত্বে কংগ্রেস অধিবেশন দেখতে যান। এখানে প্রদর্শনী, স্বেচ্ছাসেবক বাহিনি এবং তাঁর জি ও সি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে কুচকাওয়াজ ও স্বেচ্ছাশ্রম দেখে আকৃষ্ট হন। স্বেচ্ছাসেবক আন্দোলনে যোগ দেন। বৈপ্লবিক দল সংগঠনের কর্মকেন্দ্র ‘দরিদ্র ভান্ডার’, ‘সাধনা লাইব্রেরী’, ‘সৎকার সমিতি’, ‘ব্যায়াম সমিতি’ প্রভৃতি নানা সংস্থার স্বেচ্ছাসেবক হয়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে যুক্ত হন। কখনও ছাত্র আন্দোলন, কখনও লাল খদ্দরের মিলিটারি সার্ট পরিহিত স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে গণসংযোগ, সত্যাগ্রহ ও আইন অমান্য আন্দোলন, মদ গাঁজার দোকানে পিকেটিং ইত্যাদি হরেক রকম বৈপ্লবিক কর্মকান্ডে জড়িত হয়ে পড়েন।

১৯৩১ সালে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের জেরে প্রথম গ্রেপ্তার হন। ‘অহিংস না সশস্ত্র আন্দোলন কোন পথে স্বাধীনতা’ এই নিয়ে অনেকেই যখন দ্বিধাগ্রস্থ তখন শিবরামের মনে কোন দ্বিধা ছিল না। তিনি মনে করতেন, ‘স্বাধীনতা চাই। তা সে অহিংস না সহিংস কোন পথে আসছে সেটা বড় কথা নয়।’ সেই কারণে তাঁকে দুটি পথেই আন্দোলনে সামিল হতে দেখি। প্রথমবার গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েকঘণ্টা পরে মুক্তি পেলেও ১৯৩১ সালের ১৭ মার্চ আবার গ্রেপ্তার হন। তাঁকে রাখা হলো কৃষ্ণনগর জেলে। সেখান থেকে পাঠানো হল বহরমপুর জেলে। রাজবন্দীদের উপর অত্যাচারের বিরুদ্ধে ১৬ থেকে ২৭ আগস্ট ১৯৩৭ অনশনসহ জেলেই শুরু করলেন আন্দোলন। ফল স্বরূপ এবার ১৯৩৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে কুমিল্লা জেলার
বুড়িচঙ থানায় অন্তরীণ রাখা। অবশেষে ১৯৩৭ সালের নভেম্বর মাসে মুক্তি পেলেন।

১৯৪২ সালের ২৬ কিংবা ২৭ আগস্ট সংগঠিত ছাত্র মিছিলকে কেন্দ্র করে ১ জানুয়ারি ১৯৩৮ আবার আটক করা হল শিবরাম গুপ্তকে। বিস্ফোরক  দ্রব্য রাখাসহ দক্ষিণেশ্বর বোমা মামলায় জড়িয়ে তাঁকে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে, পরে কৃষ্ণনগর জেল এবং শেষে প্রেসিডেন্সী জেলে আটকে রাখা হয়।

১৯৪৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর মুক্তি পান। ১৯৪৬ সালে ফরোয়ার্ড ব্লকের জেলা নেতৃত্ব পদ গ্রহণ করে জাতীয় সঙ্কট ও সামাজিক জটিলতার বিরুদ্ধে ছাত্র–যুবদের সংগঠিত করার
কাজ করতে থাকেন। দ্বিখন্ডিত স্বাধীনতা লাভের পর ‘ছোড়দা’ শিবরাম গুপ্ত জাতীয় রক্ষীবাহিনীর নদীয়া জেলা কমান্ডান্ট, রাইফেল ক্লাব, কৃষ্ণনগর পৌরসভার কমিশনার, কৃষ্ণনগর পাবলিক লাইব্রেরীর সম্পাদক, রেডক্রশ সোসাইটির নদীয়া জেলা সম্পাদক ইত্যাদি  নানা পদে থেকে দেশ ও জাতি গঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

১৯৫৯ ও ১৯৬৬ সালে পশ্চিমবঙ্গের ভূখা মানুষের ‘খাদ্য আন্দোলনে’ সক্রিয় অংশগ্রহণ করে দাবি আদায়ে যোগ্য নেতৃত্ব দেন । ১৯৬৬ সালে খাদ্য আন্দোলনে কৃষ্ণনগরে তিনজন শহীদ হন। ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একজন সহযোগীযোদ্ধা ছিলেন আজন্ম সংগ্রামী শিবরাম গুপ্ত । ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু মুজিবের ঐতিহাসিক ভাষণের পর ২৫ মার্চ প্রত্যক্ষ মুক্তি সংগ্রাম শুরু হলে ছোড়দা শিবরাম। শুধু নদীয়া বা পশ্চিমবঙ্গ নয় খোদ বাংলাদেশের রণাঙ্গনে নির্ভয়ে হাজির হন। ১৯৪০ সালে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হয়ে দর্শনা, বড়সালুয়া, বলদিয়া, ফুলবাড়ি, শঙ্করচন্দ্রপুর, ডিঙাইদহ, দামুরহুদা, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া’র বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে স্বাধীনতা আন্দোলনকে সংগঠিত করেছিলেন।

ShibRam Gupta (2)৩১ বছর পর আবার বাঙালি জাতির আর একটি মুক্তি আন্দোলনে যুক্ত হতে প্রাণের মায়া উপেক্ষা করে কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা’র গ্রাম শহর জনপদে হাজির হন। সমগ্র কুষ্টিয়া জেলা পরিভ্রমণ করেন। সেখানকার আন্দোলনরত মুক্তিযোদ্ধা, নেতা, কর্মী, ছাত্র যুবদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে সব রকম সাহায্য সহযোগিতা করেন । শুধু তাই নয় পশ্চিমবাংলার বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ঘুরে ঘুরে ত্রাণের ব্যবস্থা করা, রেডক্রশের মাধ্যমে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি কাজে ছুটে বেড়িয়েছেন। তিনি ভারত সরকার ও
মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী তথা স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারে মধ্যে সংযোগকারী হিসাবে স্বেচ্ছাকর্মে নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।

বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিনিধি আবু আহমেদ আবজালুর রসিদ(বাদল ব্যারিষ্টার)’এর সঙ্গে জনৈক ভারতীয়  সাংবাদিকের মাধ্যমে ১ এপ্রিল ১৯৭১ শিবরাম গুপ্ত’র পরিচয় হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যের জন্য তাঁকে কৃষ্ণনগরের দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন বাদল ব্যারিষ্টার। একখানি মুদ্রিত আবেদনপত্রও সেইমত প্রচার করেন। এরপরই তিনি
সাগ্রহে সে দায়িত্ব পালনে নেমে পড়েন। অতিদ্রুততার সঙ্গে ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অনুমোদিত ত্রাণ গ্রহণ কেন্দ্র ‘গেদে’ কেন্দ্রে পাঠানো হয়।

১০ ও ১১ এপ্রিল ১৯৭১ শিবরাম গুপ্ত অবস্থার গুরুত্ব বুঝে তিনি নিজে সশরীরে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে ভেড়ামারা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর হাজির হন । ১৮ এপ্রিল ১৯৭১ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী দপ্তর থেকে পত্র মারফৎ তাঁকে জানানো হয় সংগৃহিত ত্রাণসামগ্রী একটি কেন্দ্রে মজুত রেখে সেগুলি বিতরণের জন্য হস্তান্তরিত করা হবে
বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গঠিত একটি সংস্থাকে, যাঁদের কাছে কমান্ডার, সাউথ ওয়েস্ট কমান্ড মেজর এ.ওসমান চৌধুরী স্বাক্ষরিত পরিচয়পত্র থাকবে। ১১ মে ১৯৭১ বাংলাদেশের মুজিবনগর থেকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ত্রাণ, পুনর্বাসন, খাদ্য, কৃষি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক চিঠিতে জানান ‘বাংলাদেশের দুর্গত মানুষদের জন্য আপনাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় আমরা মুগ্ধ। আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানান যায় যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কেন্দ্রীয় সাহায্য ও পুনর্বাসন সমিতি গঠন করেছেন, যার কাজ হবে ঐক্যবদ্ধ
ভাবে আপনাদের সহযোগিতায় কাজ করা । … আমাদের কর্তব্যে ত্রুটি থেকে যাবে যদি আমরা আপনাদের অদ্যাবধি সকল কারযের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা না জানাই
… সব সময়ের জন্য আমাদের আন্তরিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি।’

১ মে ১৯৭১ অফিসার ইন চার্জ সাধারণ প্রশাসন মহঃ নুরুল কাদের চিঠিতে (মেমো নং জি, এ/১৭ (২), তাং ১.৫.১৯৭১) লিখছেন ‘…পত্রবাহক মি.এম. এইচ. সিদ্দিকি বাংলাদেশ সরকারের একজন অফিসার। তাঁকে কৃষ্ণনগরে বাংলাদেশ সরকারের যে সমস্ত যানবাহন আছে সেগুলি কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁকে যানবাহনগুলি নিয়ে আসার জন্য সকল প্রকার সাহায্য বিশেষ করে জ্বালানী তেল দেওয়া সম্ভব হলে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।’

অন্য একটি চিঠিতে ৩১ জুলাই ১৯৭১ ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ, বাংলাদেশ, এ. খালেক শিবরাম গুপ্তকে লিখছেন –‘আমি কৃষ্ণগঞ্জে আশ্রয় গ্রহণকারী বাংলাদেশের পুলিশ কর্মীদের প্রতি আপনার আন্তরিক সহানুভূতির অনেক কথা আমার ইন্সপেক্টর গাজী আব্দুর রহমানের কাছে শুনেছি। আপনি যদি কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ সরকারী ডোলের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারেন তবে তা পুলিশ কর্মীদের কাছে বড় ধরণের সাহায্য হবে।’

ব্যক্তিগত ভাবেও বহুজন চিঠি দিয়ে যোগাযোগ রাখতেন মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং তার পারেও। ১২ জুন ১৯৭১ মুস্তাফিজুর রহমান শিবরাম গুপ্তকে লিখছেন–
ShibRam Gupta (3)‘শ্রদ্ধেয় কাকাবাবু,
আমার প্রণাম জানবেন। আমাকে বোধহয় চিনতে পারেননি। আমি ভেড়ামারা ওয়াপদার মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ার। ১১ এপ্রিল রাতে আপনি যখন কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে ভেড়ামারা পৌঁছেন তখন আমার ঘরে আপনার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তারপর দিন সন্ধ্যার সময় আমাদের ভেড়ামারা থেকে পালাতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে এখানে সেখানে ঘুরে বর্তমানে শিকারপুরে আশ্রয় নিয়েছি। পাকিস্থানকে সহ্য করতে পারিনা বলে পাকিস্থানের অধীনে  চাকুরি করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। যদ্দিন আমাদের বাংলাদেশ স্বাধীন না হচ্ছে ততদিন আর দেশে ফিরছি না। দেশে আমার মা বাবা দুটি ভাই ও এক বোন কেমন আছে জানিনা। মনটা তাই চিন্তা যুক্ত। বর্তমানে বসে বসে দিন কাটাতে হচ্ছে। হঠাৎ পালিয়ে
আসার দরুন প্রায় নিঃসম্বল হয়ে আসতে হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার যদি কোন কাজে লাগায় তাহলে ভাল হত। নব গঠিত বাংলাদেশ সরকারের কাছে দরখাস্ত করেছি। বেতাইতে যে কদিন মাইনে দিয়েছিল তার কোনটাই পাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি। আপনার বোধহয় মনে আছে বেতাইতে আপনি যখন জীপে করে যাচ্ছিলেন তখন আপনার সাথে দেখা করেছিলুম। শীঘ্রই একবার কৃষ্ণনগর আসতে পারি। আপনার সাথে তখন দেখা করব। আপনার ও বাড়ীর সবাইর কুশল কামনা করি।

শ্রদ্ধান্তে—
মুস্তাফিজুর রহমান।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও মানুষ তাঁকে ভুলে যাননি। মনে রেখেছিলেন কামরুল ইসলাম। যার সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় হয়েছিল ১১ এপ্রিল ১৯৭১ কুষ্টিয়া ডাকবাংলোয়। কামরুল কৃষ্ণনগরে একসময় আশ্রয় নিয়েছিলেন। ৭ আগস্ট ১৯৭৬ তারিখে সুদূর আমেরিকা থেকে লেখা এক পত্রে কামরুল স্মৃতিমেদুর হয়ে লিখেছেন-“ ছোড়দা, বহুদিন পরে আপনাকে লিখছি, দেখে হয়তো আশ্চর্য্য হচ্ছেন, দেশের কর্মব্যস্ততা থেকে বহু দূরে (শেফিল্ডে) বসে চেনা অচেনা মুখের ভীড়ে আপনার কথা খুব বেশি করে মনে পড়ছে।… মনের স্মৃতিপটে দেখছি আপনি বাচ্চাদের নিয়ে গল্প করছেন এবং ডাকটিকিট বিলাচ্ছেন- এ দৃশ্য মনে বড় প্রশান্তির জন্ম দেয় । … এই দূরদেশে আমি এটাই চাচ্ছি যে আপনার লেখা
একটা বিস্তৃত পত্র আমার কাছে আসুক… চৌরাস্তার মোড়ে বইয়ের দোকান, রেষ্টুরেন্ট ও সুভাষ বসুর মূর্তিটা স্মৃতিপটে এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে।…
কামরুল ইসলাম।

shibRamএম.এ.বারি (এম এ, এল এল বি–অ্যাডভোকেট সুপ্রীমকোর্ট, ঢাকা) ২০ মে ১৯৮১ তাঁর লেখা একটি চিঠি ফটিক নামে  একজন পত্রবাহকের হাতে শিবরাম গুপ্তকে পাঠালেন –“ ছোট দা, সংক্ষিপ্ত পত্রে কেমন আছি বলা মুস্কিল। ফটিক বিস্তারিত বলবে। অনেকদিন ধরে লিখবো ভাবছি কিন্তু লেখা হয়নি। বাহক কাজের জন্য যাচ্ছে –শুনেই সুযোগটি গ্রহণ করলাম। আশাকরি করুণাময়ের ইচ্ছায় ভাল আছেন। আমাদের পরিচয়ের বয়স প্রায় ১২ বছর, কিন্তু লম্বা সময়ের কারণে এতটুকুও মলিন হয়নি সেই স্মৃতি। আশাকরি সময়ের আবর্তে উজ্জ্বল হবে একাত্তরের সম্পর্ক। দিদিসহ পরিচিত সকলকে শুভেচ্ছা জানাবেন। খোকনদের সকলকে শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জানাবেন। কামরুল ভাল আছে। সে এখন মস্ত বড়
ইঞ্জিনিয়ার, আপনার পরিচিত অনেকেই এদেশের প্রশাসনে এখন উজ্জ্বল নক্ষত্র। দোয়া করবেন তারা যেন আরো বড় হতে পারে। আপনার জীবন আমাদের কাছে বহুল আলোচনার বিষয়। আপনার ত্যাগী জীবন আমাদের মাঝে মাঝে নাড়া দেয়, জানি না এমন কৃচ্ছতাসাধন  বড় জাতি হিসাবে আত্মপ্রকাশের জন্য ত্যাগের আদর্শই একমাত্র হাতিয়ার। সেই লক্ষেই ৭১ সালে আপনাদের কাছে সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়ে ছিলাম। সে স্বপ্ন আজও বাস্তবায়িত হয়নি। অধীর আগ্রহে চেয়ে আছি –সেই অনাগত সময়ের পাণে যখন বাংলাদেশ হবে শোষণহীন সোনার বাংলা।

আশীর্বাদ কামনান্তে
–স্নেহভাজন” এম.এ.বারি।

ShibRam Gupta (4)কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের অধ্যাপক, লোকসাহিত্য পরিষদ , কুষ্টিয়া সাহিত্য পরিষদ ও কুষ্টিয়া পাবলিক লাইব্রেরী’র  সম্পাদক, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের সদস্য, মজমপুর কুষ্টিয়ার বাসিন্দা অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী ১৯৭১ সালে সপরিবারে কৃষ্ণনগরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখানেই শিবরাম গুপ্ত’র সঙ্গে তাঁর সখ্যতা গড়ে উঠে। ১৯৭৬ সালের ৪ অক্টোবর তিনি এক পত্রে লিখেছেন –
“শ্রদ্ধাভাজনেষু- প্রণাম জানবেন। আশাকরি কুশলে আছেন। দীর্ঘদিন কোন যোগাযোগ নেই। মুক্তিযুদ্ধের সেই দিনগুলোর কথা বার বার মনে পড়ে – মনে পড়ে আপনার প্রীতি ও ভালবাসার কথা এ বিষয় কিছু স্মৃতি কথা লিখব ইচ্ছে আছে। তাতে আপনার প্রসঙ্গ থাকবে অনেকখানি জায়গা জুড়ে। কৃষ্ণনগরের স্মৃতি আপনাদের ভালবাসা কখনই ভুলবার নয়। আমি কুষ্টিয়া জেলার ইতিহাস নিয়ে কিছু কাজ করার চেষ্টা করছি। এ ব্যাপারে আপনার সহযোগিতা একান্ত কাম্য।’

শিবরাম গুপ্ত এর উত্তরে জানান ‘…বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস লেখার কাজে যদি আমার কোন সহযোগিতার প্রয়োজন হয় আমার সাধ্যমত সকল প্রকার সহযোগিতা পাবেন। অনেক সময় মনে হয়েছে আমিও আপনাদের সহযোগী ছিলাম আপনাদের মুক্তিযুদ্ধে । … এ বিষয়ে অনেক কাগজপত্র (প্রমাণপত্র –তারিখসহ) আমার
কাছে আছে-যদি আপনার কোন কাজে লাগে তবে একবার কষ্ট করে এখানে এলে সে সব দেখাতে পারবো।” এর প্রায় ১৭ বছর পর ১৯৮৯ সালে অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী
সেগুলি সংগ্রহ করেন। পরে শিবরাম গুপ্ত আরো কিছু নথি সন্ধান পাওয়ার কথা জানালে ৮ এপ্রিল ১৯৯০ সালে অধ্যাপক চৌধুরী আবার লেখেন –‘ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস রচনায় হাত দিয়েছি –এ বিষয়ে সবচেয়ে মূল্যবান সহযোগিতা পেয়েছি আপনার নিকট থেকে। আপনার নিকট আমরা “কৃতজ্ঞ ও ঋণী” আপনার আন্তরিক সহযোগিতার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করবো। আমার ব্যাক্তিগত স্মৃতিতেও আপনি উজ্জ্বল হয়ে আছেন থাকবেন।

চিঠিতে লিখেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র খুঁজে পেয়েছেন। অনুগ্রহ করে কী কী কাগজ পেয়েছেন তার একটি তালিকা পাঠালে বাধিত হব । ‘স্বাধীন বাংলা পত্রিকা’ সম্পর্কে নীচের ছক অনুযায়ী – কিছু তথ্য বিবরণ পাঠাতে অনুরোধ করি। …আন্তরিক শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা জানিয়ে শেষ করি।
প্রীতিসিক্ত’’- আবুল আহসান চৌধুরী।

সবার প্রিয় ‘ছোড়দা’ ছিলেন একজন দায়িত্বশীল উদার মনের মানুষ। শিশুদের খুব ভালবাসতেন। তাঁর ভিতরে একটা কবি মন বিরাজ করতো। কবিতার ছন্দে ১৯৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলনের পুলিশের গুলি চালনা, প্রতিরোধ সাবলীল ভাষায় ছবির মত তুলে ধরেছেন (‘সব কান্না এক সূর’)। একই চিত্র দেখি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের সময়।‘সোনার বাংলা’ কবিতায় লিখছেন –

 …..সংগ্রা মেতে উঠলো মেতে যুবক তরুণ দল
নেতা তাদের বঙ্গবন্ধু – প্রধান সম্বল।
এপার বাংলা ওপার বাংলা হয়েছে উত্তাল
পদ্মা নদীর ঢেউ বুঝি তাই দিচ্ছে করতাল
সীমান্তের ঐ বাধার প্রাচীর হটাৎ গেল খুলে ,
আপনজনে মিললো বুঝি দ্বিজাতি মত ভুলে।
এপার হতে চললো গাড়ী সাঁড়া সেতুর ধার
সঙ্গে নিয়ে জ্বালানী তেল অনেক কিছু আর
নিঝুম পদ্মা পার।
পদ্মা পারে শুনি মোরা ফোনে
ওপারেতে পাবনা জেলায়
খান সেনারা ঢুকতেছে সাবধানে।
এমনি করেই রাত পোহালো উঠলো নবীন সূরয
দিকে দিকে বাজছে ভেরী সাজছে রণতূরয।
ফিরতি পথে যাত্রা হল শুরু –
পথের মাঝে বিমান হানার
আওয়াজ গুরু গুরু।
পড়ছে বোমা – ফাটছে বিকট শব্দে
সন্দেহ হয় ফাটছে বোধ হয়
কবির শিলাইদ’তে।
খবর নিয়ে গেল জানা
হয়নি সে দুর্ঘটনা।
খবর এলো অন্য কোথাও
পড়েছে ঐ বোমা।
জঙ্গী বিমান মাথার উপর ঘুরছে চক্রাকারে
হাসপাতাল কি গুঁড়িয়ে দেবে ব্রাশ-ফায়ার করে
পড়লো গোলা মর্টার হতে
ভাঙল বাড়ী ঘর।
মুক্তি ফৌজের এক সেনানী সেথায় দিল জান-
তাজা খুনে সিক্ত হল মুক্তি অভিযান।
হাসপাতালের রোগী নিয়ে
ওপার হতে এপারে
ফিরছে মোদের যান।
শপথ তাঁদের বাঁচে যদি প্রাণ
মুক্তিযুদ্ধে করবে আত্মদান।
মুমূর্ষু দুই রোগী নিয়ে
চলছে মোদের গাড়ী, একে একে চুয়াডাঙ্গা মেহেরপুরটি ছাড়ি।
ভবেরপাড়া ঘাট পেরিয়ে এলাম হৃদয়পুর,
পিছনেতে সাঁড়া সেতু রইলো বহু দূর ।
পদ্মা নদীর পানি
উথাল পাথাল ঢেউগুলি তার
করছে কানাকানি। আবার কবে দেখা হবে-
দিতেছে হাতছানি।
সন্ধ্যা এবার ঘনিয়ে এলো
ওপার অন্ধকার ,
জ্বালিয়ে বাতি এপারেতে
চলছে হাটবাজার।
মুক্তিযুদ্ধে খান সেনাদের
হল পরাজয় ,
ওপার বাংলা স্বাধীন হল;
নাহিক সংশয়। বহুজনের আনাগোনা এই নদীয়ায়,
তাঁদের কথা আছে লেখা ডায়েরী পাতায়।
সুযোগ যদি হয় কখনো লিখতে ইতিবৃত্ত
লিখতে হবে স্বাধীনতা আনলো যারা
তাঁদেরই কৃতিত্ব।
তার পরেতে শুরু হল
দেশ গঠনের কাজ
গড়তে হবে মানুষ এবার
যারা – গড়বে এ সমাজ । …. ” ( খন্ডিত অংশ )

ShibRam Gupta (5)শিবরাম গুপ্ত ভালো ছবিও আঁকতেন। সেখানেও দেখি আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে তুলি কলমের আঁচড়ে। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন – খাদ্য আন্দোলন, বাংলাদেশের মুক্তি আন্দোলন সব মিলে মিশে একাকার। সত্তর পার হওয়া মানুষটি এবার কাজ শুরু করলেন অসহায় প্রবীণ মানুষদের জন্য। ঝাঁপ দিলেন বৃদ্ধাশ্রম গড়ার কাজে। নিজের বাড়িটি দিয়ে দিলেন বৃদ্ধাশ্রম গড়তে। গড়ে উঠলো বৃদ্ধাশ্রম।

১৭ জানুয়ারি ১৯৯৪ চিরকুমার ‘ছোড়দা’ শিবরাম গুপ্ত চিরঘুমের দেশে চলে গেলেন। স্থান পেলেন ইতিহাসের পাতায়। জেগে রইলো মানব সেবায় তাঁর নামে নামাঙ্কিত “ শিবরাম গুপ্ত স্মৃতি বৃদ্ধাশ্রম।’

সঞ্জিত দত্ত : লেখক ও  গবেষক।
১১/১ সতীন সেন রোড, আমিনবাজার-গড়াইপাড়া, কৃষ্ণনগর-৭৪১১০১, নদীয়া , পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

 

 

[ছবিঃ  প্রবীণ বয়সে, যুবক শিবরাম গুপ্ত, অফিসার ইন চার্জ সাধারণ প্রশাসন’এর পত্র,  আই জি পুলিশ, বাংলাদেশ’এর পত্র,  এম.এ.বারি (এম এ, এল এল বি–অ্যাডভোকেট সুপ্রীমকোর্ট, ঢাকা)’র পত্র,  অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী’র পত্র, শিবরাম গুপ্ত’র আঁকা পচ্ছদ ও স্বাক্ষর }

Comments

comments