ঢাকা, বুধবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৮ | ১১ : ২০ মিনিট

September 15th, 2017

13719510_1270281016330430_3053928100680431384_oপর্তুগালের রাজধানী লিসবন সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে জইন্তা ফেগ্রেসিয়া সান্তা মারিয়া মাইওরের কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করছেন বাংলাদেশের রানা তাসলিম উদ্দিন। তিনি সেখানে প্রায় ২৭ বছর ধরে বসবাস করছেন। ১৮ বছর ধরে স্থানীয় ট্রাইব্যুনালের অফিসিয়াল দোভাষী হিসেবে কাজ করছেন তিনি। মধ্যবিত্ত পরিবারের অভাব অনটন অতিক্রম করে তিনি আজ লিসবন সিটির কাউন্সিলর পদে প্রার্থী। এই পথচলা মোটেই সহজ ছিল না। সংগ্রাম করতে হয়েছে দিনের পর দিন।  জেনে নিই তাঁর জীবসংগ্রামের দিনগুলির কথা।

জন্ম ও পরিবার
রানা তাসলিম উদ্দিন ১৯৬৭ সালে তৎকালিন নোয়াখালী জেলার লক্ষীপুররে জন্ম গ্রহণ করেন। বাবা মিয়া সিদ্দিক ও মা বেগম আয়শা সিদ্দিক। যখন পাঁচ বছর বয়স তখন বাবার কর্মস্থল ঢাকার লালবাগের চলে আসেন। মধ্যবিত্ত পরিবার। অতি সাধারণ দিনযাপন। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশের বগুড়া জেলায় মিসেস ফাউজিয়া তালুকদারে সঙ্গে বিয়ে আবদ্ধ হন। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে। স্ত্রী, ছেলে–মেয়ে নিয়ে তিনি ২৬ বছর লিসবনের বসবাস করছেন। 
পড়াশোনা ও জীবনসংগ্রাম
ঢাকায় স্কুল ও কলেজ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করেন। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্র অবস্থায় তিনি ১৯৮৪ সাল থেকে সামরিক জান্তা স্বৈরাচারী আন্দোলনে ঢাকার রাজপথে অগ্রণী ভুমিকা পালন করেন। সেই সময়ে তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বৈরাচার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে, সামাজিক কর্মে ও বিভিন্নপত্র পত্রিকায় লেখালেখির কারণে তৎকালিন সময়ে রাজনৈতিক মহলে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। ১৯৮৮ সালে ঢাকার ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য খাবার ও কাপড় সংগ্রহ করে ঢাকার কামরাঙ্গী চরে বিতরণ করেন ।

১৯৮৯ সালের শেষের দিকে রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির কারণে হংকং যান। ১৯৮৯ থেকে ৯১ পর্যন্ত এক হতাশায় জীবন অতিবাহিত করেন। দুই বৎসরে চায়না, কোরিয়া, তাইওয়ান,থাইল্যান্ড, মাকাও এবং ফিলিপিন ভ্রমন করেন। ১৯৯১ সালের শেষের দিকে লন্ডনে কিছুদিন অবস্থান করে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে আসেন। যখন লিসবনে আসেন তখন পর্তুগালে 10361063_1173878965970636_3696277707915061717_nবাংলাদেশি অভিবাসীর সংখা ছিল মাত্র ছয় জন। ১৯৯২ সালের জুন পর্যন্ত এ সংখা দাঁড়ায় ১২ জনে। পূর্ববর্তী সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি মাত্র ১২ জনকে নিয়েই প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কমিউনিটি অব পর্তুগাল। সেখানে তিনি সেক্রেটারি জেনারেলে হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ সালে পর্তুগাল সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে অবৈধ অভিবাসীদের বৈধ করার ঘোষণা দিলে সর্ব ইউরোপ থেকে ১৮৩ জন বাংলাদেশি আসলে রানা তাসলিম উদ্দিন তাদের কে সার্বিক সহযোগিতা করেন এবং ওই সময়ে তিনি অপরতো শহরের বাংলাদেশের অনারারী কনস্যুলেট থেকে নবাগত সকল বাংলাদেশীদের কনস্যুলেট সার্ভিস দিতেন বিধায় তাঁকে রহস্য করে এদেশের লোক এম্বাসেডর বলে সম্বোধন করতেন। উল্লেখ্য, ওই সময়ে ১৮৩ জন সকলেই পর্তুগালে থাকার বৈধতা লাভ করেন। ১৯৯৪ সালের মে মাসে বিভিন্ন পথ পরিক্রমা অতিক্রম করে রানা তাসলিম পর্তুগালের নাগরিকত্ব লাভ করেন এবং পরতু বাংলা ইন্টারন্যাশনাল কমার্স লিমিটেড নামক একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন, যা কোন বাংলাদেশীর পর্তুগালে প্রথম কোম্পানি। ব্যক্তিগত ব্যবসার মাধ্যমে নিজেকে লিসবনে প্রতিষ্ঠা করেন ও ব্যবসায়িক সুবাদে পৃথিবীর প্রায় ৩৫ টি দেশ ভ্রমন করেন। ধীরে ধীরে পর্তুগালের অভিবাসীর সংখা বাড়তে থাকলে তিনি ব্যবসা ও কমিউনিটির সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করে বাংলাদেশ কমিউনিটি ও স্থানীয় প্রশাসনে প্রচুর জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
20993951_1813096478715545_2325991073508222904_nমেধা, সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দোভাষী হিসেবে আজ অবধি কাজ করে আসছেন। ১৯৯৮ সালে পর্তুগাল সামাজিক রাজনৈতিকভাবে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এক্সপো ৯৮ নামে এখানে একটি বিশ্ব বাণিজ্য মেলা হয় বর্তমান ওরিয়েন্ট এর ন্যাশনালস পার্কে। ওই সময়ে মেলার প্রবেশ পত্রের দাম ছিল ২৫ ইউরো। কিন্ত রানা তাসলিম উদ্দিন বাংলাদেশি অনারারী কন্সুলার ও এক্সপো ডিরেক্টরের সঙ্গে মিটিং করে ৬০০ বাংলাদেশিদের বিনামুল্যে প্রবেশ করিয়েছিলেন।
১১ সেপ্টেম্বর ছিল বাংলাদেশের দিবস। সেইদিন প্যারিস বাংলাদেশ এমব্যাসির অ্যাম্বাসেডর তোফায়েল হায়দার, অনারারী কন্সুলার আক্সেল ওয়ালটার ও রানা তাসলিম উদ্দিনসহ এক্সপোতে বাংলা জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর মাধ্যমে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন, যা এখনো ওরিয়েন্ট এর ন্যাশনালস পার্কে পত পত করে উড়ে যাচ্ছে পৃথিবীর আরও ১৯০টি পতাকার সঙ্গে।
১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ-পর্তুগাল সাংস্কৃতিক ইউনিয়ন নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশি ও পর্তুগীজদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিনিময়ের মাধ্যমে নিজ দেশকে পরিচিত করে তোলেন। একমাত্র এই সংগঠনের মাধমে বাংলাদেশের জাতীয় দিবসগুলো উদযাপনের মাধ্যমে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কমিউনিটির সুসম্পর্ক গড়ে উঠে।
রানা তাসলিম উদ্দিন দুই মেয়াদে ৬ বৎসর এই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেন। ২০০০ সালে ইংল্যান্ড অক্সফোর্ডে বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার ভিজিট করে ওই বৎসরই কমিউনিটির নেত্রিবৃন্দের একত্র করে তিনি লিসবনে প্রথমবারের মত প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, বাইতুল মুকাররাম মসজিদ এবং প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে এই ইসলামিক সেন্টার লিসবন শহরতলিতে সবচেয়ে বৃহৎ মসজিদ যেখানে তিনটি জুম্মার নামাজে প্রায় ১৫০০ লোক জুম্মা আদায় করে। ২০০৩ সালের ১৫ মার্চ রানা তাসলিম উদ্দিন পর্তুগালের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মিস্টার জর্জ সাম্পাইওকে বাংলাদেশ- পর্তুগাল সাংস্কৃতিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে মারতিম মনিজ বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় সংবর্ধনা জানান এবং উপহার স্বরূপ ১৯১৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখা পর্তুগিজ বাংলা ব্যাকরণ দুইটি বই দিয়ে বাংলাদেশ ও পর্তুগালের সম্পর্ক আরও
জোরদার করার ইঙ্গিত ঘোষণা করেন।
13892147_1282556138436251_7071736599891810071_nকীভাবে যুক্ত হলেন সোশালিস্ট পার্টি সঙ্গে
২০০৭ থেকে তিনি পর্তুগাল সোশালিস্ট পার্টি সমর্থন করেন ও বিভিন্ন সভা সেমিনারে যোগদানের মাধ্যমে পার্টি সম্বন্ধে জ্ঞান অর্জন করেন। এই বছরই তিনি তাসফা ইন্টারন্যাশনাল নামক আরেকটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্যবসাকে আরও সুদৃঢ় করেন।
২০০৯ থেকে পর্তুগাল সোশালিস্ট পার্টির একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করেন এবং তৎকালীন লিসবন সিটি মিউনিসিপালিটি প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডঃ আন্তনিয় কোস্টার পক্ষে বাঙালি কমিউনিটিতে কাজ করেন। যিনি বর্তমানে পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী। ২০১১ সালে চক্রান্তকারী মহলের প্রচারনায় রানা তাসলিম উদ্দিন বাংলাদেশি কমিউনিটি নির্বাচন অংশ গ্রহণ করেন। লিসবনে বাংলাদেশী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ও আঞ্চলিক গ্রুপের হিংসাত্বক কর্ম প্রচারণায় তিনি হেরে যান। ৎ
২০১২ সালের ডিসেম্বরে গ্রীসে অনুষ্ঠিত আয়েবার কনভেনশনে যোগ দেয়ার মাধ্যমে রানা তাসলিম উদ্দিন আয়েবার সন্মানীত সহসভাপতি নির্বাচিত হন এবং বর্তমানে তিনি আয়েবার একজন কর্মঠ, সৎ, ও নীতি নির্ধারণ সদস্য। এই বছরই লিসবন মিউনিসিপালিটির প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, বাইতুল মুকাররাম মসজিদের নতুন প্রোজেক্টের প্রোটোকলে স্বাক্ষর করেন।
২০১৩ সালে তিনি পর্তুগাল লিসবনের সোশালিস্ট পার্টির মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচন করেন এবং লিসবনের “সান্তা মারিয়া মাইওর জুন্তা ফ্রেগেসিয়ার” কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের শেষের দিকে তিনি সোশালিস্ট পার্টির লিসবনের ডেলিগেট মনোনীত হন। বর্তমানে পার্টির বিভিন্ন সভা সমাবেশে নিয়মিত যোগদান করেন।
২০১৫ সালের মে মাসে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন পর্তুগাল বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ এ্যাসোসিয়েশন – পিবিএফএ। মূলত মূলধারা ও পর্তুগিজদের সঙ্গে বাংলাদেশের সমন্বয় সাধন, ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, কৃষ্টি ও আচার আচরনের মাধ্যমে বন্ধুত্ব সৃষ্টি করার মানসেই এই সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। সন্মিলিত সদস্যদের ভোটে তিনি এই সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন। এই বছরের অক্টোবরে লিসবন মিউনিসিপ্যালের এসেম্বলীতে সর্বদলীয় ডিবেট আলোচনায় বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, বাইতুল মুকাররাম মসজিদের নতুন প্রোজেক্টে পাশ হয়। উক্ত এসেম্বলিতে একমাত্র বাঙালি রানা তাসলিম উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
সাহিত্য জীবনে
রানা তাসলিম উদ্দিন ছিলেন সাহিত্যসেবী মানুষ। তিনি ও শৈশব থেকে সাহিত্যচর্চা করে আসছেন। এখন পর্যন্ত তিনি লিখেছেন শতাধিক কবিতা, ছোট গল্প। এছাড়া তিনি  লিখেছেন অনেক সামাজিক প্রবন্ধ ও নিবন্ধ। সেগুলো বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিতও হয়েছে। এক সময় ঢাকায় তিনি সাপ্তাহিক বার্তার রিপোর্টারও ছিলেন। বিদেশে প্রথম জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেছেন ক্যাকটাস নামক উপন্যাস যা এখন সম্পাদনায় রয়েছে।
অন্যান্য
পর্তুগালের দীর্ঘ ২৬ বছরের ও সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ধর্মীয় কর্ম উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে রানা তাসলিম উদ্দিন পর্তুগীজ মিডিয়ার সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন। রেডিও, টেলিভিশনসহ দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকায় ৩০ টিরও বেশী সাক্ষাতকার দেন। লিসবন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় একশত নৃতত্ব বিদ্যার শিক্ষার্থীকে তিনি পর্তুগালের বাংলাদেশ কমিউনিটির উত্থান নিয়ে সাক্ষাৎকার প্রদান করেন। লিসবন মিউনিসিপালিটির বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়নমূলক প্রায় ১৪ টি সংগঠনের সঙ্গে রানা তাসলিম উদ্দিন দীর্ঘ দিন কাজ করে যাচ্ছেন। পর্তুগাল, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সামাজিক, কল্যাণমুলক অনেক সেমিনার, সিম্পজিয়াম ও ওয়ার্কশপে তিনি যোগদানের মাধ্যমে একজন ভালো বক্তা হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।
মায়ের কাছে থেকে তিনি শিখেছেন জীবনে প্রথম চ্যালেঞ্জ নিতে। সেই থেকে আজ অবধি দেশে ও প্রবাস জীবনে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেই চলছেন।
* ছবিগুলো্ তাঁর ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া।

Comments

comments