ঢাকা, সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮ | ১১ : ৩২ মিনিট

main-story-homeহঠাৎ গোলাগুলিতে সতর্ক হন মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁরা ছিলেন মাত্র চারজন—নূর মোহাম্মদ শেখ, মোস্তফা কামাল বীর প্রতীক, নান্নু মিয়া বীর প্রতীক ও আরেকজন। শত শত গুলি ধেয়ে আসে তাঁদের দিকে। তাঁরা বুঝতে পারেন, পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের আক্রমণ করেছে। সাহসিকতার সঙ্গে তাঁরা চারজন আক্রমণ মোকাবিলা করতে থাকেন। এ ঘটনা গোয়ালহাটিতে। ১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর।
গোয়ালহাটি যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার অন্তর্গত। সীমান্তবর্তী এলাকা। এ গ্রামের পাশ দিয়ে কপোতাক্ষ নদ। গোয়ালহাটির পাশেই সুতিপুরে (বাংলাদেশের অভ্যন্তরে) ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা অবস্থান। এ অবস্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রায়ই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওপর ঝটিকা আক্রমণ চালাতেন। তাঁদের এই আক্রমণের মাত্রা আগস্ট মাসে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণ ও গতিবিধি লক্ষ করার জন্য সুতিপুর প্রতিরক্ষার অগ্রবর্তী এলাকা গোয়ালহাটিতে নিয়োজিত ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একটি স্ট্যান্ডিং পেট্রোল পার্টি। এই পেট্রোল পার্টির অধিনায়ক ছিলেন নূর মোহাম্মদ শেখ। তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করছিলেন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনী ৫ সেপ্টেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের এই স্ট্যান্ডিং পেট্রোলের অবস্থান কীভাবে যেন টের পেয়ে যায়। খবর পাওয়ামাত্র তারা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তিন দিক থেকে ছোট ওই পেট্রোল পার্টির ওপর আক্রমণ চালায়। জরুরি অবস্থা বুঝতে পেরে নূর মোহাম্মদ শেখ সহযোদ্ধাদের নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন।
কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা ছিল অনেক ও অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। মুক্তিযোদ্ধারা বুঝতে পারেন, তাঁরা বেশিক্ষণ পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে লড়াই করতে পারবেন না। মূল প্রতিরক্ষা অবস্থানের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁরা পেছনে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। এ সময় নান্নু মিয়া গুলিতে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আহত নান্নু মিয়াকে কাঁধে নিয়ে নূর মোহাম্মদ শেখ গুলি করতে করতে পেছনে সরে আসছিলেন। তখন হঠাৎ দুই ইঞ্চি মর্টারের গোলার আঘাতে তাঁর ডান পায়ের হাঁটু ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
বিপর্যয়কর এ অবস্থায় নূর মোহাম্মদ শেখ দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেন। তিনি সহযোদ্ধা মোস্তফা কামালকে নির্দেশ দেন, আহত নান্নু মিয়াকে কাঁধে করে নিয়ে পেছনে সরে যেতে। আর তাঁদের পশ্চাদপসরণের সহযোগিতার জন্য কাভারিং ফায়ার দেওয়ার দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নেন।
মোস্তফা কামাল তাঁকে ফেলে কোনোভাবে পিছু হটতে রাজি ছিলেন না। নূর মোহাম্মদ শেখ জোর করে তাঁদের পেছনে পাঠান। এরপর মর্টার শেলের আঘাতে যন্ত্রণায় কাতর নূর মোহাম্মদ মৃত্যু অবধারিত জেনেও জীবনের শেষনিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত একাই লড়াই করেন। বীরের মতো শহীদ হন তিনি।
নূর মোহাম্মদ শেখ চাকরি করতেন ইপিআরে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন যশোর ইপিআর উইংয়ের অধীনে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। তখন তাঁর পদবি ছিল ল্যান্স নায়েক।
মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহস ও বীরত্বের জন্য নূর মোহাম্মদ শেখকে মরণোত্তর বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ৭। গেজেটে নাম নূর মোহাম্মদ।
শহীদ নূর মোহাম্মদ শেখের পৈতৃক বাড়ি নড়াইল জেলার সদর উপজেলার মহিষখোলা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম মো. আমানত শেখ, মা জিন্নাতুন নেছা খানম। তিনি বিবাহিত ছিলেন। তাঁর দুই স্ত্রী, তোতা বেগম ও ফজিলাতুন নেছা। তাঁদের এক ছেলে ও তিন মেয়ে।
সূত্র:  বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ৮। 

Comments

comments