ঢাকা, রবিবার, ১৯ আগস্ট ২০১৮ | ১১ : ২৯ মিনিট

September 4th, 2017

Ajit Royস্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ও সংগীতজ্ঞ অজিত রায়। তিনি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের এক পথিকৃৎ। পাকিস্তানবিরোধী যে রাজনৈতিক সংগ্রাম ছিল, তার সহায়ক শক্তি হিসেবে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রণী সৈনিক ছিলেন । একজন তুখোড় সংগ্রামী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। আদর্শগতভাবে, বিশ্বাসের দিক থেকে তিনি ছিলেন মুক্তিসংগ্রামী। ষাটের দশক থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তাঁর রয়েছে অবিস্মরণীয় ভূমিকা। তিনি ছিলেন তুলনাহীন এক ব্যক্তিত্ব।

জন্ম ও ছেলেবেলা
১৯৩৮ সালের ১০ অক্টোবর রংপুরের উলিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। খুব ছোটবেলা থেকেই মায়ের কাছে গানে তালিম নেন তিনি। ১৯৫৭ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে রংপুর কারমাইকেল কলেজে ভর্তি হন তিনি। মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করে ষাটের দশকে অজিত রায় চলে আসেন ঢাকায়। কৈশোরেই তবলা বাজানো শিক্ষা গ্রহণ করেন অজিত রায়। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময়ই তিনি মূলত বাংলা ভাষাকে ঘিরে গান রচনা ও পরিবেশনায় মনোনিবেশ করেন।

পারিবারিক জীবন
বাবা মুকুন্দ রায় ছিলেন সরকারি কর্মকর্তা, মা জলপাইগুড়ি জমিদার পরিবারের মেয়ে কনিকা রায় রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও স্কুল শিক্ষয়িত্রী ৷ বিয়ে করেন বুলা রায়কে। দুই সন্তানের জনক। মেয়ে শ্রেয়শী রায় মুমু ও ছেলে রোমাঞ্চ রায় ।

সংগ্রামী জীবন
ষাটের দশকে প্রথম যখন রংপুর থেকে ঢাকায় আসেন, তখন তিনি বেইলি রোডের কামাল লোহানীর বাড়িতে উঠেন। গানচর্চার জন্য জায়গা পাচ্ছিলেন না বলে তাঁদের বাড়ির একটি ঘর তাঁকে সংগীতচর্চার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর তিনি সাংস্কৃতিক সংগঠন ক্রান্তি, উদীচী ও ছায়ানটের সঙ্গে যুক্ত হন। পাকিস্তান আমলে তিনি পাক-সোভিয়েত মৈত্রী সমিতি ও আফ্রো-এশীয় সংহতি পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সর্বশেষ তিনি অভ্যুদয় নামে নিজে যে সংগঠন করলেন, সেটি রবীন্দ্রসংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন। এ প্রতিষ্ঠানটি শুধু ঢাকায় নয়, চট্টগ্রামেও এর শাখা রয়েছে। তাঁর ছাত্রছাত্রীরা রবীন্দ্র ও গণসংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। তিনি চেষ্টা করেছিলেন তাঁর ছাত্রছাত্রীরা যেন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে পারে। তাঁর মেয়ে শ্রেয়া (শ্রেয়সী) রবীন্দ্রভারতী থেকে শিক্ষা গ্রহণের পর দেশে ফিরে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ধারায় নিজেকে সম্পৃক্ত করেছে।

সংগীত ভূবন
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি মূলত বাংলা ভাষাকে ঘিরে গান রচনা ও পরিবেশনায় মনোনিবেশ করেন। ১৯৬৩ সাল থেকে বেতার ও টেলিভিশনে নিয়মিত শিল্পী হিসেবে সংগীত পরিবেশন শুরু করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেন। উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হচ্ছে- জীবন থেকে নেয়া, যে আগুনে পুড়ি, জন্মভূমি, কোথায় যেন দেখেছিকসাই। সুরুজ মিয়া চলচ্চিত্রে তিনি একটি বিশেষ চরিত্রে অভিনয়ও করেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লেখা বিদ্রোহী কবিতাটি অজিত রায়ই এদেশে সর্বপ্রথম গান গেয়ে পরিবেশন করেন। এই গানটিতে সুরারোপ করেন আলতাফ মাহমুদ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর আখতার হোসেনের লেখা ও অজিত রায়ের সুরে স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা গানটিই প্রথম গাওয়া হয়।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র
১৯৭১ সালের জুন মাসে কলকাতায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। এ সময় তাঁর সতীর্থ হিসেবে ছিলেন- আপেল মাহমুদ, আব্দুল জব্বার, সমর দাস, কাদেরী কিবরিয়া, সুজেয় শ্যামসহ অন্যান্য শিল্পীরা। তাঁর রচিত ও সুরারোপিত বিখ্যাত গানগুলো রণাঙ্গনে মুক্তিবাহিনীসহ সাধারণ মানুষদেরকে স্বদেশকে ঘিরে চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে সাহায্য করেছিল। পাশাপাশি রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুল গীতি, দেশাত্মবোধক গান, গণসঙ্গীতও পরিবেশন করেছিলেন তিনি। তাঁর জনপ্রিয় গানের মধ্যে রয়েছে- একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতা, অপমানে তুমি সেদিন, কথা দাও কথাগুলো, আমি যুগে যুগে আসি, এ দেশ বিপন্ন, হে বঙ্গ ভাণ্ডারে তব, স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে আজ, বিজয় নিশান উড়ছে ঐ এবং বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি

কর্মজীবন
১৯৭২ সালে অজিত রায় তৎকালীন বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন এবং ১৯৯৫ সালের ৯ অক্টোবর চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। সংগীতবিষয়ক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘অভ্যুদয় সংগীত একাডেমী’র প্রতিষ্ঠাতা করেন। ১৯৮৭ সালে বিশ্বভারতী আয়োজিত কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‌১২৫তম জন্ম জয়ন্তীতে আমন্ত্রিত হয়ে কলকাতায় সঙ্গীত পরিবেশন করেছিলেন। ১৯৭২ সালেও বাংলাদেশ সরকারের সাংস্কৃতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে ভারত যান।

পুরস্কার ও সম্মাননা

সংগীতজ্ঞ অজিত রায় অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ২০০০ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক স্বাধীনতা পদক , রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদ থেকে  গুণীজন পদক, বাংলাদেশ রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী সংস্থা থেকে শ্রদ্ধাঞ্জলি পত্র, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শব্দ সৈনিক পদক । এছাড়া সিকুয়েন্স অ্যাওয়ার্ড (১৯৮৮), বেগম রোকেয়া পদক, চট্টগ্রাম ইয়ুথ কয়্যার অ্যাওয়ার্ড, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী পদকরবি রশ্মি পদকসহ  অনেক সম্মাননায় ভূষিত হন।

মৃত্যু

অজিত রায় ২০১১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর রোববার বেলা একটা পাঁচ মিনিটে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।

সূত্রধর:
* বিভিন্ন পত্র–পত্রিকা : প্রথম আলো, বিবিসি এবং অনলাইন সংস্করণ

Comments

comments