ঢাকা, সোমবার, ২৩ এপ্রিল ২০১৮ | ১১ : ৩৪ মিনিট

স্বাধীনতা আর দেশভাগ যেন দু’টি নয়ন
নীরবে হৃদয়ে আবেগ করে ধারণ ,
তার দু’চোখে অশ্রুধারা
একটি আনন্দে অন্যটি বেদনায় দিকহারা ।”

শত শহীদের রক্তে রাঙা ‘স্বাধীনতা’ এই উপ-মহাদেশে এসেছিল ‘দেশভাগে’র হাত  ধরে। স্বাধীনতা আর দেশভাগ যেন দু’টি সহোদর ভাই ।তাদের বয়স এখন সত্তর । সময়ের পরীক্ষার খাতায় দু’শ বছরের বৃটিশ শাসনকে যদি ফুল মার্কস ২০০ ধরি তবে প্রাপ্ত নম্বর অতি নগণ্য মাত্র । তবু পথ চলতে ফিরে দেখার বাসনায় এই সত্তরটা গ্রীষ্ম বর্ষা শরত হেমন্ত শীত বসন্ত-এর দিনগুলিকে স্মৃতির পাতা উল্টে দেখার সাধ জাগে ।

21268757_1604581346261293_785622190_nবৃটিশ শাসিত ভারত উপ-মহাদেশ ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৪৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সাড়ে পাঁচ মাসে অন্ততঃ পাঁচ ভাগে ভাগ হয়ে গেল । ১৯৪৮ এর ৪ জানুয়ারি বার্মা বা ব্রহ্মদেশ (বর্তমান মায়ানমার), ১৯৪৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি সিংহল দ্বীপ (শ্রীলঙ্কা) স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে জন্ম নিল। তার আগে ১৯৪৭ সালের ১৪/১৫ আগস্ট মধ্যরাতে ভারত,  পাকিস্থান এবং দেশীয় রাজার
রাজ্য নিয়ে উপ-মহাদেশের সবচেয়ে বড় বিভাজন হল।শুধু মাত্র রাজনৈতিক বিভাজন নয় ভারত-পাকিস্থান ভাগ হল ধর্মীয় অনুষঙ্গে । ১৯৭১ সালে পাকিস্থান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হল । ১৯৪৭ থেকে ২০১৭ এই উপমহাদেশের সবচেয়ে জনবহুল বা জনসমৃদ্ধ অংশের দেশভাগের সত্তর বছর পূর্ণ হল।

21268716_1604582272927867_569316477_nধর্মের নামে দেশভাগে মধ্যরাতে স্বাধীনতা এলেও কোটি কোটি মানুষের জীবনে নেমে এলো ঘোর অন্ধকার । এক লহমায় তাঁরা হলেন নিজ দেশে পরবাসী । চারিদিকে অবিশ্বাসের বাতাবরণ । সঙ্গে ভয়। ভিটে মাটি ছেড়ে পাড়ি দিলেন অচিন দেশে, অজানা আশংকায় । পশ্চিমে পাঞ্জাব পূবে বাংলা – একই চিত্র দুই সীমান্তে । দেশভাগের সময় ভারতের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩১ কোটি ৮০ লক্ষ । এর মধ্যে হিন্দু ২৩ কোটি ৯০ লক্ষ, মুসলমান ৪ কোটি ৩০ লক্ষ, বাকি অন্যান্য । এই সময় এক থেকে দেড় কোটি মানুষ জন্মভূমি ত্যাগ করতে বাধ্য হলেন । পারস্পরিক অবিশ্বাস, লোভ, ধর্মীয় জিগিরে ঘটে গেল দাঙ্গা। ৫০ লক্ষ থেকে এক কোটি মানুষ দাঙ্গার বলি হলেন । আর ১০ লক্ষ নারী অপহৃত, ধর্ষিত বা খুন হলেন । সম্পত্তি বিনিময় ব্যবস্থাপনায় ভিটে মাটি যত বিনিময় হল তার চেয়ে বেশী পড়ে রইল পতিত হয়ে বা বেদখল হয়ে গেল। সম্পত্তি বিনিময়ে  বিনিময়কারীরা কিছুটা সুবিধা পেলেন, আশ্বস্ত হলেন –তাঁদের মধ্যে শ্রদ্ধা, সম্প্রীতির সম্পর্ক টিকে গেল।আবার মুর্শিদাবাদ–রাজশাহীর জেলার বিনিময়ের ক্ষেত্রে মুর্শিদাবাদে এসে কিছু মানুষ প্রতারিত হলেন। সেরকম কৃষ্ণনগরে ঘনিষ্ট বন্ধুর জিম্মায় কিছু জিনিষ রেখে পাকিস্থানে চলে যাওয়ার পর ফিরে এসে আর
পেলেন না ।

পূর্ব বঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গ আয়তনে ছোট । উদ্বাস্তু আগমনে পশ্চিমবঙ্গে জনসংখ্যার উপর চাপ সৃষ্টি হল । উদ্বাস্তু শিবির, অন্যের পতিত জমি, বাগান, রেলপথ, রাস্তার ধারে,খাল বিল যেখানে পারলেন বসতি গড়ে তুললেন । পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও ত্রিপুরা, অসম, বিহার, ওড়িষা, মেঘালয়, মিজোরাম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড সহ ভারতের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়লেন ।সবুজ উর্বরা বাংলার মাটি থেকে লাল কাঁকুড়ে মাটি বা পাহাড় মালভূমির রুখাশুখা মাটিতে শুরু হল জীবন সংগ্রাম । চাষাবাদ । ব্যাপক পেশা বদল ঘটলো । চাষি হয়ে গেলেন কুলি খালাশি ফেরিওয়ালা হকার । চলমান জীবনে চলতি ভাষার সঙ্গে বিভিন্ন জেলার উপভাষা-বিভাষা মিলে মিশে নতুন নতুন মিশ্র শব্দের জন্ম হল ।

Tine Table EBR SDAHভাষার কথা উঠতেই মনে পড়ে যায় ভাষা আন্দোলনের কথা । ধর্মের ভিত্তিতে গড়ে উঠা রাষ্ট্র পাকিস্থান শুরুতেই থাবা বসালো বাঙালির ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির উপর। রাষ্ট্রভাষার নামে বাংলাভাষাকে গলা টিপে মারতে চাইলো ।১৯৫২ র ২১ ফেব্রুয়ারি পুব বাংলার ভাষা আন্দোলনে বাঙালি প্রাণ দিয়ে শুধু মাতৃভাষার মানসম্ভ্রমই রক্ষা করলেন না – স্বাধীনতামন্ত্রের  বীজ বপন
করলেন ।যা পরবর্তী কালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিল। পাশাপাশি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’এর স্বীকৃতি  আদায় করলেন । অন্য দিকে একই চিত্র দেখতে পাই ভারতের অসমের কাছাড়ে- ১৯৬১ সালের ১৯ মে একদিনে একজন নারীসহ এগারো জন জীবন দিয়ে প্রমাণ করলেন ‘ জান দেব জবান দেব না’ । ভারতে চালু হল ‘ত্রিভাষা সূত্র’।

দেশভাগের সময় ধর্ম প্রাধান্য পাওয়ায় দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ইত্যাদি দৃষ্টিভঙ্গি কি হবে তা নিয়ে চর্চা ছিল কম । ভারত অবশ্য প্রথমেই ধর্ম নিরপেক্ষ , গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে ঘোষণা করলেও সংবিধান রচনা ও তার প্রয়োগ করতে তিন থেকে পাঁচ বছর লেগে গেল । পাকিস্থান স্বৈরতন্ত্রের পথে পা বাড়ায়, সামরিক বাহিনী ক্ষমতার কেন্দ্রে  অবস্থান করে । পরিণতিতে একাধিকবার সামরিক অভ্যুত্থান। অসংখ্য সীমান্ত সংঘর্ষের পর ১৯৪৮,১৯৬৫ ও ১৯৭১ সালে ভারত-পাকিস্থান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে । তিনবারই পাকিস্থান পরাভূত হয়। ৯ মাস বাঙালি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে লড়াই এবং ১৩ দিন ভারতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যুদ্ধের পর বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয় সেনার মিত্রবাহিনীর সামনে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১  পাকিস্থানের ৯০ হাজার সশস্ত্র সেনা আত্মসমর্পণ করে।যা একটি বিশ্বরেকর্ড হয়ে আছে। স্বাধীন বাংলাদেশ গণতন্ত্রকে পাথেয় করেছে ।

সত্তর বছরে এই উপ-মহাদেশে বেশ কিছু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আততায়ীর হাতে খুন হয়েছেন। মনে পড়ে বেশ কিছু নাম, ভারতে- মহাত্মা গান্ধী(১৯৪৮), ইন্দিরা গান্ধী(১৯৮৪), রাজীব গান্ধী(১৯৯১), বিয়ন্ত সিং(১৯৯৫)। পাকিস্থানে- লিয়াকত আলি খান(১৯৫১), হায়াত শেরপাস (১৯৭৫), মহাম্মদ জিয়াউল হক(১৯৮৮), ফজলে হক (১৯৯১), গুলাম হায়দার ওয়ানি(১৯৯৩), সিদ্দিক খান কাঞ্জু(২০০১), বেনজির ভুট্টো (২০০৭), সলমন তাসির (২০১১), শাহবাজ ভাট্টি(২০১১),সুজা খানজাদা(২০১৫)। বাংলাদেশের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে ১৯৭৫ সালে । ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, সপরিবারে নিধন  করা হয় বঙ্গবন্ধু সেখ মুজিবর রহমান’কে । আড়াই মাস পরে ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ হত্যা করা হয় মহঃ মনসুর আলী, তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এ.এইচ.এম. কামারুজামান এবং ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান’কে ।
The Hinsthan Times 15 aUG 1947দেশ বিভাজনে রেল-সড়ক ও নৌ-পরিবহনের পরিকাঠামো বিভাজিত হয়ে গেল । সীমান্তে এসে থমকে গেল পথ । কিছুদিন রেল চালু থাকলেও ১৯৬৫র ভারত-পাকিস্থান যুদ্ধের সময় তা বন্ধ হয়ে গেল।দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের হার গেল কমে। কিছু মানুষ চোরাচালানকে করলেন পেশা । নদীয়ার মাথাভাঙা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম । সেল্যুলয়েড-এর ছবির মত পর পর মনে ভেসে আসছে কত ঘটনার ছবি । নদীর দু’পাড়ে প্রতিবেশী দু’টি দেশ। আকাশে পেঁজা তুলো মেঘ। নীচে নদীর দু’কুলে শ্বেতশুভ্র কাশফুল বাতাসে দোল খেয়ে ফিস ফিস কথা বলছে। পড়ন্ত বিকালে নদীর জলে হাঁসের দল ঠোঁটে ঠোঁটে সোহাগ করে ফিরে চলেছে দু’দিকে আপন কুলায়। মাথার উপরে উড়ে যায় বিহঙ্গের দল অসীমের আহবানে– ওরা সীমানা চেনে না ।  ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা’ এই বসুন্ধরায় দু’পাড়েই একই ভাষা,একই সুর, হাসি কান্না ভালবাসা। দু’দেশের জাতীয় সংগীত রচনা করেছেন সবার প্রিয় একজন বাঙালি – বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।‘ভাগ হয়ে গেছে সব ,ভুল হয়ে গেছে বিলকুল, ভাগ হয়নি কো নজরুল ।’ আজও জীবন্ত ‘মৈত্রী’,‘সৌহার্দ্য’,ভিতর বাইরে অন্তরে অন্তরে। ‘গঙ্গা আমার মা,পদ্মা আমার মা।’ কাঁটাতার আবেগকে বাঁধতে পারে না।বরং আবেগ ভালবাসায় বাঁধা পড়ে মানুষ । ধর্মীয়  সন্ত্রাসবাদ সারা বিশ্বের সঙ্গে এই দুই দেশেরও প্রধান উদ্বেগের কারণ। ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক মানুষ চান শান্তি, সহবস্থান, ভ্রাতৃত্ববোধ । বিশ্বাস করেন ‘ধর্ম যার যার, দেশ সবার’। ভারত – বাংলাদেশ দুই দেশ তাই যৌথভাবে নতুন লড়াইয়ের পথে নেমেছে – সে লড়াই ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই । ধ্বংস নয় সৃষ্টি । ধর্মের ভিত্তিতে
দেশভাগের সত্তর বছরে – এটি বোধ হয় আজকের দিনে সবচেয়ে বড় বার্তা ।[]

সঞ্জিত দত্ত, ১১/১ সতীন সেন রোড, আমিনবাজার-গড়াইপাড়া, কৃষ্ণনগর-৭৪১১০১, নদীয়া , পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

Comments

comments