ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট ২০১৮ | ১২ : ৪৩ মিনিট

Nayak Raj Razzakআমরা জমিদার ছিলাম না, তবে জমিদারের মতো বিষয়-সম্পদ ছিল আমাদের। আমার বাবার ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ ও ডিপার্টমেন্ট সেন্টার। আমি পরিবারের সবার ছোট ছিলাম বলে আদর-আহ্লাদ পেয়ে পেয়ে দুরন্ত হয়ে উঠেছিলাম। আমার বয়স যখন আট কি নয় বছর, তখন আমার বাবা-মা দুজনই মারা যান। পরবর্তী সময়ে আমি বড় হই ভাইবোনদের আদর-যত্নে। তাঁরা কোনো দিনই আমাকে বাবা-মায়ের অভাব বুঝতে দেননি। তাঁদের আদর-আহ্লাদে আমি রীতিমতো ডানপিটে হয়ে উঠলাম। খেলার প্রতি আমি বেশি ঝুঁকে পড়ি।

তখন কলকাতার ফুটবলে দারুণ উন্মাদনা। আমিও ফুটবল খেলা নিয়ে মেতে উঠলাম। বিশেষ করে তখন গোলরক্ষক হিসেবে আমি ছোটদের মধ্যে খুব সম্ভাবনাময় বলে পরিচিতি পেয়েছিলাম। তবে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে স্কুলে ও স্থানীয় ক্লাবে নাটক করতাম। আমার অভিনয়ে আগ্রহ দেখে আমার নাট্যগুরু পীযূষ বোস তাঁর শিশু রঙ্গসভায় আমাকে সদস্য করে নেন। তারপর একের পর এক নাটকে চলে আমার অবিরাম অভিনয়। সপ্তম শ্রেণি থেকে ম্যাট্রিক পাস করা পর্যন্ত প্রায় দু শ নাটকে অভিনয় করেছি আমি।

আমার পরিবার ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল। যখন অভিনয় নিয়ে মোটামুটি ব্যস্ত হয়ে পড়ি, ঠিক তখনই পরিবার থেকে বাধা আসে। আমার জোর প্রচেষ্টার মুখে তাদের বাধা ভেঙে যায়। তবে মেজদা আবদুর গফুর শর্ত দেন, যদি অভিনয় করতেই হয়, তাহলে যেন ভালোভাবে করি। মেজদার বেঁধে দেওয়া শর্তে আমি সিরিয়াস হই অভিনয়ের প্রতি। অভিনয়ে সম্মতি দিলেও তাঁদের শঙ্কা ছিল বংশমর্যাদা নিয়ে। কারণ, সারা দিন আমি এক গাদা ছেলেমেয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়াই। কখনো কখনো বান্ধবীর সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। তাই তাঁরা নিশ্চিত হতে চাইলেন আমার বিয়ে নিয়ে। শুধু অভিনয়ের স্বার্থে আমি বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যাই।

লক্ষ্মীর প্রকৃত নাম খায়রুন্নেসা। আমি যখন বিয়ে করি তখন আমার বয়স ১৯ বছর। লক্ষ্মীর সঙ্গে সংসার শুরু হওয়ার প্রথম দিকেই আমি তাকে আমার অভিনয়ের ব্যাপারে ধারণা দিয়ে দিই। শুধু তা-ই নয়, আমার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের বর্ণনাও তাকে দিই। এমনকি আমার জীবনের প্রথম প্রেম সম্পর্কেও বলি। আমি তখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। তো ওইটুকুন বয়সেই আমি একটি মেয়েকে ভালোবেসেছিলাম। সেই প্রেমটা ম্যাট্রিক পাস করা পর্যন্ত ছিল। তাকে শুধু দেখেছি দূরে দাঁড়িয়ে। কথাও বলতে পারিনি নির্জনে কোথাও বসে। লক্ষ্মী আমার সবকিছুই মেনে নেয়। সে আমাকে ও আমার অভিনয়কে শ্রদ্ধা করে লক্ষ্মীর মতোই ভূমিকা রাখে।

যা-ই হোক, টালিগঞ্জে ফিল্মিপাড়া আর আমাদের বাড়ি একই জায়গায় হওয়াতে ছোটবেলা থেকেই কানন দেবী, বসন্ত চৌধুরী, সৌমিত্র (চট্টোপাধ্যায়), বিশ্বজিৎ ও ছবি বিশ্বাসদের দেখে দেখে বড় হয়েছি। তাঁদের জনপ্রিয়তায় মুগ্ধ হয়ে একদিন তাঁদের মতো হওয়ার সংকল্প করেছি।

অভিনয়ে প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে চলে গেলাম মুম্বাই। তখন ১৯৬১ সাল। নাট্যগুরু পীযূষ বোস চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। তাঁর সঙ্গে সম্পর্কের খাতিরে তখন টালিগঞ্জের কয়েকটি ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পাই। ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করেই সন্তুষ্ট ছিলাম। তখনকার ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে রতনলাল বাঙালি, পঙ্কতিলকশিলালিপি ও এতটুকু আশা। ইতিমধ্যে ’৬৪ সালের দাঙ্গা বেধে যায়। খুব মন খারাপ হয়ে পড়ে। পরিবারের সবাই মির্জাপুরে চলে যায়। আমি আবার মুম্বাই চলে যাব ভাবছি। এর আগে কখনো আমাদের পাড়ায় দাঙ্গা হতে দেখিনি। আমার গুরু মুম্বাই যেতে নিষেধ করলেন। গুরুর পরামর্শ অনুযায়ী আমি সিদ্ধান্ত পাল্টিয়ে আমার আট মাসের ছেলে বাপ্পারাজকে নিয়ে ঢাকায় চলে এলাম। আগে কোনো দিন ঢাকা বা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আসিনি। তাই তেমন কাউকে চিনিও না।

দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের সহায়তায় আমি কমলাপুর ঠাকুরপাড়ায় একটি ছোট ঘর ভাড়া নিয়ে উঠি। টার্গেট ছিল চলচ্চিত্রে অভিনয় করব। কিন্তু নাটক যেহেতু নেশা, তাই নাটক দিয়ে শুরু করলাম। মালিবাগে তখন দু-একটা নাটক করার ক্লাব গড়ে উঠেছিল। বন্ধু জহিরুল হকের সহযোগিতায় আমি অভিনয়ের সুযোগ পাই। পরে বন্ধু মুজিবুর রহমান চৌধুরী মজনুর পরিচালনায় অনেকগুলো নাটকে অভিনয় করি।

নাটক করতে করতে একসময় ইকবাল ফিল্মের কর্ণধার এবং এ দেশের চলচ্চিত্রের স্রষ্টা আব্দুল জব্বার খানের খবর পাই। আব্দুল জব্বার খানকে আমি আগে থেকেই কিছুটা জানতাম। তিনি কলকাতায় আমাদের পাড়ায় সাবিত্রী (চট্টোপাধ্যায়) দিদিদের বাড়িতে যেতেন। আমার আগ্রহের কথা শুনে তিনি আমাকে তাঁর নির্মিতব্য উজালা ছবিতে সহকারী পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিলেন। সহকারীর কাজ করতে করতে আমি যোগাযোগ করতে থাকি বিভিন্নজনের সঙ্গে।

তখন আমার খুব দুর্দিন ছিল। যত দিন যায় ততই অভাব-অনটনে পড়তে থাকি। দারুণ অর্থকষ্টের মাঝে দিনাতিপাত করতে থাকি। এর মধ্যে পরিচয় ঘটে জহির রায়হানের সঙ্গে। তিনি আশ্বাস দেন সময় ও সুযোগমতো তাঁর ছবিতে নেবেন। পরে তিনি বেহুলাতে আমাকে নায়ক হিসেবে ব্রেক দেন। জহির ভাই আমাকে সাইনিং মানিস্বরূপ ৫০০ টাকা হাতে দেন। ছবিটি তখন দারুণ ব্যবসাসফল হয়েছিল। আমাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। জহির রায়হানের মতো মেধাবী নির্মাতার হাতে গড়ে উঠেছিলাম বলে আমি আজকের রাজ্জাক হতে পেরেছি।

জীবন থেকে নেয়া ছবিটির শুটিংকালে তখন ক্যান্টনমেন্ট থেকে আমাদের ডেকে পাঠানো হয়। নাটক হিসেবে জহির ভাইয়ের সঙ্গে আমাকেও সেখানে যেতে হয়েছিল। সেখানে আমাকে নানান কথা জিজ্ঞাসা করা হয়। জহির ভাই তো তাঁর সিদ্ধান্তেই অটল। তিনি সোজা বলে দেন, ছবি কী হচ্ছে না হচ্ছে সেটা তো এখন দেখার বিষয় নয়। ছবি সেন্সরে জমা দিলে তখন দেখা যাবে বা কোনো সমস্যা থাকলে তা চিহ্নিত করবে। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী অনেকটা দেরিতে হলেও ছবিটি ছাড় দিতে বাধ্য হয় ছাত্র আন্দোলনের চাপের মুখে।

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে আমাদের অনেক শিল্পীই তখন ভারতে চলে যায়। আমি জহির ভাইয়ের বাসায় লুকিয়ে থাকি ১৭-১৮ দিন। রাস্তায় কোনো অসুবিধা হবে ভেবে তিনি আমাকে ভারতে যেতে নিষেধ করেন। তারপর একসময় মৃত্যুভয়কে তোয়াক্কা না করে এফডিসিকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে ক্যামেরায় ফিল্ম ছাড়াই অভিনয় করতাম। তখন কোনো শিল্পীই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আসতে চাইত না। শুধু নায়িকা অলিভিয়াকে পাওয়া গেল। তাকে আর আমাকে কাস্ট করে এস এম শফি ভাইয়ের ছন্দ হারিয়ে গেল ছবির শুটিং করতাম ক্যামেরায় ফিল্মি ছাড়া। শুটিং যখন হচ্ছে, তাহলে সবকিছুই স্বাভাবিক—যে কারণে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেল এফডিসি।

যুদ্ধের সময় আমি ঢাকার বাইরে গেলে দু-তিন দফায় আমাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় ক্যান্টনমেন্টে। সারা দিন তারা আমাকে বসিয়ে রেখে এটা-ওটা জিজ্ঞাসাবাদ করত। আল্লাহর রহমতে আমি বারবার ফিরে এসেছি। ওই সময় যাদের ডেকে নিয়ে যাওয়া হতো, তাদের অনেককেই আর ফেরত পাঠানো হতো না। আমি যুদ্ধের সময় পুরো নয় মাস প্রায় গৃহবন্দীর মতো বাসায় ছিলাম। পাকিস্তানি বাহিনী সব সময় আমার বাসায় পাহারা দিত। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জনমনে স্বস্তির নিশ্বাস ফিরে এলে আবার নব উদ্যমে ছবির শুটিং-ডাবিং-প্রিন্টিংয়ের কাজ শুরু হয়। স্বাধীন বাংলাদেশ আমার প্রথম ছবি দুটি হচ্ছে ছন্দ হারিয়ে গেল আর কাজী জহিরের অবুঝ মন

অভিনয় দেখতে গিয়ে কেউ কেউ আমার চেহারার সঙ্গে মিল খুঁজে পেয়েছেন মহানায়ক উত্তমকুমারের। যদিও সচেতনভাবে আমি কখনো অনুকরণ করতে যাইনি। তবে আমি তাঁর অসম্ভব ফ্রেন্ড ছিলাম। আমার জীবনের প্রায় পুরোটাই হচ্ছে অভিনয় দিয়ে ঘেরা। ১৯৬৪ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টানা ২৫ বছর প্রায় ৩৫০টি ছবিতে আমি নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করি। ৯০-তে এসে পাঁচ বছর বিরতি দিয়ে ৯৫-তে আবার অভিনয় শুরু করি চরিত্রাভিনেতা হিসেবে। অভিনয় থেকে আমি প্রযোজনা ও পরিচালনায় এসেছি।

আমি চার দশক ধরে প্রায় ৪০০ ছবিতে অভিনয় করেছি। সবই ভালোবেসে করেছি। আমার শেষ ইচ্ছা, অভিনয় করতে করতেই যেন আমার মৃত্যু হয়। এমনকি মৃত্যুর পরও কিছুটা বাস্তব দৃশ্য ধারণ করা হবে অভিনয়ের জন্য। দাফন-কাফন নামে আমার জীবনের ওপর একটি ডকুমেন্টারি তৈরি হচ্ছে—যার শেষ দৃশ্য চিত্রায়ণ হবে আমার মৃত্যুর পর। জীবদ্দশায় আমি এ দেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছি। তাই মৃত্যুর পর এ দেশের মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাই।

(সংক্ষেপিত)

অনুপম হায়াৎ সম্পাদিত চিত্র পরিচালক ও তারকাদের আত্মকথা বই থেকে

Comments

comments